চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদি ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মমিনপুর মাদ্রাসা মসজিদে গত ছয় দশক হাদিয়া ছাড়াই হাফেজগণ খতমে তারাবির নামাজ পড়িয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, এই মাদ্রাসায় হিফজ সম্পন্ন করা হাফেজদের মাধ্যমে মমিনপুর গ্রামের আরো ১৫ মসজিদে একযোগে তারাবি নামাজ পড়ানো হয়। সেখানেও নেওয়া হয় না কোন হাদিয়া। পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি রয়েছে এই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের।
সরেজমিন মাদ্রাসা ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে মাদ্রাসা ও মসজিদের অবস্থান। রিকশা কিংবা অটোবাইক দিয়ে সহজে যাওয়া যায়। নদীপথে যাওয়ার উপায় রয়েছে ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে। চান্দ্রা-গল্লাক সংযুক্ত পাকা সড়ক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে সাহেব বাজার ও পূর্ব দিকে মাদ্রাসার ক্যাম্পাস।
ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে গড়ে উঠা এই মাদ্রাসা দেখতে খুবই মনোমুগ্ধকর। মাদ্রাসা আঙ্গিনা মনজুড়ানো পরিবেশ। নদীর পশ্চিম পাশে মাদ্রাসার অবস্থান। দক্ষিণ দিক থেকে শুরু মাদ্রাসা ভবন। মাঝখানে তৈরি হয়েছে মসজিদ। খুবই সুন্দর নকশার দ্বিতল এই মসজিদে একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লী।
মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ বলেন, জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে তারাবি নামাজ পড়ানো হাফেজদের হাদিয়া দেওয়া হলেও মুমিনপুর মাদ্রাসা এর ব্যতিক্রম। এই মাদ্রাসা মসজিদে কখনোই হাদিয়া দেওয়া ও নেয়ার প্রচলন ছিলো না এবং এখনো নেই। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাফেজ মাওলানা মুহসিন (রা.) এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
এ বছর মাদ্রাসা মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান হাফেজ মো. মাহমুদ ও হাফেজ ওবায়দা। হাফেজ মাহমুদ বলেন, আমি বিগত দুই বছর এই মসজিদে খতমে তারাবি পড়াচ্ছি। আমি কখনো বিনিময়ে হাদিয়া নেইনি। এভাবে নামাজ পড়িয়ে আমি খুবই আনন্দিত।
হাফজে ওবায়দা বলেন, কোনো বিনিময় ছাড়া আমি এর আগে অন্য মসজিদে তারাবি পড়িয়েছি। বিগত ৩ বছর এই মসজিদে তারাবি পড়াচ্ছি। আমার কাছে খুবই ভালো লাগে।
একাধিক মুসল্লী জানান, দ্বিতল মসজিদের নকশা খুবই সুন্দর। গ্রামের বহু মানুষ এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত এবং জুম্মার নামাজ আদায় করেন। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় সমানসংখ্যক মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলামেলা পরিবেশ হওয়ার কারণে মসজিদের ভিতরে হিমশিতল অবস্থা বিরাজ করে।
১৯৮৮ সালে এই মাদ্রাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করেছেন সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের হাফেজ আব্দুল বারেক। তিনি বলেন, এই হিফজ মাদ্রাসার ঐতিহ্য দেশজুড়ে। এখানকার হাফেজদের তারাবি পড়ানোর জন্য কোন ইন্টারভিউ দিতে হয় না। এখান থেকে একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র হিফজ সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অনন্য উদাহরণ এই কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। দেশ-বিদেশে নানা পেশায় জড়িত রয়েছে এবং দক্ষতার সাথে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে মাদ্রাসার হাজার হাজার শিক্ষার্থী।
মুমিনপুর মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ রাশেদ বলেন, প্রতিবছর এই মাদ্রাসা থেকে যেসব শিক্ষার্থী হিফজ সম্পন্ন করেন তারাই মুমিনপুর গ্রামের সবগুলো মসজিদে খতমে তারাবি পড়ান। একেক মসজিদে দুই থেকে ৪জন হাফেজ নিয়োগ করা হয়। এবছরও নিয়োগ করা হয়েছে। মূলত এখানে যারা হিফজ সম্পন্ন করেন তারাই এসব মসজিদে তারাবি পড়িয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারে তারাবি শেষ করে মুসল্লীদের মিষ্টি খাওয়ানোর মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব শেষ করে।
তিনি আরো বলেন, মাদ্রাসা মসজিদে প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় খতমে তারাবি পড়িয়েছেন চাচা হাফেজ ফজলুর রহমান। উনার ইন্তেকালের পর শিক্ষার্থীরাই সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে।