কোটা বৈষম্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ঢাকার আইসিএমএ’র শিক্ষার্থী আবু বকর ছিদ্দিক শিবলু (৩৬)। চারদিন অজ্ঞান থাকার পর রাজধানীর আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪শে জুলাই তার মৃত্যু হয়। গত ২১শে জুলাই কোটা বৈষম্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তাল ঢাকার রাজপথ। ওইদিন বিকেলে রাজধানীর আবদুল্লাহপুর কোটবাড়ি রেলগেট এলাকার একটি বাসার চারতলা থেকে শিশু সন্তান ফারহান সিদ্দিককে (৮) নিয়ে শশা কিনতে বের হন শিবলু। বাবা-ছেলে রেললাইনের ওপর বসে কথা বলছিলো। এসময় হঠাৎ চারপাশে গোলাগুলির শব্দ হতে থাকে। ওই স্থান থেকে সরে পড়ার চেষ্টাকালে কিছু বুঝে উঠার আগেই একটি গুলি তার মাথায় ডানপাশে লাগে। মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শিবলু। এসময় তার সন্তান ফারহান কান্না করতে করতে বলে- বাবা গুলি খেয়েছে। রাস্তায় পড়ে গেছে।
দ্রুত বাসা থেকে নিচে নেমে স্ত্রী জানতে পারেন স্থানীয়রা আহত শিবলু পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এরপর আর জ্ঞান ফিরেনি শিবলুর। হাসপাতাল পরিবর্তন করে আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এভাবেই স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাটি প্রতিবেদককে জানান তার স্ত্রী মারজাহান আক্তার রিমু। তিনি বলেন, স্বামীর কর্মস্থল এলিট পেইন্ট অফিস বন্ধ থাকায় সারাদিন বাসায় ছিলেন শিবলু। ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে শিশু ফরহানের বিরক্ত লাগলে তাকে নিয় ঘর থেকে বের হন শিবলু। এসময় রিমু স্বামীকে ফেরার সময় শসা নিয়ে আসতে বলেন। স্বামী আর ফিরলো না ঘরে, একেবারের চলে গেল না ফেরার দেশে। নিহত আবু বকর ছিদ্দিক শিবলু দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চাঁনপুর এলাকার ওছি উদ্দিন ভূঞা বাড়ির আবুল হাসেমের ছেলে। সাত ভাই বোনের মধ্যে শিবলু চতুর্থ।
দু’সন্তানের জনক শিবলু এলিট পেইন্ট এর সহকারি হিসাবরক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আইসিএমএ’র শিক্ষার্থী ছিলেন। তার ফারহান ছিদ্দিক (৮ বছর) ও নুসাইবা ছিদ্দিক (৯ মাস) নামে দু’সন্তান রয়েছে। ফারহান উত্তরা এলাকায় স্থানীয় একটি মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
নিহতের বড় ভাই ইয়াকুবপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম বাবলু বলেন, পড়ালেখা ও কর্মের সুবাদে গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় থাকছিলেন শিবলু। প্রায় চার বছর ধরে উত্তরা ৮নং সেক্টর এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন শিবলু। রাজধানীর কাঁটাবন এলাকায় আইসিএমএ তে দীর্ঘদিন ধরে পড়ছেন শিবলু। সেখানে দুই হাজার মার্কের মধ্যে চৌদ্দশ মার্ক কমপ্লিট হয়েছিলো তার।’ বাবলু আরও বলেন, ‘ছোট ভাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে রিমুর কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে যান। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শিবলুর আর জ্ঞান ফিরেনি। ২৩ জুলাই মঙ্গলবার তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ভাইকে বাঁচাতে তার শরীরে চার ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। তারপরও তাকে বাঁচানো যায়নি। ঘটনার দিন পূর্ব উত্তরা থানায় সংঘর্ষ হলেও অপরপ্রান্তে দক্ষিণখান থানা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয় শিবলু। উভয় থানায় শরণাপন্ন হয়েও কেউ মামলা নেয়নি। ফলে পোস্টমর্টেম ছাড়াই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শিবলুকে গত ২৫ জুলাই রাতে দাফন করা হয়।
শিবলুর স্ত্রী রিমু বলেন, প্রেমের পর পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের ৯ বছরের মাথায় স্বামীর এমন নির্মম মৃত্যু হলো। এখন দু’সন্তান নিয়ে তার ভবিষ্যত অনিশ্চিত। সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসার চলাতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন।