1. admin@mannanpresstv.com : admin :
গল্প -স্বপ্নের খোঁজে একদিন -সুনির্মল বসু - মান্নান প্রেস টিভি
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩০ পূর্বাহ্ন

গল্প -স্বপ্নের খোঁজে একদিন –সুনির্মল বসু

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৪
  • ১৪৫ Time View
সবাই বলত,তোর কিস্যু হবে না।
মন খারাপ হোত সুজনের।মন খারাপ হলে,ও নদীর কাছে যেত, সবুজ ধানক্ষেতে হেঁটে যেত।
মাঝে মাঝে ঘর ছেড়ে উদাস বাউলের মতো অজানা নগরীর পথে হেঁটে যেত, আবার ফিরেও আসতো,মায়ের মুখটা ভেবে।সুজন বুঝতে পারতো,ওর জন্য মায়ের কত কষ্ট!
সুজন ছোট বেলায় ঘুড়ি ওড়াতো,ওর মনটা রঙীন ঘুড়ির মতো দূরদেশে উড়ে যেত।
শচীন কাকা একদিন বললেন, তোর কিস্যু হবে না।
কেন?
তোর মন,
মনের কি দোষ?
স্বাভাবিক নয়,
কিছু হ ওয়া মানে কি?
বড় হয়ে বাড়ী গাড়ী ফ্লাট।
একদিন মধুরিমা এলো ওর জীবনে। সকাল বিকেল সন্ধে তখন স্বপ্নে মশগুল। আকাশ তখন ঘন নীল, গাছের পাতা সবুজ, গাঢ়। স্কুলে ছাত্র পড়িয়ে আসার পর, সুজন বাইরে বেরোতে চায় না। ওর মধ্যে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার কোন চেষ্টা নেই।
মধুরিমা বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি সবার মত নও।
কেন?
নিজের ভালো বোঝো না,
আমি পৃথিবী কে ভালবাসি, তোমাকে ভালোবাসি।
তাতে কি হয়?
কবিতা লেখা হয়,
এতে কি পেট ভরে?
মন ভরে,
আমার পোষাবে না, আমি চললাম।
সুজনের মনে পড়ে, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে ওর স্মৃতি খুব সুখকর নয়। সেখানে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা, গাড়ি-বাড়ির। প্রতিযোগিতা, আর্থিক কৌলিন্যের। মানবিকতা শব্দটি এদের জীবন থেকে উধাও। সুজন অনুভব করে, পেটে বিদ্যে নেই, হাতে মুঠো মুঠো টাকা, খুবই বিপজ্জনক সহাবস্থান।
এখানে মানবিকতা শব্দটি ঠাট্টা। সুজন মনে মনে বুঝে নিল, আমি এখানে কেন? এ ঠিক আমার জায়গা নয়।
অথচ, এদের আলমারিতে বই সাজানো। নিজেকে সংস্কৃতিমনস্ক বোঝাবার কি আন্তরিক প্রয়াস। আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে এদের অভিমত হলো, ইদানিং সাহিত্যে কিস্যু হসসে না।
ও বাড়ি যাওয়া ও বন্ধ করে দিল।
ও আজকাল বন্ধুদের সঙ্গেও ভালো করে মিশতে পারছে না। অভিযান, সৌমাল্য, শুদ্ধশীল বড় চাকরি করে।
হাই স্ট্যাটাসের মানুষ। ওরা স্পষ্টত ই নিজেদের চারদিকে একটা অদৃশ্য দেওয়াল রচনা করে ফেলেছে। ঘুরিয়ে বলতে চায়, আমরা একটু আপার লেভেলের মানুষ।
সুতরাং লরির পিছনের লেখাটা ওরা স্মরণ করিয়ে দিতে চায়,
দূরত্ব বজায় রাখো।
সুজন একা হয়ে পড়ছিল। অথচ, ওর মন ও মস্তিষ্ক সর্বদাই কিছু একটা খুঁজছিল।
সবাই সুজনকে একলা ফেলে চলে গেল।
এখন শূণ্য ঘরে সুজন একা। অন্ধকার ঘরে থাকতে থাকতে ,ও আলোর জ্যোতি রেখা একদিন দেখতে পেল। নদীর ঢেউ, রাতের আকাশ, পদ্ম দীঘির পাড়, বউ কথা কও পাখির ডাক, ঝাউ পাইনের বনে বয়ে যাওয়া উতরোল বাতাস, ভোর বেলার শিশির পতনের শব্দ, চাঁদের মনোমোহিনী আলো, তারাদের ঝিকিমিকি, সব ওর লেখায় উঠে এলো।
মনে যত অন্ধকার,লেখায় তত আলো এসে পড়লো। সুজনের মন তখন সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠেছে।
মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ ব্যর্থতার ছবি ওর কলমে ফুটে উঠল। জীবনকে গভীর আশ্লেষে ভালোবেসে ফেলল সুজন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে সাজিয়ে মানুষের জন্য রেখে যাবো।
হাতে সময় কমে আসছে। কাজ অনেক। সময়টাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। আমি যেন আমারও অনুভবের কথা সবটুকু বলে যেতে পারি। আমার লেখায় মানুষ যেন জীবনের সঠিক সত্যটুকু খুঁজে পায়।
ওর কবিতার বই বেরোলো। ওর উপন্যাসের চাহিদা বাড়লো। পত্রপত্রিকায় নানা লেখা ছাপা হলো।
বিদেশ থেকে চিঠি এলো, মিস্টার সেন, আপনি আমাদের দেশে আসেন।
সুজন ভাবে, যেভাবে সবাই স্বপ্ন খোঁজে, আমি তো কখনো সেভাবে স্বপ্ন খুঁজিনি।
আমি ভালবাসতাম গাছপালা রোদ্দুর, আমি ভালবাসতাম আমার গ্রাম বাংলা, শাপলা শালুক, সরল মানুষের মুখ। আমার লেখায় বারবার বড় দীঘি, বকুল ফুলের গন্ধ, পলাশ বনে কাটানো বিকেল, সমুদ্র জলের প্রশান্তির ছবি আঁকতে চেয়েছি। ছেলেবেলায় ছাতিম বনে পথ হারাবার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। গল্পে উপন্যাসে বারবার ফেলে আসা পথের স্মৃতি জায়গা করে নিল।
সুজনের মনে হল, জীবনে অনেক কিছু আমি পাইনি। কিন্তু যা পেয়েছি, সেটাও কম নয়। জীবন হাতে ধরে কত কি শেখালো। কত সামান্য মানুষের মধ্যে কত অসামান্য ভালোবাসা দেখলাম। কত আর্থিকভাবে বড় মানুষের হীনতা মনকে কষ্ট দিলো।
মনে মনে বলল, লেখায় নিজেকে জ্বালিয়ে আমি আমার সেরাটুকু দেবো। না পাবার কথাগুলো, আমার একান্ত থাক। চাঁদের কলঙ্কের মতো।
ভাবতে ভাবতে সুজন দূর দেশের যাত্রী হয়ে যায়। কত পাহাড় পর্বত, নদী সমুদ্র, ঊষর মরুভূমি পেরিয়ে কত দূরে চলে যায়। পথ হারাবার কথা ভেবে ও একদিন জীবনের পথে নেমে পড়ে।
সুজন একদিন যাযাবর হয়ে যায়। পৃথিবীর পথে হাঁটতে হাঁটতে কতদূর! ও ভাবে, আমি কি কোন স্বপ্ন দেখছি? না, ঠিক তা নয়। আমি কিছু একটা খুঁজছি।
আজ মনে হয়, আমি কোনো স্বপ্ন দেখি নি। আমি ভালোবাসাকে খুঁজছিলাম, প্রকৃতির মধ্যে, মানুষের মধ্যে। এভাবে মানুষের ভালোবাসা স্বপ্নের মতো আমার কাছে ফিরে আসবে, আমি তো কখনো এমন ভাবে ভাবি নি।
আজ ওর মা নেই, ওর জন্য মায়ের মনে অনেক কষ্ট ছিল। সবাই বলতো, তোর কিস্যু হবে না।
দেওয়ালে মায়ের প্রতিকৃতির সামনে সুজন এগিয়ে যায়। মনে মনে বলে, আমি পেরেছি মা, শুধু তুমি দেখলে না!
প্রতিকৃতির মধ্যে দিয়ে ওর মা যেন তখন
বলে উঠলেন, প্রকৃতি আর মানুষকে ভালোবাসিস তুই, সেই ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে মানুষ স্বপ্ন দ্যাখে,
মানুষের ভালোবাসাই তোর কাছে স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়।
সুজন মনে মনে ভাবে, তোর কিস্যু হবে না, কথাটা ওর কাছে কেমন আশীর্বাদী ফুল হয়ে ওর মাথার উপর অঝোর ধারায় ঝরে পড়তে থাকে।
ওর চোখে জল আসে।
এই চোখের জল টুকু কষ্টের, নাকি আনন্দের, সুজন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD