চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে উঠে অনিকেত বলল, আজও তোর ক্যালকুলেশন গুবলেট হয়েছে।
সুমন বলল, কেন? কি হলো?
অনিকেত বলল, আমাদের আগের কামরায় উঠেছে।
সুমন বলল, চল্, পরের স্টেশনে ওই কামরায় উঠে যাই।
অনিকেত বলল, তুই কি আমাকে ফেকলু মনে করিস?
সুমন বলল, আমার অ্যাজামসান ভুল ছিল, বুঝতে পারিনি।
অনিকেত রেগে বলল, কি করে তুই এইচএস এ অঙ্কে লেটার পেয়েছিলি রে? নির্ঘাত ছোথা মেরে পাশ করেছিস?
সুমন বলল, তোকে কে বললো, আমি অঙ্কে ছোথা মেরে পাশ করেছি?
অনিকেত বলল, একটা দায়িত্ব দিলাম, সেটা করতে পারলি না।
সুমন বলল, আমি অঙ্ক শিখেছিলাম, নঙ্গী স্কুলের আলী বাবুর কাছে।
অনিকেত বলল, উনি তো অঙ্কে সেরার সেরা টিচার।
মানুষটাও বড় ভালো। এমন সাদাসিধে, বড় মনের মানুষ আজকাল আর দেখা যায় না।
সুমন বলল, আমি ভুল স্বীকার করছি।
অনিকেত বলল, তুমি আশা করেছিলাম, তুই এটা পারবি।
সুমন বলল, সরি।
অনিকেত বলল, তুই আমার কথাটা একবার ভাবলি না?
সুমন বলল, এত চটে যাচ্ছিস কেন ?
অনিকেত বলল, বন্ধু হয়ে বন্ধুকে একটু হেল্প করতে পারিস না। আবার বিগ বিগ টক করিস্।
সুমন বলল, ফেরবার সময় আর একবার চেষ্টা করবো।
অনিকেশ বলল, কাউকে মিথ্যে আশা দিবি না।
ঘটনার সূত্রপাত দিন পাঁচেক আগে।
অনিকেত জানালার কাছে বসে ছিল। দুটো স্টেশন পর, ট্রেন থামলে মেয়েটি এই কামরায় উঠেছিল।
মাথায় কোঁকড়ানো চুল। গায়ের রঙ কালো। সাদা শাড়ি পরনে। কালোর মধ্যে এমন সুন্দর মুখ অনিকেত খুব একটা দ্যাখে নি।
ও ইংরেজি অনার্স নিয়ে থার্ড ইয়ারে পড়ে। মেয়েটাকে দেখে মনে হয়েছিল, সবে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে।
সেই থেকে অনিকেতের রাতের ঘুম চলে গেল।
ভালবাসলে, সর্বক্ষণ তাঁর কথা ভাবলে, গায়ে কেমন জ্বর জ্বর লাগে। কদিন আগে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে
বাটা সিনেমায় তিসরি মঞ্জিল সিনেমা দেখতে গিয়ে
ওর বন্ধু সুধীন আর রত্নদীপের পাল্লায় পড়ে জীবনে প্রথমবার সিগারেট টানা শিখেছিল।
তারপর জীবনের এই প্রথম প্রেম।
সবটাই একতরফা। মেয়েটার নাম জানা হয় নি। কোথায় থাকে, সেটাও অজানা। তবু ওই শ্যামাঙ্গী মেয়েটা সর্বক্ষণ জুড়ে আছে মন জুড়ে।
অনিকেত পরপর ক’দিন পর দেখা পেল না। মনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাউকে এ কথাটা বলা যাচ্ছে না।
দিন সাতেক কেটে গেল। এ বড় যন্ত্রণার মুহূর্ত। কিছুই ভালো লাগছে না। যখন দেখা দিলে, তখন কোথায় লুকোলে? অনিকেত মনে মনে ওর উদ্দেশ্যে বলল।
আশা প্রায় যখন ছেড়েই দিয়েছে, ভারী মন খারাপের অসুখ হয়েছে, তখনই কলেজ থেকে চারটে একচল্লিশের ট্রেনে ফেরবার সময় মেয়েটি বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে উঠে ওর মুখোমুখি বসলো।
অনিকেত ভীষণ নার্ভাস ফিল করল। এ যে দেখছি,
মেঘ না চাইতে জল!মেয়েটিও এরই মধ্যে ওর দিকে তাকিয়ে, ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সবুজ ধানক্ষেত দেখছিল।
হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে অনিকেতকে প্রশ্ন করল, আপনি কোন ইয়ার?
থার্ড ইয়ার।
অনার্স আছে?
ইংরেজী।
আপনি?
ফার্স্ট ইয়ার। মুরলীধর গার্লস কলেজ। ফিলোজফি অনার্স।
আপনার বাড়ি?
এইতো সন্তোষপুর। সুপার মার্কেটের পাশে।
আপনি কোথায় থাকেন?
বাটানগর।
কোথায় বলুন তো?
বাটা ব্রিজের পাশে, যেখানে মারাদোনা এসেছিলেন।
আপনি মারাদোনাকে দেখেছেন?
হ্যাঁ, কেন দেখবো না?
ও আচ্ছা।
আপনি কটার ট্রেনে কলেজে যান?
নটা ছত্রিশ।
আমিও ওই ট্রেনে যাবো। আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে, বিরক্ত হবেন না তো?
কেন? বিরক্তির কি আছে? মানুষ তো মানুষের সঙ্গে কথা বলবেই।
আপনার নাম?
তিলোত্তমা চৌধুরী।
আপনি?
অনিকেত সান্যাল।
ভালো লাগলো, আপনার সঙ্গে আলাপ করে।
আমারও।
নির্দিষ্ট স্টেশনে তিলোত্তমা নেমে গেল। অনিকেত ভাবল,ওহ, একটা বসন্তের বাতাস ছড়িয়ে অজস্র মুগ্ধতা দিয়ে চলে গেল তিলোত্তমা।
অনেকটা দূরে বসে ছিল সুধীন। মেয়েটা নেমে যেতেই, সামনে এলো। অনিকেতকে বলল, শালা,
তুই তো কেল্লাফতে করে দিয়েছিস। আজ সন্ধ্যায়
সার্ভিস মার্কেটে আমাদের সবাইকে মোগলাই খাওয়াতে হবে।
অনিকেত বলল, দুটো টিউশনি করি। মাস শেষ হতে আরো দুদিন বাকি। টিউশনির টাকাটা পেলে, অবশ্যই খাওয়াবো।
অনিকেত সান্যালের বাত, হাতির দাঁত।
অনিকেত লক্ষ্য করে দেখেছে, তিলোত্তমা বিশেষ একটা সাজগোজ কোনদিন করে না। কিন্তু ওর দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। ওর চোখে যেন কি একটা জাদু আছে।
আবার ভাবে, হয়তো এই বয়সটা এরকমই।
সবকিছুই ভালোলাগার, সবকিছুর মধ্যে মুগ্ধতা খুঁজে দেখার। অনিকেত হিসেব করে দেখেছে, প্রতিদিন সাতটা স্টেশন পার হতে ,ওর সঙ্গে কথা বলা যায়।
বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। মনের মধ্যে থাকা গভীর কথাগুলো ওকে তো বলতেই হবে। কিন্তু কিভাবে?
তিলোত্তমা বলল, তুমি সিনেমা দ্যাখো?
অনিকেত বলে, সিনেমার পোকা।শুক্রবার, প্রথম দিন,ম্যাটিনি শো।
বাংলা না হিন্দি ছবি?
দুটোই। আমার কোন বাছ বিচার নেই।
শনিবার টিকিট কাটি। যাবে আমার সঙ্গে?
যাবো। কিন্তু টিকিটের টাকাটা আমি দেবো।
আমি দিলে কি হয়েছে?
আরে, প্রথম মাসে টিউশনের অনেকগুলো টাকা পেয়েছি। আমি এখন বড়লোক, সেটা জানো?
আচ্ছা, তাই হবে। আমি তাহলে তোমাকে খাওয়াবো।
খুব ভালো কথা। চারদিকে এত বিয়ে হচ্ছে। কোথা থেকেও একটা ইনভিটেশন এলো না।
শনিবার সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ওরা শংকরের ফুচকা খেলো।
তিলোত্তমা বলল, জানো, বাবার অফিসের এক কলিগ ব্যানার্জি কাকু তোমার সঙ্গে আমাকে দেখে ফেলেছেন। বাড়িতে সবাই জেনে গেছে।
তাই নাকি!
মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি সত্যি কথা বলে দিয়েছি।
কি বলেছো?
বলেছি। তুমি আমার ভালো বন্ধু।
তারপর?
তারপর আর কি!মা বলেছেন, এমন কিছু করো না, যাতে বাড়ির মুখে কালি পড়ে।
আমাদের সাবধানে এগোতে হবে।
তুমি একটা চাকরির চেষ্টা করো না।
করবো, কথা দিচ্ছি।
সময়টা বিকেল। নদীর পাড়। কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়া।
নদীর ঢেউ। অনিকেত ও তিলোত্তমা পাশাপাশি বসেছিল।
কি ঠিক করলে?
চেষ্টা তো করছি। ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট মনে হয় আগামী সপ্তাহে বের হবে। একটা ক্ল্যারিক্যাল পোস্টে চাকরি নিশ্চয়ই জোগাড় করতে পারবো।
সেটাই দ্যাখো। নিউ ব্যারাকপুর থেকে সেদিন একদল পাত্রপক্ষ এসেছিল। আমি সামনে যেতে চাই নি। মা-বাবা জোরাজুরি করতে সামনে গিয়ে বসেছিলাম। তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করব না, মা-বাবাকে জানিয়ে দিয়েছি।
রেজাল্ট বের হল। অনিকেত অনার্সে ভালো নম্বর পেয়েছে। চাকরির চেষ্টা করছে। দুয়ারে দুয়ারে মাথা খুঁড়েও, কিছু হচ্ছে না।
চাকরি না থাকলে, পুরুষের কি জ্বালা, একমাত্র তাঁরাই সেটা বুঝতে পারে।
বাটা মোড়ে টিউশনি করে ফেরবার পথে আজ আবার তিলোত্তমার সঙ্গে অনিকেতের দেখা হলো।
কি ব্যাপার?
লেক গার্ডেন্স থেকে ওরা দেখতে এসেছিলেন।
আমি না করে দিয়েছি।
চাকরির কথা ভেবে, রাতে আমার চোখে ঘুম আসে না।
জানো, আমার বাবা তোমাকে আমাদের বাড়িতে গিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন।
ওরে বাবা। উনি কেমন মানুষ।
প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব। পুলিশ অফিসার। সাবধানে কথা বলতে হবে।
আমার যাওয়া কি ঠিক হবে?
গিয়ে দ্যাখো।
অনিকেত তিলোত্তমাদের বাড়িতে এসেছে।
বাইরের ঘরে ওকে বসতে দেওয়া হয়েছে।
জগদীশবাবু এলেন। বললেন, দুটো টিউশনি ছাড়া কিছুই তো করো না। বিয়ে করে কি খাবে, আর কি খাওয়াবে?
আমাকে যদি একটু সময় দেন।
ততদিনে আমার মেয়ে তো বুড়ি হয়ে যাবে।
তোমার বাড়িতে জানিয়েছো?
মাকে বলেছি।
বাবাকে?
বাবা নেই।
চাকরি পেলে, এমএ কমপ্লিট করতে পারবে?
নাইটে ভর্তি হবো।
স্টেনো গ্রাফি জানো?
জানি।
কাল সকালে হাইকোর্টে আমার এক ল ইয়ার বন্ধু
সনাতন গাঙ্গুলীর স্টেনো হিসেবে কাজে জয়েন করো। আমার কথা গিয়ে বলবে। আমি বলে রেখেছি। কাজটা হয়ে যাবে। তোমার মাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে একদিন এসো। ওনার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তিলোত্তমা যে বাবাকে জানে,তার এমন স্বাভাবিক আচরণ, ওকে খুব বিস্মিত করে।
অনিকেত চলে যাবার পর, জগদীশবাবু মেয়েকে ডাকেন। বলেন, কী খুশি তো?
বাপী, তুমি না ভীষণ ভালো।
কে বলল? আমি তো সারাদিন চোর গুন্ডা সামলাই।
তিলোত্তমা মনে মনে বলল, এই বাবাটাকে এতদিন আমি চিনতাম না।
জগদীশ বাবু বললেন, শোন মামনি, থানা চালানো, আর বাড়ির বড় কর্তা হিসেবে সংসার চালানো, দুটো ভিন্ন কাজ। তুই আমার একমাত্র মেয়ে। তোর খুশিটাই আমার আর তোর মায়ের একমাত্র লক্ষ্য।
ভালোবাসার উপর কখনো জোর করতে নেই।
আনন্দে তিলোত্তমার চোখে জল।
মা পদ্মা দেবী ততক্ষণে মেয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে তিনি বললেন, আমার বাবাও পুলিশের চাকরি করে বলে
প্রথমবার তোর বাবাকে পাত্র হিসেবে নাকচ করে দিয়েছিলেন। পরে ভেতরে ভেতরে খোঁজখবর নিয়ে
নিজেই ডেকে আমাদের বিয়ে দেন।
তুমি যে বললে, তোমার বাবাটা ভীষণ রাগী?
ঠিকই বলেছিলাম।
কিন্তু আমার সঙ্গে এত সুন্দর ব্যবহার করলেন, ওনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। আগামীকাল কাজে জয়েন করছি। বুধবার সন্ধ্যায় মাকে নিয়ে তোমাদের বাড়ি যাবো।
স্বপ্নটা সত্যি হচ্ছে বলো।
শুধু তোমার জন্য।
ঠিক বলছো না।
বলছি বলছি।
বলো, থানার বড়কর্তা লোকটা, আর বাড়ির বড় কর্তা লোকটার মধ্যে এত তফাৎ, এটা এতদিন জানতে পারিনি।
এই কথা শুনে ওরা দুজনেই একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠলো।