1. admin@mannanpresstv.com : admin :
গল্প -প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে -সুনির্মল বসু - মান্নান প্রেস টিভি
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন

গল্প -প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে -সুনির্মল বসু

এম.এ.মান্নান.মান্না:
  • Update Time : রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫
  • ১৬১ Time View
মুখার্জীদের বাড়ি এই অঞ্চলে জমিদার বাড়ি হিসেবে বিশেষ বিখ্যাত। ইদানিংকালে জমিদারি না থাকলেও, এই প্রাচীন বাড়িটি দেখবার জন্য বাইরে থেকে অনেকেই উৎসাহী হয়ে আসেন। বিরাট দর দালান, পূজো মন্ডপ, বড় বড় থাম, বাড়ির সামনে মূল ফটকের মাথায় দুটি পাথরের সিংহ।
ওদের কাছারি বাড়ি, এখন একটা নামকরা স্কুল হয়েছে।
বাড়ির সামনে বিশাল পুকুর। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় সবাই বাড়িটার দিকে একবার চেয়ে দ্যাখে।
দীপ্তিময় এই স্কুলের খুবই কৃতী ছাত্র। ওর বাবা সামান্য কারখানার কর্মী। প্রবল অভাবের সংসার।
দীপ্তিময় ক্লাসের ফার্স্ট বয়। মাধ্যমিকে ও রাজ্যের মধ্যে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিল।
এই স্কুলেই ও বর্তমানে ইলেভেন ক্লাসে পড়ে। অনল, সুজন, পরিতোষ ওর কাছের বন্ধু। স্কুলে যাবার পথে ওদের মধ্যে কথা হচ্ছিল।
সুজন বলল, রবি ঠাকুর আমাদের কসিমুদ্দিন রোড ধরে বাটানগরে এসেছিলেন।
অনল বলল, কেন?
পরিতোষ বলল, আমি শুনেছি, তখনো বাটার রাস্তা তৈরি হয়নি। কাঁচা রাস্তা ধরে মানুষ ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে আসতো।
ওরা শিবতলার দিক থেকে এভাবেই প্রতিদিন হেঁটে আসে। দীপ্তিময় বলল,পা চালিয়ে যেতে হবে। দেরি হলে, হেড স্যার স্কুলে ঢুকতে দেবেন না।
হঠাৎ দীপ্তিময় আম গাছের নিচে দিয়ে পুকুরপাড় ধরে আসবার সময় লক্ষ্য করলো, মুখার্জী বাড়ির
ছাদের উপর ফুটফুটে ফর্সা সাদা শাড়ি পরা একটি অল্প বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও মাথা নিচু করে ফেলল।
পরিতোষ বলল, ওর নাম নন্দিনী। কলকাতার একটি নামী মেয়েদের স্কুলে পড়ে। আজ বোধহয় স্কুল যায়নি।
অনল বলল, জমিদার বাড়ির মেয়ে। ওরা রাজহাঁস।
আমাদের দিকে তাকালে, ধন্য হয়ে যাই।
সুজন বলল, চল, দেরি হয়ে যাবে।
ওরা স্কুলে ঢুকে পড়ে।
পরে বন্ধুরা দীপ্তিময়কে জানিয়েছে, শনিবার ওদের স্কুল ছুটি থাকে। তাই ওকে ছাদে দেখা যায়।
দীপ্তিময় পড়াশুনা নিয়ে থাকে। এসব ব্যাপারে কোনোকালেই ওর মাথা ব্যাথা নেই। মাধ্যমিকে ভালো ফল করায়, কাগজে ওর ছবি বেরিয়েছিল।
সেদিন স্কুল যাবার পথে মেয়েটি ওদের গেটের সামনে নেমে আসে। দীপ্তিময় সেদিন একাই ছিল। ওকে বলে, আমি নন্দিনী। তুমি তো খুব ভালো ছেলে। আমি তোমার খুব ফ্যান। আমার বন্ধু হবে তুমি?
দীপ্তিময় কেঁপে উঠেছিল সেদিন। ওর পুরো পরিবার ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে। ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সারারাত জেগে পড়াশোনা করে ও।
এখন পথভ্রষ্ট হলে চলবে না।
ও বলে, আমার অনেক সমস্যা। আমার অনেক দায়িত্ব। প্লিজ, আমাকে বাদ দিন।
নন্দিনী বলে, আমাকে তুমি বলবে। আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। ভয় কিসের!
দীপ্তিময় মনে মনে বলে, আমার দারিদ্র আমার ভয়।
মা-বাবা বড় কষ্ট করে আমাকে বড় করে তুলেছেন। আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওদের পাশে দাঁড়াতে চাই।
ও মুখে কিছু বলে না। মাথা নিচু করে স্কুলের দিকে হেঁটে চলে যায়।
নন্দিনী কিন্তু ওর পিছু ছাড়ে না।
দীপ্তিময় ভাবে, ওরা কত বড়লোক। ওই মেয়ে তো একটা আস্ত পরী। আমি আমার কষ্টের জীবনে ওকে কি করে আনতে পারি? একেবারে অসম্ভব। ভাবা যায় না। বামন হয়ে আমি কেন চাঁদে হাত বাড়াতে যাবো?
বছর ঘুরে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে আবারো রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলো দীপ্তিময়। জয়েন্ট দিয়ে মেডিকেলে চান্স পেল। নন্দিনী তখন লেডি ব্র্যাবন কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ে। কলেজে যাবার পথে মাঝে মাঝে ওদের দেখা হয়।
দীপ্তিময় ওকে বুঝিয়েছে, যা সম্ভব নয়, সেটা না ভাবাই ভালো। কত বড় ঘরে বিয়ে হবে তোমার! আমার কথা তখন তোমার মনেই পড়বে না।
নন্দিনী বলেছে, ভালোবাসার তুমি কি জানো?
মানে?
ভালোবাসার জন্য আমি সবকিছু ছাড়তে পারি।
কিন্তু আমি পারিনা। আমাকে ক্ষমা করো।
ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। নন্দিনীর বাবা পূর্ণেন্দু মুখার্জী বালিগঞ্জের এক অত্যন্ত ধনী ব্যক্তির একমাত্র ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন। ছেলেটি বড় বিজনেসম্যান। শহরে তিনটে বাড়ি, গাড়ি সবই আছে।
বিয়ের দিনে আলোয় আলোয় ভরে গিয়েছিল মুখার্জি বাড়ি। রাস্তায় কয়েকশো গাড়ির লাইন।
কদিন আগে নন্দিনী পরিতোষের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছিল দীপ্তিময়কে। লিখেছিল, তুমি রাজি থাকলে, আমি বাড়ি ছেড়ে তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধতে যেতে পারি। তোমার ডিসিশন আমাকে জানাও।
দীপ্তিময় ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কোনো উত্তর দেয়নি।
নন্দিনীর বিয়ে হয়ে গেল। দীপ্তিময়ের মনে সেদিন কি কষ্ট হয়নি? হয়েছিল। নিজের চোখে ওকে বধূ বেশে চলে যেতে দেখে, সারারাত ঘুমোতে পারিনি দীপ্তিময়। মনে মনে ভেবেছিল, ও কি তাহলে এর মধ্যে নন্দিনীকে ভালোবেসে ফেলেছে? ভালবাসলে, বুকের মধ্যে এত কষ্ট হয় কেন?
মেয়ের বিয়ে দেবার পর, পূর্ণেন্দু মুখার্জী এবার
দীপ্তিময়ের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাবার জন্য সব রকম প্রস্তুতি নিলেন। ওর বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা করা হলো। অভিযোগ, দীপ্তিময় তাঁর মেয়েকে প্রতিদিন পথেঘাটে ডিস্টার্ব করত। স্থানীয় মস্তান বাহিনী দিয়ে ওকে ভয় দেখানো হলো। প্রিয় শহর ছেড়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে ওকে শহরের বস্তিতে উঠে যেতে হল।
অনেক বছর বাদে, বিচারের শেষে কোর্ট থেকে রায় বেরোলো, দীপ্তিময় নিরপরাধ। ও বেকসুর খালাস পেল, আদালত থেকে।
নন্দিনীর শ্বশুর বাড়িতে ওর অভিজ্ঞতা ভালো হলো না। ওর স্বামী পাহাড় মাতাল। রাতে বাড়ি ফিরে, রীতিমতো বউয়ের উপর অত্যাচার চালাতো। শহরে তাঁর অনেক বান্ধবী। অনেকদিন বাড়ি ফিরত না।
নন্দিনী বাপের বাড়িতে এসে প্রথম প্রথম এসব কথা কখনো বলেনি।
এক সময় একেবারে অপারগ হয়ে মাকে চিঠি লিখে জানায়, মা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।
কিছুদিন বাদে ওর স্বামী অসুস্থ হলো। চিকিৎসকরা বললেন, লিভার ক্যান্সার। বললেন, এরপর মদ খেলে, লিভার বাস্ট করবে।
কিছুদিন বাদে ওর স্বামী মারা গেল। নন্দিনী এখন বিপুল সম্পত্তির মালিক। ভাবলো, এবার ধর্ম স্থানে ঘুরে বেড়াবে। শহর কলকাতা থেকে অনেক দূরে চলে যাবে।
ততদিনে কলকাতার নামী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েছে দীপ্তিময়। গরমের ছুটিতে মনসা পাহাড়ে বেড়াতে গেল।
ওর মা-বাবা ততদিনে মারা গিয়েছেন। দীপ্তিময় বিয়ে করেনি। সারাদিন রোগী দেখা ছাড়াও, গরীব রোগীদের জন্য বিনামূল্যে পরিষেবা দেয়। ওষুধ কিনে দেয়।
পাহাড়ের পাকদন্ডী পথ বেয়ে দীপ্তিময় এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল, সাদা শাড়ি পরা নন্দিনী ওই পথেই পাহাড় থেকে নেমে আসছে।
দুজনেই বাকরুদ্ধ।
নন্দিনী প্রথম কথা বলল, কেমন আছো?
দীপ্তিময় বলল, আছি একরকম। তুমি?
দ্যাখো, আমাকে কি সাজে সাজিয়ে দিয়ে গেছে সে।
মানে?
ও মারা গেছে এক বছর হল। বাৎসরিক কাজ শেষ করে আমি এখানে এসেছি। তুমি বোধ হয় আমাকে ভুলে গেছো!
দীপ্তিময় বলল, আজ আমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত। সেদিন তোমার পাশে দাঁড়াতে পারিনি। সে বড় কষ্টের দিন ছিল আমার।
নন্দিনী বলল, বাবা-মার ইচ্ছেমতো বিয়ে করলাম।
তোমাকে জানিয়েছিলাম, তুমি সাড়া দাওনি। কী ভালো হলো আমার?
একদল সাধু পাহাড় থেকে নেমে আসছিল। ওরা একসঙ্গে বলে উঠলো, যো কুছ হ্যাঁয়,সব
তুহি হ্যাঁয়!
দীপ্তিময় বলল, একদিন তুমি আমাকে ভালোবেসে ছিলে নন্দিনী, সেদিন আমি তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারিনি। আজকে আবার আমরা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারি?
নন্দিনী দীপ্তিময়ের কাঁধে মাথা রাখলো। বলল,
আমি সারা জীবন একটা চরিত্রবান শক্ত কাঁধে মাথা রাখতে চেয়েছিলাম।
পাহাড়ের মাথা থেকে মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনি বেজে উঠছিল। দীপ্তিময় ভাবছিল, এই বয়সে কি ভালোবাসা থাকে? নন্দিনী চিরকাল নিঃশর্তে ভালোবেসে গেছে ওকে। সেদিন ওকে না বলেছিল
দীপ্তিময়। আজ কোন সাহসে সেই ভালোবাসাকে অস্বীকার করবে? মাথার উপর পাহাড়ের চূড়ার দিকে চেয়ে দীপ্তিময় নন্দিনীকে বলল, তোমার বিয়ের দিনে সারারাত খুব কেঁদেছিলাম আমি। আজ আমি আমার ভালোবাসার সর্বস্ব তোমাকে দিলাম।
নন্দিনী, ঈশ্বর বোধ হয় তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন।
নন্দিনী যখন কেঁদে ফেলেছে। কান্নার মধ্যে এত সুখ থাকে, আজ জীবনে নতুন করে জানতে পারলো ও।
দূর পাহাড়ের মাথায় দেবদারু গাছের উপর উদাসী হাওয়া বয়ে গেল।
ভালোবাসা তখন ঈশ্বর হয়ে গেছে।
সাধুদের কথাগুলো ওদের দুজনের মনে বেজে উঠছিল, যো কুছ হ্যাঁয়,সব তুহি হ্যাঁয়!

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD