রাতে একজন আত্মীয় ফোন করে বললেন তাদের বাড়ি যেতে পারবো কিনা, কারণ জানতে চাইলে বললেন। তার ছোট ভাই অসুস্থ, তাকে একটু দেখতে হবে। বললাম ডাক্তার দেখান।
দেখিয়েছি, অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষার পরও কোনো রোগ ধরা পড়েনি।
এখন কি অবস্থা।
ভালোনা, শরীরে পানি জমে ফুলে যাচ্ছে, কয়েকদিন থেকে খাওয়া দাওয়া বন্ধ।
ডাক্তার কি বলেছেন।
ডাক্তার বলেছেন একজন কবিরাজ দেখাতে জিন অথবা কালোজাদু আছে কিনা।
ডাক্তার এগুলো বিশ্বাস করেন?
হ্যাঁ ডাক্তারতো তাই বললেন।
আমিতো কবিরাজ না।
ভাই আপনি যেহেতু এগুলো পারেন, আমার ভাইটাকে একটাবার যদি দেখতেন, একথা বলে কেঁদে দিলেন। কান্নার আওয়াজে আর না করতে পারিনি।
ঠিক আছে সকালে আসবো ইনশাআল্লাহ। আত্মীয়ের বাড়ি ৫-৬ কিলোমিটারের দূরের পথ তাই বন্ধু মান্নানকে ফোন দিলাম।
কিরে কালকে কোনো কাজ আছে?
কেন?
তোর মোটরসাইকেল ঠিক আছে?
কোথায় যাবি?
রোগী দেখার কথা গোপন করে বললাম, এক আত্মীয়ের বাড়ি যাবো।
ঠিক আছে সকালে বাজারে এসে ফোন দিস।
পরদিন মান্নানকে নিয়ে রওয়ানা হলাম। মান্নান তখনো যাওয়ার উদ্দেশ্য জানেনা। সে মনে করেছে ছোট বোনের বাড়িতে যাব তাই বললো, আমরা কি তোর ছোট বোনের বাড়িতে যাব?
না
তাহলে?
তাকে সব কিছু বলার পর, আড় চোখে তাকিয়ে বললো।
কবে থেকে এসব করিস! কই কখনো বলিস নিতো।
আরে বেটা এগুলো বলার কথা! মানুষতো পরে আমার আসল পরিচয় বাদ দিয়ে কবিরাজ বলে ডাকবে।
ঠিক আছে আজকে তোর কবিরাজি দেখবো।
পৌঁছে গেলাম সেই আত্মীয়ের বাড়িতে। রোগী খাটের ওপর শোয়া শরীরে পানি জমে ফুলে গেছে, আস্তে আস্তে কথা বলতে পারে। অবস্থা দেখে মনে হলো সময় বেশি নাই। পাশে গিয়ে বসলাম, তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। হঠাৎ পাশের খাটে চিৎকার কয়েকজন মিলে এক মেয়েকে চেপে ধরে আছে আর মেয়েটি সবাইকে ঝাড়া মেরে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। মেয়ের বড় বোনকে বললাম, কি হয়েছে ওর?
ওর সাথে জিনের আছর আছে, খুব কষ্ট দেয়, মাঝে মাঝে ওর স্বামীকেও মারধরের চেষ্টা করে।
এবার রোগী রেখে কিছু দোয়া পড়ে মেয়েটির হাত চেপে ধরলাম, ওমনি বাঘের মতো গর্জন করে উঠলো।
খবরদার আমাকে ধরবিনা কিছু করবিনা, যদি করিস তাহলে তোর দুই সন্তানসহ পুরো বংশ শেষ করে দেব।
আমার দুই সন্তান তোকে কে বলেছে।
কেউ বলেনি আমি জানি তোর এক ছেলে এক মেয়ে! কথা শুনে উপস্থিত সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকায়, কথাতো সত্যি আমার এক ছেলে এক মেয়ে।
আচ্ছা তুই এসব জানলি কিভাবে? আর আমাকে চিনিস? তোর চাইতে বড় বড় কত জিনকে শিক্ষা দিয়েছি সেসব জানিস তুই?
জানি! আমাকে ওইসব ভয় দেখিয়ে লাভ হবেনা!
তাই নাকি! আচ্ছা নাম কি তোর!
নাম দিয়ে কি করবি, আমি নাম বলবোনা।
বেয়াদবি করবিনা বলছি, যা যা বলবো সোজা সোজাসাপটা জবাব দিবি।
তুই যদি জিন হয়ে থাকিস তাহলে ওকে ধরলি কেন?
ওকে আমার ভালো লাগে তাই ধরেছি।
থাকিস কোথায়।
ওর স্বামীর বাড়ির পাশে খোলা ভিটি বাড়িতে।
কিভাবে ধরলি!
দুপুর বেলায় ওই ভিটি বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার সামনে পড়ে যায়। তাকে দেখেই আমার ভালো লেগে যায়, আমি তাকে নিয়ে যাবো।
ওর বিয়ে হয়েছে, স্বামী আছে।
প্রয়োজনে ওর স্বামীকে মেরে তাকে নিয়ে যাবো, না পারলে ওকেও মেরে ফেলবো।
বলিস কি তুই!
হ্যাঁ ঠিকই বলছি! ভাবলাম নরম কথায় কাজ হবেনা তাই ধমক দিয়ে বললাম ওকে মারার আগে তোকে যদি মেরে ফেলি! তাই মরতে না চাইলে এখনি ওকে ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যা, না হয় সত্যি সত্যি তোকে মেরে ফেলবো। একথা বলেই পড়া পানি তার শরীরে ছিটিয়ে দেই। পানির ফোটা পড়তেই চিৎকার করে ওঠে, আমার সব পুড়ে যাচ্ছে একথা বলেই কাঁদতে থাকে! কাঁদতে কাঁদতেই বলতে থাকে, আমাকে ছেড়ে দে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!
কেন! আমি কি তোকে মারছি?
তোর ছিটানো পানি আমাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে মনে হচ্ছে প্রতিটি পানির ফোটা এসিড! দয়া করে আমাকে ছেড়ে দে আমি চলে যাবো।
সত্যি যাবি
হ্যাঁ যাবো, তোর আল্লাহর দোহাই আমাকে আর কষ্ট দিসনা।
ঠিক আছে! যাবি যেহেতু, তাহলে কিভাবে যাবি বল। তখন জানালার দিকে ইশারা করে বললো, জানালা বরাবর আমগাছে ছোট একটি আম আছে, আমি যাওয়ার সময় সেটি ঝরে পড়ে যাবে। তার কথা শুনে সবাই তাকিয়ে দেখলো ঠিকই সেখানে একটি আম আছে।
মনে হলো কিছুটা দুর্বল হয়েছে। চুপচাপ বসে আছে হঠাৎ নরম সূরে বললো ছেড়ে দেবো তবে মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যাবো। আবারো ধমক দিয়ে বললাম না সেটা হবেনা, গেলে একবারেই যেতে হবে। এবার সে বেঁকে বসে।
তাহলে আমিও যাবোনা, গেলে ওকে নিয়েই যাবো। আবারো পড়া পানি ছিটিয়ে দিতেই জ্বলে গেলাম পুড়ে গেলাম বলে চিৎকার শুরু করে দেয়। তার চিৎকারে পুরো ঘর যেন কেঁপে ওঠে। চিৎকারের মাঝেই এক চা চামচ পানি খাইয়ে দেই তাকে। পানি মুখে দিতেই ওমাগো বলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে! উপস্থিত সবাই বলাবলি করছে মনে হচ্ছে চলে গেছে। মান্নানকে বললাম ও চং ধরেছে ওর বাম হাতটা শক্ত করে ধরে রাখ। কিছুক্ষণ পর বলে উঠলো আমাকে এত কষ্ট না দিয়ে একবারে মেরে ফেল!
তোকেতো ছেড়ে দিতে চাচ্ছি কিন্তু তুইতো যাসনা। আচ্ছা
তোর বাবা,মা ভাইবোন আছে?
হ্যাঁ আছে।
তারা কোথায়।
তারা বোতলে বন্দি আছে!
তাহলেতো তোরা সবাই খারাপ! এখন সত্যি সত্যি বল তুই যাবি? আমিতো যেতে চাইছিলাম তুইতো আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছিস! আমি কি তোকে মারধর করছি!
মারধর করিসনি ঠিকই যে পানি খাইয়েছিস সেটি আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
ঠিক আছে যেতে যখন পারবিনা তখন তোর বাবা মায়ের মতো বোতলে ঢুকবি?
আমি রাজি তবুও আমাকে ছেড়ে দে!
আচ্ছা বোতলে কিভাবে ঢুকবি? এবার সে বললো আমার বন্ধু মান্নানের আকৃতি নিয়ে বোতলে ঢুকবে এবং আমি শুধু তাকে দেখতে পাবো। তখন তাকে বললাম আমি দেখলে হবেনা উপস্থিত সবাই দেখতে হবে। ইতোমধ্যে সাদা বোতল নিয়ে আসা হলো, চারপাশে কৌতূহলী নারী পুরুষ। বোতল সামনে ধরে আবারো বললাম সবাই যেন তোকে দেখতে পায় একথা বলতেই বোতলের ভেতরে শাহাদাত আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে মুখের কাছে নিয়ে গেল মনে হলো বোতলটি গিলে ফেলবে আর চিৎকার দিয়ে বোতলের ভেতরে ইশারা করে মেয়েটি কাত হয়ে পড়ে গেল। তখন বোতলের ভেতরে তাকিয়ে দেখি মাছির মত পোকা নড়াচড়া করছে, দ্রুত বোতলের মুখ আটকে দেই। সবাই হাতে নিয়ে দেখতে থাকে মাছির মত পোকার আকৃতি ধারণ করা জিনকে। অনেকেই বলতে থাকেন জীবনে এমন আশ্চর্য ঘটনা দেখেননি। আমি নিজেও অবাক না হয়ে পারলাম না। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একটি জিনকে বোতল বন্দি করতে পারা সত্যিই আনন্দের। বন্ধু মান্নানের চোখতো ছানাবড়া। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠে বসলো। এবার যে রোগীকে দেখতে গিয়েছিলাম তাকে দেখে তার বোনকে বললাম মনে হচ্ছে তার সময় শেষ, আজকে যা খেতে চাইবে সব খাওয়াবেন। বোন বললেন কয়েকদিন থেকে এক ফোটা পানিও মুখে দেয়না। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম হয়তো আজকে খেতে পারে। যেহেতু আত্মীয় তাই আমাদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করেন খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুই বন্ধু চলে আসি। আসার আগে বোতলে বন্দি জিনকে মাটির নিচে দাফন করতে বলে দেই। সেদিন রাত শেষে ভোর চারটার দিকে রোগীর বোন ফোন দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালো তার ভাই পাঁচ বছরের খাওয়া একসাথে খেয়ে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
(প্রায় দেড়যুগ আগের সত্য ঘটনার গল্প)
১৭-০২-২০২৪