1. admin@mannanpresstv.com : admin :
হাসি আনন্দ -কল্পনা মমতাজ - মান্নান প্রেস টিভি
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০১ অপরাহ্ন

হাসি আনন্দ –কল্পনা মমতাজ

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০২৪
  • ১৭২ Time View
আ*গুনের গোলাটা যখন আমার সামনে এসে থেমে যায়, আমি যেন প্রতিবারই এই ভেবে অবাক হই যে, একটা মানুষ এত সুন্দর করে কথা বলে কী করে!
ও যখন আসে আমি তা আগেই বুঝতে পারি, কেমন যেন হঠাৎই এক মিষ্টি গন্ধের আবির্ভাব হয়। অজানা এক প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে আমার শিরা উপশিরায়,আমি মুগ্ধ হয়ে উপলদ্ধি করি। প্রথম দিনে একটু ভয় ভয় লেগেছিল বৈকি।
এখন অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
খবর পেয়েছিলাম দাদুর শরীরটা অনেক খারাপ, তাই ফোন পেয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছি গ্রামের বাড়িতে। ট্রেনে বসে হেডফোনে গান শুনছিলাম। ভাগ্যক্রমে জানালার পাশে সিট পাওয়াতে বেশ আরামেই মাথাটা এলিয়ে আধশোয়া হয়ে বাহিরের গাছপালা দেখছি। কখন যেন চোখ লেগে আসে, তখনই পরিচিতো একটা মিষ্টিগন্ধ নাকে এসে লাগলো। মনে হলো অনেকটা রজনীগন্ধা আর বেলিফুলের মিশ্রিত ঘ্রাণ হলে যেমনটা হবে তেমনটাই, তবে খুব হালকা ফ্রেগনেন্স(সুবাস)।
চোখ বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে ভাববো কোন ফুলের, তখনই হালকা গন্ধটা যেন মিলিয়ে গেল।
ব্যপারটা ওখানেই শেষ করে ট্রেনথেকে রাত দেড়টা নাগাদ নামলাম।
দাদাবাড়ি বেশ দূরে নয়, ঘন্টাখানেকের রাস্তা।
ষ্টেশন থেকে রিক্সা বা অটোতে করেই বাড়ির দিকে যেতে হয়। রিক্সাতো দূরের কথা, আশেপাশে অটোর নামগন্ধও নেই। ষ্টেশন প্লাটফর্মথেকে বেরিয়ে অনেকটা দূরে বাহিরে এসে আধো ছাঁয়ায় একটা ভ্যান দেখতে পেলাম। আঁকাশে আবছা চাঁদের আলো, গ্রামের রাস্তায় বেশ হেলেদুলেই যাচ্ছে ভ্যানটা। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা, ভ্যানচালক কোন কথা না বলেই আমায় নিয়ে রওনা দিলেন। আর দিলেনতো দিলেনই কোথায় যাব একবার জিঙ্গেসও করলেন না, খুব অদ্ভুৎ!
বাড়ির সামনে নেমে ভাড়া কত জিঙ্গাসা করার সুযোগ না দিয়েই দেখি ভদ্রলোক তার ভ্যান নিয়ে উল্টোপথে রওনা দিচ্ছেন। পেছন থেকে বেশ কয়েকবার ডাকলাম কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই।
ছোট থেকেই দেখে এসেছি দাদুর বেশ নামডাক। গ্রামের সবাই ওনাকে মান্য করেন। “দাদুর পরিচিতো কেউ তাই হয়ত ভাড়া নেননি” নিজেকে এটুকু বোঝানো ছাড়া সেই মুহুর্তে আর কোন যুক্তিই খুঁজে পাইনি। ঘরে ঢুকে দেখি দাদু তার রুমে দিব্বি নাক ডেকে ঘুমচ্ছেন। অনেকবছর ধরেই রহিম চাচা দাদুকে দেখাশোনা করেন। খেতে বসে রহিম চাচাকে দাদুর কথা জিজ্ঞেস করলে চাচা বলেন, কাল নাকি আমাদের পুকুরে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলবে আর সেই মাছধরার দৃশ্য দাদু আমাকে সাথে নিয়ে উপোভোগ করার জন্যই মিথ্যে অসুস্থতার বাহানায় আমাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা।
দাদুও মাঝেসাঝে বড্ড ছেলেমানুষ হয়ে যান। অবশ্য হওয়াটা অযোক্তিক নয়। ছেলেমেয়েদের কাছথেকে এতদূরে একা মানুষটা শেষ বয়সে একটুতো এমনটা করবেনই। তাছাড়া দাদুর সবচাইতে প্রিয় মানুষটা বলি বা শেষ বয়সের বাচ্চাবন্ধু বলি দুটোই আমি।
দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকি, যত ব্যস্তই থাকি না কেন, নিয়ম করে দু-তিনদিন পরপর দাদুর সাথে বেশ কিছুক্ষণ ফোনকলে কথা বলতেই হবে।
কী আর করা?
সেই দাদু অসুস্থ শুনে দৌঁড়ে এলাম গ্রামের বাড়ি আর দাদু আমার ঘুমের রাজ্যে বিভোর!
দাদুকে বিরক্ত না করে একা একাই ছাদে হাটাহাটি করছিলাম। বেশ গভীরভাবেই ভাবছিলাম ভ্যানচালক ভদ্রলোক এমন অদ্ভুদ আচরণ কেন করলেন? একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছি। আনুমানিক রাত “আড়াঁইটা” হবে তখন। হঠাৎ সেই পরিচিত মিষ্টি গন্ধযুক্ত বাতাস গায়ে লাগল! কেন জানি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতে লাগলাম। এবার ফ্রেগনেন্সটা বেশ কড়া ভাবেই পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ ঠোঁটে ধরানো জলন্ত সিগারেট কে যেন কেড়ে নিয়ে পায়ের কাছে ফেলে দিলো।
এত রাতে তবে কি দাদু ছাদে এলেন?
না দাদু না,আশেপাশে দূরের কথা সম্পূর্ণ ছাদেইতো কেউ নেই। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা!
অনেকটা ভয়ে ভয়েই সিগারেট আবার তুলতে যাব তখন স্পষ্ট বুঝতে পারলাম কেউ একজন আমার হাত চেপে ধরল। আমি ঐ সিগারেট আর হাতে নিতে পারলাম না। আমার ভিতরে একটা অদৃশ্য ভয় কাজ করতে লাগলো,তাই আর দেরি না করে ছাদ থেকে নেমে ঘরে চলে গেলাম।
সারারাত ঘুম এলো না। ঘটে যাওয়া আজকের দুটো ঘটনাই মনের মধ্যে বেশ তোলপাড় তুলেছে। যতুটুকু পারা যায় যুক্তি দিয়ে নিজেকে মিথ্যা প্রমাণ করার সর্বোচ্চ ব্যার্থ প্রয়াস করলাম বাকিটা রাত। ভোরের আযান হলো, নামায পড়লাম। বিছানায় শুয়ে ঘুমের চেষ্টা, এরিমধ্যে চোখ দুটোও একটু লেগে আসে। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। সকালে দাদুর সাথে নাস্তার টেবিলে মাছ ধরার ব্যাপার নিয়ে টুকটাক কথা বিনিময় হলেও রাতের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ চেঁপে গেলাম।
যথাসময়ে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হলো। দুপুরে বেশ আয়েশ করেই দাদুর সাথে বসে খাবার খেলাম। বিকেলে ঢাকায় ফেরার পালা।
দাদুকে কত বলি, “তুমি আমাদের সাথে ঢাকার বাড়িতেই থাকবে” কিন্তু না উনার একই কথা, এই মাটির গন্ধ ছাড়া তিনি নাকি বাঁচতে পারবেন না। ঢাকার বাড়িতে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এই টাইপের আরও কত কী। ব্যস্ততম দুনিয়ায় বেঁচে থাকার তাগিদে আমাকে ঢাকায় ফিরে আসতেই হবে আর তাইতো তৈরী হচ্ছিলাম।
আমাকে তৈরী হতে দেখেই দাদু একটু বায়না ধরে আমাকে আর দুটোদিন গ্রামের বাড়িতে থাকতে বললেন। আমিও গত রাতের ঘটনাটি চিন্তা করে রয়েই গেলাম। মনে মনে অন্যকিছু চিন্তা ঘুরছিল। অপেক্ষা করতে থাকলাম গভীর রাতের। রহস্যে ঘেরা কাল রাতের ধাঁধা দু’টো বেশ প্রভাবিত করছিল আমায়। আজ সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে মেতে উঠবো,নয়তো শান্তি পাবো না।
যেই কথা সেই কাজ!
রাত আনুমানিক দু’টোর কাছাকাছি হবে।
আজও আমি সিগারেটে আগুন ধরালাম, পুরো সিগারেট শেষ করে ফেললাম, অথচ সেই অশরীরীর কোন আভাস পাচ্ছি না আজ আর, একটু বিরক্তই হলাম। দাদুর পুরনো দোলনাতে বসে কীসব ভাবছি। হঠাৎই সেই মিষ্টি গন্ধের আবির্ভাব! আমি ইচ্ছে করেই আবারও সিগারেটে আগুন ধরালাম, সিগারেট মুখে নিতেই কেউ আমার মুখ থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেললো। আমি অবাক হয়ে চারপাশে তাকালাম কিন্তু না আজও কাউকে দেখতে পেলাম না।
মনে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করেই বলে উঠলাম-
-কে তুমি,আমার সিগারেট কেন কেড়ে নিলে?
এটুকু বলেই নিজেকে নিজের কাছে বোকা মনে হল। আমি কি তবে পাগলামি করছি?
নয়ত সারাটা ছাদে আমি ছাড়া কেউ নেই এটা দেখার পরেও কাকে উদ্দেশ্য করে এসব বললাম?
আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে হঠাৎ একটা মেয়েলি কন্ঠে হাসির শব্দ ভেসে এল। এবার জোড়গলায় আবারও জিজ্ঞেস করলাম
-কে তুমি?
-তোমার ভালোবাসা বলতে পার!
মিহি কন্ঠে এটুকু বলেই আবারও সেই মৃদু হাসির শব্দ
আমি বলে উঠলাম
-তবে আড়ালে কেন সামনে আসো
মিহি কন্ঠে সে বলল,
-তুমি ভয় পাও যদি
এমনিতেই মশাইয়ের ভয়ে আধাখানা অবস্থা।
পূনরায় সেই হাসি।
মেয়েটার কন্ঠ শুনে বয়স অনুমান করতে গিয়ে মনে হলো, অনেকটা সতের/আঠারোর কাছাকাছি হবে হয়ত। তবে কিছুটা অবাক হলাম এই ভেবে, গ্রামাঞ্চলে থেকেও একটা মেয়ে এত শুদ্ধ আর সুন্দর করে কথা বলতে পারে। বাক্যে কোন রকমের জড়তা নেই!
আমি বলে উঠলাম
-না আমি ভয় পাব না। তুমি সামনে আসো
মুহুর্তের মধ্যোই চোখ ধাঁধিয়ে উঠল। একটা মাঝারি মাপের আগুনের গোলক আমার সামনে ভাসমান। মনে হল প্রচন্ড উত্তাপে যেন শরীর পুড়ে যাবে আমার। হাতের উল্টোপিঠে চোখ রাখতেই হঠাৎ আগুনের গোলাটা অদৃশ্য! সাথে মিষ্টি গন্ধটাও আর নেই! বুঝলাম,সে হঠাৎ করেই চলে গেল আর যাওয়ার আগে বলে গেল, “কাল আবার আসবো।”সারারাতে আর ঘুমতে পারলাম না। খুব অস্থির লাগছিলো। মনে অনেকটা আগ্রহ জন্মালো, অদৃশ্যকে দেখার জন্য। তাই দাদুর সাথে আহ্লাদী করে পরের দিনও গ্রামের বাড়িতে রয়ে গেলাম।
পরেরদিন মধ্যরাতে আবারও ছাদের দোলনায় বসে সিগারেটে আগুন ধরাতেই সেই মিস্টি গন্ধটা বুঝতে পারলাম। গতরাতের অভিজ্ঞতায় আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। হঠাৎই কাঁধে আলতো একটা হাতের স্পর্শ। পাশ ফিরে তাঁকাতেই আবিষ্কার করলাম, অপরূপা এক মেয়ের পাশে বসে আছি আমি। আজ সে আসলো এক সুন্দরী নারীর বেশে। আমি মুগ্ধ হয়ে নীলশাড়ি পরিহিতা রমণীর পরিচয় জানতে চাইলে সে একটু রহস্য করেই বলল, “মনে করার চেষ্টা করো।”
সেই মুহূর্তে তার প্রতিটা কথা, মায়াবি চাহনি, হাসির শব্দ বড্ড পরিচিতো মনে হচ্ছিল। ফেলে আসা অতীতের ঘ্রাণ পেলাম। দোলনায় পাশাপাশি বসে এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম দুজনে। হারিয়ে ফেলা কারও স্মৃতিচারণ মনে করিয়ে দিয়ে, অনুভবের সাগরে ডুবন্ত আমিটাকে অনেকটা এলোমেল করে দিয়ে সে আজও চলে গেলো। এরপর এমনি করে প্রায় দু/এক দিন পর পরই আমাদের দেখা হয়। আমি প্রতিদিনই অবাক হই তার কথা শুনে। আমি কবে, কখন, কোথায় যাই সে তার সবই জানে। বিশেষ করে আমার যখন মন খারাপ থাকে তখন সে ছুটে আসে আমার কাছে। নানান কথার ছলে মন ভাল করে দেয় আমার। ঢাকায় ফেরার আগের রাতে সে আমার হাতে তার কানের একটা দুল (ঝুমকা) দিয়ে বলেছিল “তুমি যেখানে যখন আমাকে মিস করবে তখন এই দুলটা ধরে মৃদু ঝুলাবে, আমি সাথে সাথেই তোমার কাছে চলে আসবো।”
আমি কথাটি অবিশ্বাস করলেও এক অজানা টানে কানের দুলটি খুব গোপনে নিজের কাছেই রেখে দিলাম। পরেরদিন ঢাকায় চলে আসলাম।
নিজের কাজে ব্যস্ত হলেও অশরীরীর প্রতি আমার কেমন যেন একটা টান অনুভব করতে লাগলাম। কিছুদিন পরে একদিন তার কথা খুব মনে পড়তেছিলো। ব্যাপারটি আমি কারো সাথেই শেয়ার করতে পারছিলাম না। হঠাৎ একদিন রাতে মনে অনেকটা সাহস নিয়ে ছাদে গিয়ে তার দেয়া কানের দুলটি দুই আঙ্গুলে তুলে নিলাম। একটু ঝুলিয়ে হালকা টোকা দিলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে এসে হাজির। ওয়াও আমি সত্যি সত্যি আবারও অবাক হলাম! আজ তার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে তার পরিচয় খুব জোর করেই জানতে চাইলাম। সে আমাকে আবারও বলে, “মনে করতে চেষ্টা করো।”
উফ্ আমি যেন কিছুই মনে করতে পারছি না কবে এই মেয়ের সাথে আমার পরিচয় বা কবে সে আমার প্রেমে পড়েছিলো।
তবে একটা কথা না বললেই নয়,
আমি তখন ইন্টার মিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কোলকাতায় মামার বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করি। বড়ো মামার কোন সন্তান নেই বলেই আমি মামার বাড়িতে অনেক আদরের ছিলাম। মামার বাড়ির আবদার বলে কথা!
নিজের ইচ্ছে মত অনেক টাকা খরচ করতাম বন্ধুদের সাথে নিয়ে। একবার বন্ধুরা মিলে কাঞ্চনজঙ্ঘায় “সূর্যোদয়” দেখার প্লান করি। হিমালয়ের কোল ঘেষে মাঝারি পাহাড়টার চূড়োয় এই অপূর্ব সূর্যোদয় দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে অনেক প্রকৃতিপ্রেমী। ফিরতী পথে দার্জিলিং হয়ে ফিরছিলাম। ছোট ছোট গ্রামের ঘরবাড়িগুলো সন্ধ্যার পরে যেন টিমটিম করা জোনাকির মত মনে হচ্ছিল। সেখানকার একটা গ্রামে ঘুরতে গিয়ে পথে বৃষ্টিতে আটকা পড়ে একটা দোকানের কোনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বন্ধুরা আগেই যে যার বাড়িরদিকে চলে গেছে, অথচ আমি বোকার মত একটি চালার নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করছিলাম।
আমার ঐঅবস্থা দেখে দোকানির মেয়ে ঘরের দরজায় হাত বাড়িয়েই একটা ভাঙা ছাতা দিয়ে বললো, “বাবু এই ছাতা মাথায় নিয়ে বাড়ি যাও। কাল বা পরশু সময় করে দিয়ে গেলেই হবে।”
দরজার আড়ালে থাকা মেয়েটার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করলেও কাঁচের নিল চুড়ি পরিহিতা মেয়েটির হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে কোন রকমে হোটেলে ফিরলাম ।
পরের দিন যখন ছাতা ফেরত দিতে এলাম তখন শুনি দোকানির মেয়ে ঘরে বসে কান্না করছে। দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে সে আমাকে তাদের কষ্টের কথাগুলো সব খুলে বলল। জানতে পারলাম, টাকার অভাবে তার এসএসসি পরীক্ষা দেয়া হচ্ছে না। মেয়েটার বাবা দোকান চালানোর পাশাপাশি ভালো এমাউন্টের অর্ডার পেলে ভ্যান চালায় বাড়তি আয়ের উদ্যেশ্যে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে তার বাবা গত দুদিন প্রচন্ড জ্বরে বিছানায় শোয়া। ঘরে কোন চাউল নেই যে রান্না করে খাবে। আর বাবা কাজ না করতে পারলে তারও পড়াশুনা করা হবে না।
সবটা শুনে খুব খারাপ লাগল, আমার ভিতরের ভালমুনুষিটা মূহুর্তেই আমাকে কোন ভাল কাজের জন্য তাড়া দিলো। আমিও কাল বিলম্ব না করে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম, “চিন্তা করো না বোকা মেয়ে, তোমার পড়ালেখার সব খরচ আমি দিবো। তুমি পরীক্ষা দিবে আর ভালোভাবেই পাশ করবে।”
গায়ে পড়েই আমি ঐ মেয়ের পড়ালেখার সব খরচ নিজের হাতে তুলে নিলাম। মেয়েটার বাবাকে ডাক্তার দেখিয়ে প্রয়োজনীয় ঔষধ, ফলমূল নিয়ে দিলাম। আমার এহেন কাজ দেখে মেয়েটা অপরাধীর মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতেছিল। মেয়েটার অপরাধবোধ দেখে বুঝতে পারি, তার প্রচুর আত্মসম্মানবোধও আছে। একটা গরিব পরিবারের মেয়ে হয়েও এতটা সচেতনতাবোঁধ দেখে হয়ত তাকে পছন্দ করা শুরু করে দিয়েছিল আমার অবচেতন মন।কিন্তু সেই মুহুর্তে তাকে ইজি করার কোনও রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিলাম,
-তোমার যখন যা দরকার আমাকে এই নাম্বারে কল দিয়ে জানাবে। আর হ্যাঁ একদম মন খারাপ করবে না।
বেশ চিন্তিত মুখে মেয়েটা বললো,
-আপনার উপকারের প্রতিদান যদি কখনও দিতে না পারি?
এবার আমি কিছুটা কৌতুক করেই বললাম,
-তবে যৌতুক হিসেবে আমার সাথে নিয়ে যাব তোমায়! যাবে তো?
মেয়েটা হয়ত আমার দুষ্টামির কথাটা বুঝতে পারেনি, তবে যৌতুক শব্দটা শুনে লাজুক একটা হাসি দিলো।
মেয়েটার পড়াশোনার সমস্ত খরচ আমি চালিয়েছি। সে মেধাবী, পরীক্ষা সবগুলোই খুব ভাল হয় তার। এরমধ্যে আমারও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্সে এডমিশন পেয়ে গেলাম। শুনেছি তার এসএসসি রেজাল্টও খুব ভাল হয়। এরপর আর কোনদিন তাদের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। ইচ্ছে থাকার পরেও তার সামনে দাঁড়ানো হয়নি কখনও। এমনকি তার নামটাও জিজ্ঞেস করিনি কোনদিন। আমার কাছে বারবার মনে হয়েছিল নিজের মনের দুর্বলতা প্রকাশ করলে যদি ভাবে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছি? তাই অনেকটা জোড় করেই নিজেকে একটু একটু করে সরিয়ে আনছিলাম তার থেকে। মনে হত জীবনের সবচাইতে মূল্যবান মানুষটাকে হারিয়ে ফেলছি নাতো! খুব কষ্ট পেতাম নিজের এমন আচরণে।
পরে শুনেছি, মেয়েটার বাবা ওর জন্য বিয়ে ঠিক করেন। বিয়ের দিনও ধার্য করা হয়। এদিকে আমিতো বাংলাদেশে চলে এসেছি। মেয়েটি নাকি আমাকে অনেক ফোন করে কিন্তু কলকাতার সিমটা আমি ওখানেই ফেলে আসি।
অজানা এক কারণে বিয়ের দিন সকালে মেয়েটি বিয়ের সাজে বিষ পান করে মারা যায়।
পরে যখন এক বছর পর আবারও কলকাতায় আসি তখন শুনি দোকানির সেই মেয়েটি মারা গেছে। ঘটণার আকস্মিকতায় যেন হৃদয় চুরমার হয়ে আসে। তবে কি মেয়েটাও আমায় ভালোবেসে ফেলেছিলো? বুকে পাথর চেঁপে সরাসরি ওদের বাড়িতে গিয়ে উঠি। তখন ওর ছোটবোন আমার হাতে একটি চিঠি এনে দেয় যা কিনা সে তার বোনের মৃ*ত্যুর পরে তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে পেয়েছিলো।
আমি ভয়ে ভয়ে চিঠির ভাঁজ খুলে আমার চোখ ছানাবড়া! গোটা গোটা অক্ষরে লেখা-
আনন্দ,
তুমি একবার আমার বাবাকে বলে দাও, আমি ঐ মাতালকে বিয়ে করবো না। আমি বললে বাবা আমার কথা শুনেন না। আমি তোমার সাথেই যেতে চাই। আজীবন আঁকড়ে ধরতে চাই নিজের সবটুকু সুখ! প্রতিটা ভোরে যৌতুক হয়ে তোমার জীবনে আসব বলে স্বপ্ন দেখি। আমায় তুমি তোমার কাছে নিয়ে যাও!
তোমার “হাসি”
আমি চিঠিটা পড়ার পরে নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চোখ মুছে মেয়েটার কবর জিয়ারতে যাই। ওখানে গিয়ে চিৎকার করে কান্না করি। সারারাত ঐ কবরের পাশে বেহুশের মতো পড়ে থাকি। নিজেকে অনেক দোষি মনে হচ্ছিল।
“কেন সেদিন তার লাজুক হাসিটার আড়ালে, অপ্রকাশ্য অনুভূতিটুকু বুঝতে পাতলাম না? তবে হয়ত সে আজও বেঁচে থাকতো।”
কবরের পাশে বসে অস্পষ্ট বিড়বিড় করেছিলাম সারারাত, নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবো না। “হাসি তুমি ফিরে এসো! খুব বেশি ভালোবাসি তোমায়! তোমার আনন্দের কাছে ফিরে এসো!”
পরেরদিন ভোরে বাড়িতে এসে খুব অসহায় লাগে নিজেকে। শুধু মনে হয় একটা মেয়ে আমাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসলো আর আমি তা বুঝতেই পারলাম না। সৌজন্যতা রক্ষা করতে গিয়ে, নিজের হাতেই আমার ভালোবাসাকে মেরে ফেললাম!
হ্যাঁ এই আমি সেইদিন আমার ভালোবাসাকে বুঝতে পারিনি। আর আজ সেই ভালোবাসার মানুষটি মৃত্যুকে জয় করে আমার কাছে ফিরে এসেছে। আমার ভেঁজা চোখদুটো নরম হাতের স্পর্শ পায়। আমি অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসি। আমার কাঁধে মাথা রাখে মেয়েটি।
আঙ্গুলগুলো আঁকড়ে ধরে আমার হাত!
মায়াবী কন্ঠে শুনতে পাই
ভালোবাসি!
~ সমাপ্ত ~

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD