রাতের শেষ ট্রেন ফিরে গেছে।
আজ আর বাড়ি ফেরা হলো না মৌলিনাথের। নির্জন ফাঁকা স্টেশন। শেডের নিচে কয়েকজন
ভিখারী শুয়ে আছে। দূরে শুয়ে আছে কয়েকটি
ক্লান্ত কুকুর।
ব্যাগ থেকে কয়েকটা পুরনো খবরের কাগজের পাতা পেতে নিয়ে শুয়ে পড়ল মৌলিনাথ।
এবার সোজাসুজি আকাশের দিকে তাকালো। নীল আকাশ। রাতের জ্যোৎসনা চরাচর জুড়ে। দূরের কৃষ্ণচূড়া গাছের উপর উতরোল হাওয়া। দূর আকাশে বাঁকা চাঁদ। নিকটে কোথাও নদী।
জলের শব্দ।
চোখে ঘুমের আবেশ। হঠাৎ মনে হল, সামনের রেললাইন পেরিয়ে খুব পরিচিত কেউ কোনো মহিলা ওর মাথার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যেন একটা ছায়ামূর্তি।
চিনতে পারছো?
কে আপনি?
আমাকে তো তোমার না চেনবার কথা নয়।
আপনার গলাটা খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। যেন বহুদিনের কত চেনা একজন মানুষ।
আমি রঞ্জনা। মনে পড়ে?
মৌলিনাথ উত্তেজনায় উঠে বসে।
বলে, সেকি, তুমি রঞ্জনা। এত রাতে এমন নির্জন স্টেশনে তুমি কি করে এলে? আহা, কতদিন পর তোমাকে দেখলাম।
সেসব দিনের কথা তোমার মনে পড়ে, মৌলি?
সব মনে আছে। আমি কিচ্ছুটি ভুলিনি।
প্রথম ভালবাসার কথা কেউ কি কখনো ভুলতে পারে!
ঠিক বলেছো। না পাওয়ার বেদনা নিয়ে একটা আস্ত জীবন কেটে গেল। বলো, কার দোষ?
কারো নয়। ভাগ্যের।
দুজনেই দুজনকে চেয়েছিলাম। ওরা হতে দিল না।
আমরা যেন দুটো সমান্তরাল রেললাইন। পাশাপাশি যেতে পারি। কিন্তু মিলতে পারিনা।
জানো, সুখের দিনে তোমার কথা মনে পড়ে না। বর্ষার দিনে, ঝড়ঝঞ্ঝার দিনে, রৌদ্র দগ্ধ দুপুরে,
গভীর নিশীথে তোমার কথা খুব মনে পড়ে।
সমাজ আমাদের সম্পর্ক মেনে নিল না। আমার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেল। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার, স্বামীর অত্যাচারে আমি একজন ঘর ছেড়ে পথে নামলাম।
তাই নাকি! আমি এসবের কিছুই জানিনা।
জানলেই বা কি করতে? আমি যখন পরস্ত্রী। সমাজ আঙ্গুল উঁচু করে সমালোচনা করত।
জানি তো। তবু তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম।
তা আর হয় না, মৌলি। বাপের বাড়িতে এলাম। বাবা নেই। মা দাদার সংসারে থাকেন। সেখানে আমার জায়গা হলো না।
তারপর?
তারপর ছোটখাটো কাজ জোগাড় করলাম। কোনমতে একলা বেঁচে থাকা।
তোমার কোন কষ্ট হয়নি?
পুরুষ শাসিত সমাজে একা বেঁচে থাকা, নিজেকে ভালো রাখা খুব চাপের।
এ কথা কেন, রঞ্জনা?
সমাজে ভালো মানুষ যেমন আছে, তেমনি সুযোগসন্ধানী হায়েনার অভাব নেই। একদিন
আমার প্রাইভেট কোম্পানির ম্যানেজার শান্তনু
চৌধুরী আমাকে অন্যায় প্রস্তাব দিল। আমি চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। মানে, ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম।
এমনটা না হলেও তো পারতো। সেদিন যদি তুমি পালিয়ে আমার কাছে চলে আসতে, তাহলে আজকের এই দিনটাকে দেখতে হতো না।
কিন্তু তা আর হলো কই! অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায় যায়।
বলল, কাছে এসো রঞ্জনা। আমি তোমাকে একবার ভালো করে দেখি।
একি, তোমার গলার কাছে এমন গভীর ক্ষত কেন? তুমি কোনো ডাক্তার দেখাও নি? তুমি আমাকে বললে না কেন, ডাক্তার জয়ন্ত মিত্র আমার বন্ধু। তাঁকে দিয়ে তোমাকে একবার দেখাতাম।
রঞ্জনা জোরে জোরে হেসে উঠলো। বলল, পৃথিবীর কোনো ডাক্তারই আমাকে আর ভালো করতে পারবে না মৌলি।
কেন এ কথা বলছো?
সেই কতদিন আগে আমি মরে গেছি। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, মৌলি। ওরা আমাকে বাঁচতে দিল না।
কথা শেষ করে, রঞ্জনা বলল, আজ যাই।
কোথায় যাচ্ছ? তুমি এখন কোথায় থাকো? পাহাড়ের গায়ে, নদীর পাড়ে, নাকি গভীর অরণ্যে?
আমাকে বলো, রঞ্জনা। এই কথাটা আমার জানা চাই।
আমার কোনো ঠিকানা নেই। আমার কোনো ঘর বাড়ি নেই। আমার কোনো শরীর নেই। হালকা হাওয়ার মতো, উদাসী বাতাসের মতো, মৃদুল তুলোর মতো আমার আত্মা যখন খুশি যেমন খুশি বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আমি ভালো নেই মৌলি, আমি একদম ভালো নেই।
কোথায় যাচ্ছ? আমাকে বলে যাও।
আমাকে তুমি আর কখনো খুঁজো না, মৌলি।
ঝোড়ো হাওয়ার মতো স্টেশনের শেষ প্রান্তে গভীর অন্ধকারে অরণ্যের মধ্যে মিলিয়ে গেল রঞ্জনা।
মৌলিনাথ পিছন পিছন দৌড়ানো শুরু করলো। ও ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছিল।
কাঁধের ওপর একটা হাত এসে পড়ল। এক ভদ্রলোক বললেন, ভোর হয়ে গেছে। সিগনাল পড়ে গেছে। এখনই ফাস্ট ট্রেন আসবে। আপনি ওদিকে রেল লাইনের দিকে কোথায় ছুটছিলেন?
মৌলীনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মনে মনে ভাবে, সত্যিই কি রঞ্জনা এসেছিল। সেই রাতে যখন পাশে কেউ ছিল না, তখন ও একলা এসে ওর সঙ্গে দেখা করে গেল।
যা কিছু ঘটে গেল, তা কি স্বপ্ন? না, সত্যি?
তারপর ভাবল, আমার একলা জীবনে কতদিন রঞ্জনাকে কাছে পেতে চেয়েছিলাম।
মৃত মানুষেরা সব টের পায়।
আমার কষ্টটা বুঝে ও বোধহয় সবার আড়ালে আমাকে একবার দেখা দিয়ে গেল।