খোকন বলল, মল্লিকদের বাগান থেকে আঁখ চুরি করতে হবে।
মনা বলল, বাগানে মালী থাকে।ষন্ডামার্কা লোকটা
নাকি হেসো ছুঁড়ে মারে।
সন্তোষ বলল, অত ভয় পেলে চলে?
স্বপন বলল, ও সপ্তাহে আমরা নারকেল চুরি করতে গিয়েছিলাম। বিজয়া দিদিমণি আমাদের খুব বকা দিয়েছেন।
সুভাষ বলল, তাই নাকি? কি বললেন?
স্বপন বলল, তোমরা ভদ্র বাড়ির ছেলে। এভাবে পরের গাছ থেকে নারকেল চুরি করছ কেন?
মনা বলল, বাদ দে। ওসব জ্ঞানের কথা শুনে লাভ নেই।
ছোট্টু ভাবছিল, কীসব দামাল দিন। যখন তখন পুকুরে সাঁতরানো, ঘুড়ি ওড়ানো, ঝিলে মাছ ধরা,
সে একটা দিন গেছে বটে!
শীতকালে পিয়ারী দাশের জমিতে কড়াইশুঁটির চাষ করা হতো। মাঠে জুড়ে ভরে থাকতো অজস্র কড়াইশুঁটি। খুব ভোরে শিশিরের ভিজে থাকতো
সমস্ত মাঠটা। ওরা সবাই মাঠ থেকে কড়াই শুঁটি এনে শরৎ সংঘের মাঠে বসে সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খেত। মজার দিন ছিল সেসব।
একদিন সুরেন কাকু ডেকে বললেন, তোদের ফুটবল কিনে দিচ্ছি, বিকেল হলে এই মাঠে ফুটবল খেলবি। পরের বাগান থেকে চুরি করে খাবিনা।
সেই থেকে ওই বড় মাঠে প্রতিদিন খেলা হতো। ছোট্টু
লিংক ম্যান পজিশনে খেলত। ওর বা পায়ে ভালো জোর ছিল। মাঝে মাঝে এই মাঠে অন্য দলের সঙ্গে খেলা পড়তো। ঝাউতলা ক্লাবের সবচেয়ে মারকুটে প্লেয়ার ছিল যামিনী কুল। বল ট্যাকেল করবার সময় একবার ছোট্টুর বন্ধু মনার সঙ্গে ওর কড়া ট্র্যাক লিং হয়েছিল। মনা সেই থেকে আজও খুঁড়িয়ে হাঁটে।
ছোট্টুর মনে পড়ে, বাটা স্টেডিয়ামে মোহনবাগান আর জর্জ টেলিগ্রাফ এর খেলা ছিল। টেলিগ্রাফ দলের স্টপার ছিলেন মোনা ঘোষ দস্তিদার। মোহনবাগানের টি,এ, রহমান পরপর তিনবার আক্রমণে এসে, মোনা ঘোষ দস্তিদারের কাছে
প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়। মোনা বরাবর মারকুটে প্লেয়ার। চতুর্থবার দেখা গেল, রহমান বাঁ পায়ের সটে ওদের গোলে বল ঢুকিয়ে দিয়েছে। মোনা মাটিতে পড়ে রয়েছে।
একদিন শ্যামলাল কাকু বললেন, শুধু ফুটবল খেললে চলবে না, তোরা ক্রিকেট খেল, আমি তোদের ব্যাট বানিয়ে দিচ্ছি।
সত্যি সত্যি কাকু আমাদের কাঁঠাল গাছের ডাল কেটে সুন্দর ব্যাট বানিয়ে দিলেন।
উইকেট বল সব জোগাড় হয়ে গেল।
শরৎ সংঘের সঙ্গে নিউল্যান্ড ক্রিকেট টিমের খেলা পড়ল। নিউল্যান্ড টসে জিতে প্রথম ব্যাট করতে শুরু করলো। সকাল থেকে ওরা ব্যাট করে চলেছে, কাউকে আউট করা যাচ্ছে না। ওদের ব্যাটসম্যান সুজিত চৌধুরী ক্রমাগত ছয় চার রান করে চলেছে।
আমরা শরৎ সংঘের প্লেয়াররা সারাদিন ফিল্ডিং করে চলেছি। বোঝা যাচ্ছে, হার নিশ্চিত। আজ কপালে দুঃখ আছে।
হঠাৎ মধুদা বললেন, এবার আমি বল করবো। এসে প্রথম তিনটি বল তিনি করলেন। সুজিত প্রথম তিন বলে তিনটে ওভার বাউন্ডারি হাঁকালো। চতুর্থ বলে এক রান নেবার জন্য দৌড় লাগাতেই, মধুদা ওকে স্ট্যাম্প আউট করে দিল। আসলে, বল করবার আগেই, সুজিত দৌড় শুরু করেছিল।
এরপর একে একে নিউল্যান্ড টিমের সবাই আউট হয়ে গেল। বিকেল বেলায় যখন খেলা শেষ হচ্ছে,
তখন আমাদের শরৎ সংঘ জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
বীরেনদা বললেন, আইজ তরা ভালো খেলছস,
আজ তোগরে আমি সার্ভিস মার্কেটের মোগলাই
খাওয়ামু।
ছোট্টু ভাবছিল, কী সব দিন গিয়েছে জীবনে। গত রোববার মনা এসেছিল, বলল, আমাদের এই এরিয়ায় নিয়মিত খেলাধুলার চর্চা আছে বলে আমরা এখন কলকাতার মাঠে প্লেয়ার সাপ্লাই দিতে পারছি।
স্বপন বলল, ক্যালকাটা জিমখানায় খেলা শুরু করে মানস ভটচায মোহনবাগানের হয়ে ক্যালকাটা গ্রাউন্ড কাঁপিয়ে দিয়েছে।
সন্তোষ বলল, শুরুটা করেছিল শংকর ব্যানার্জি।
খোকন বলল, আরে বিশ্বজিৎ বসু, মানে বান্টু, ওতো আমাদের ব্যাচের ছাত্র। অসাধারণ খেলতো ও।
ছোট্টু বলল, স্বপন রাউত, শান্তি মজুমদার, এরা সব নঙগী স্কুলের ছাত্র।
সন্তোষ বলল, বাটা স্কুল সেবার সুব্রত মুখার্জি কাপে গোর্খা স্কুলকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিল।
স্বপন বলল, গোর্খা স্কুল প্রথমে দু গোল দেয়। পরে স্বপন বল দুটো, শংকর ব্যানার্জি একটা এবং প্রেমাঙ্কুর বসু ঠাকুর একটা গোল দিয়ে দলকে জিতিয়ে আনে।
মনা বলল, তুই প্রেমাঙ্কুরদাকে আমাকে চেনাস না,
উনি আমাদের দুটো বাড়ির পরেই থাকেন।
এবার স্কুল জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে ছোট্টুর।
ছোটবেলাটা হারিয়ে যাচ্ছে। খেলার মাঠ, ঝিলের ধারে, জোসনার রাতে লক্ষ্মীপুজোর দিন বাড়ি বাড়ি প্রসাদ খেতে যাওয়া, ঘুড়ির পিছনে দৌড়ে, খেলার মাঠ থেকে ফিরে পড়তে বসে পড়তে বসে পড়তে বসে রাত নটার সময় ঝিমোনো, রান্নাঘর থেকে মায়ের গলা,কিরে, গলা পাচ্ছি না কেন?
সব দিনগুলি হারিয়ে যাবে। ছোট্টু ভাবছিল, দিনগুলো কি ভাল ছিল। বড় হয়ে গেলাম।
প্রাণের বন্ধুরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল।
অনেকটা পথ হেঁটে এসে, ছোট্টু আজ পিছন ফিরে দেখছে,কী অমল অপাপবিদ্ধ দিনগুলো সে কোন যেন পিছনে ফেলে এসেছে।
প্রিয় খেলার মাঠ, মল্লিক বাগান, বাটা স্টেডিয়াম, নিউল্যান্ড চাতাল, দুর্গা পুজোর প্যান্ডেল, বিশ্বকর্মা পূজোয় রাত জেগে যাত্রা দেখা, সেইসব ছায়াছবির মত দিনগুলো মাঝে মাঝে স্মৃতিতে হানা দেয়। যেন চুপি চুপি বলে,
যাবি, আয়, আয় না!
ছোট্টু মনে মনে বলে, আমি কিছু হারাই নি। আমার সব সোনা দানা রেখে এসেছি ওখানে!