সেই উপলক্ষে সান্ধ্য জলসা।
মিঃ রাজ মঞ্চে ওঠার আগে আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসলেন। উনি জানেন, আমি ওনার গান ভালবাসি। আগেই ওনাকে অনুরোধ করেছিলাম, মুকেশের স্যাড সঙ শোনাবার।
উনি প্রথমে গাইলেন, ম্যায় নে তেরে লিয়ে হি সাত রঙ কি স্বপ্নে চুনে।
ওর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। উনি জানালেন, ওদের পৈতৃক ব্যবসার কারণে অনেকদিন ওনারা আফ্রিকায় ছিলেন। ভদ্রমহিলা এক ধরনের বিশেষ মিষ্টি বানিয়ে এনেছেন। আমাকে দিলেন। আমি ইতস্তত করছি দেখে, শীতল গলায় বললেন, খেয়ে নিন।
আমি তাঁর দিকে তাকাতেই, তিনি বললেন, কেউ ভালোবেসে কিছু দিলে, সেটা নিতে হয়। ভালোবাসার দান, গ্রহণ না করলে, শতবার মাথা
খুঁড়লেও, সেটা আর পরে পাওয়া যায় না।
এক ধরনের অতি মূল্যবান সন্দেশ, উনি নিজের হাতে বানিয়েছেন ।
ওনার বলার মধ্যে এক ধরনের স্নিগ্ধতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল খানিকটা আদেশের সুর।
গত বছর এই সময় যেসব প্রাচীন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাঁরাও এবার উৎসবে নেই।
বিশ্বাসদা, মানে তরুণ বিশ্বাস, ভারতের অর্থ দপ্তরের উপদেষ্টা ছিলেন। এবার নেই।
গত বছর একসঙ্গে এই প্যান্ডেলে চুটিয়ে আড্ডা দেবার স্মৃতি রয়ে গেছে।
আড্ডা, মানে বুড়োদের আড্ডা।
মনে আছে, এই জমাটি আড্ডার মাঝে অল্প বয়সী তরুণীরা এসে বলেছিল, আঙ্কেল, এদিকে তাকাও। তোমাদের ছবি তুলি।
আহা! ছবি দিয়ে কি হবে?
দিঠি বলেছিল, ছবিগুলোর মধ্যে স্মৃতিগুলো ধরা থাকবে। তুমি জানো না, একদিন এই ছবিগুলো কত দামী হয়ে উঠবে!
আজ কথাগুলো সত্যি বলে মনে হচ্ছে।
শুদ্ধশীল, অনুভব, দীপ্তিমানেরা দারুন ব্যস্ত। সপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধি পূজোর আয়োজন নিয়ে। চারদিকে কচিকাঁচাদের ভিড়। তরুণ তরুণীদের মধ্যে নিজস্বী
তোলবার হিড়িক।
ভুবন বাবু বলছিলেন, বয়স মানুষকে কত কিছু দেয়।
অবনী বাবু বললেন, জীবনকে জানবার জন্য বেশি দিন বেঁচে থাকাটা খুবই জরুরী।
বিজন সেন সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, আসলে, এই বয়সটাই জীবনটাকে উপভোগ করবার জন্য। অন্যের মধ্যে দিয়ে নিজেকে জানার জন্য।
ভুবন বাবু বললেন, যাওয়া আসাই জীবন। বেঁচে থাকা একটা অদ্ভুত প্রক্রিয়া। নিঃশ্বাসে বিশ্বাস নেই রে ভাই।
বিজন সেন কেমন দার্শনিক হয়ে গেলেন। বললেন,
বিশ্বাসদা নদীর ওপারে চলে গেলেন।
কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেল, অবনী বাবু বললেন।
ভুবন বাবু বললেন, শেষ পর্যন্ত কি থাকে জীবনে?
পথের সঞ্চয়, পথের পাশেই রেখে যেতে হয়।
অবনী বাবু বললেন, উৎসবের দিনে আজ কোন শোক সভা নয়। বরং স্মৃতি সভা হোক।
বিজন সেন বললেন, মানুষের বেঁচে থাকার সময় বড় কম। একমাত্র স্মৃতি কথা মানুষের জীবনের অমূল্য সম্পদ। স্মৃতি ছাড়া কি আর থাকে জীবনে?
ভুবন বাবু বললেন, দ্যাখো, বয়েস তো অনেক হলো।
কষ্টের কথা, অপমানের কথা, যন্ত্রণার কথা, মনে রাখতে চাই না। যা পাবার নয়, তা পাইনি। কিন্তু যা পেয়েছি, তাও তো কম নয়।
বিজন সেন হাসলেন। বললেন, সবকিছু নিয়ে জীবন বড় সুন্দর। এই গোলার্ধে ভালোবাসা আছে, কত সুন্দর স্মৃতি আছে। জীবনের আয়ু ফুরিয়ে আসছে। তবু নিভে যাবার আগে, আবার একটু জ্বলে উঠতে ভারী ইচ্ছে হয়!
অবনী বাবু বললেন, জীবনের না মেলানো অংকগুলো আর একবার যদি সংশোধনের সুযোগ পেতাম, তাহলে প্রথম থেকে একবার জীবনটা শুরু করতে পারলে ভালো হতো।
ভুবন বাবু বললেন, তা হয়না রে ভাই। সিনেমার মতো জীবনের অ্যাকশন রিপ্লে হয় না।
বিজন সেন বললেন, জীবনের সেটাই পরম ট্রাজেডি।
ক্যামেলিয়া এসে বলল, আজ সন্ধ্যের আড্ডায় তোমরা কিছু করতে চাও, আঙ্কেল?
ভুবন বাবু বললেন, শোক সভা নয়, একটা স্মৃতিসভা হোক।
অবনী বাবু বললেন, আমাদের বন্ধু তরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে আমাদের কিছু বলার আছে।
উসষী বলল, ঠিক আছে। সন্ধ্যে সাতটা থেকে নটা পর্যন্ত তোমাদের স্মৃতিচারণার অনুষ্ঠান থাকবে।
তোমাদের কাছে আমরা তরুণ আঙ্কেলের গল্প শুনবো।
বিজন সেন বললেন, গল্প তো বটেই। তবে জীবনের গল্প। মানুষের জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই গল্পের ডালপালা বিস্তৃত।
মিঃ রাজ এলেন। বললেন, আপনাদের স্মৃতি সভায়
আপনাদের বন্ধুকে নিয়ে বলবেন। কিন্তু তার মধ্যে যেন তাঁর জীবনের ভালবাসার গল্প টুকু থাকে।
ভুবন বাবু বললেন, খুব কি জরুরী?
মিঃ রাজ গেয়ে উঠলেন, তু ধার হে নদীয়া কা,ম্যায় তেরা সাহারা হু।
অবনী বাবু বললেন, একটা জীবনের আরম্ভ যেমন আছে, শেষও আছে। মধ্য পর্বে আছে ভালোবাসা,
সব জীবনের আলো। এক জীবনের সঙ্গে অন্য জীবনের মেলবন্ধন। একে অন্যের উপর নির্ভরশীলতা।
বিজন সেন বললেন, এটুকু না থাকলে, জীবন তো মরুভূমি।
মিঃ রাজ গেয়ে উঠলেন, ম্যায় কভি কবি না বন যাউ,তেরে প্যার মে হ্যাঁয় কবিতা।
দিঠি এগিয়ে এলো। বলল, আঙ্কেল, তোমরা অষ্টমী পূজোর ভোগ খাও।
ওরা হাত পেতে পূজোর প্রসাদ নিলো।
হঠাৎ বিজন সেনের মনে হোল, আরো একটা হাত এগিয়ে এসেছে, ভোগের প্রসাদ নেবার জন্য।
ওরা বন্ধুরা আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলো,এ হাতটা কার?
তরুণ বিশ্বাসের নয়তো!