হাওড়া থেকে যখন ট্রেনে উঠেছিল, তখন ওর রিজার্ভ সিটটি জানালার কাছে পড়ায়, উৎসব খুব খুশি হয়েছিল। প্রিয় শহর কলকাতা ছেড়ে যাবার সময় খুব মন খারাপ হয়েছিল ওর। বাবা মা, ভালোবাসার মানুষ ঐশ্বর্যকে ছেড়ে ঝাড়খন্ডে যাবার কোনো ইচ্ছাই ওর ছিল না। কিন্তু এখানে থাকলে, যে কোনদিন জীবন সংশয় হতে পারে। এ কথা ভেবে ওকে প্রিয় শহর ছেড়ে যেতে হয়েছিল।
দুপুর দুটো নাগাদ যখন চক্রধরপুরে পৌঁছলো, তখন ট্রলি ব্যাগ গুছিয়ে ও স্টেশনে নামলো। ওখান থেকে বাসে করে চাইবাসা পৌঁছলো।
সেজো কাকার বাড়ি ওখানে। উৎসবের মনে পড়ছিল, স্টেশনে নাবার সময় কয়েকজন লোক ওকে দেখে বলছিল, আরে, এটা কলকাতার নামী গুন্ডা। এর নামে এরিয়া কাঁপে। এত কলকাতার কালু।
উৎসব চমকে গিয়েছিল। একটা সামান্য ঘটনা ওর জীবনের পট পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। সেটা সত্তর দশক। অস্থির সময়। শহরে যত্রতত্র যেখানে সেখানে
লাশ পড়ছে। কলেজ থেকে বিকেল বিকেল ফিরছিল উৎসব। স্টেশন রোড ধরে হেঁটে আসছিল।
ঘন্টাখানেক আগে এখানে দুই যুযুধান পক্ষের মধ্যে
প্রবল বোমা গুলির যুদ্ধ হয়ে গেছে।
উৎসব নিউল্যান্ডের রাস্তা পার হতেই, কালিকার মোড়ে থানার সেকেন্ড অফিসার আইচ বাবু সঙ্গে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে ওকে অ্যারেস্ট করলেন।
উৎসব পড়াশোনা করা ছেলে। জীবনে কখনো রাজনীতি করেনি। অথচ, ওকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। পরদিন কোর্টে পেশ করা হলো। ওর বাবা অনেক চেষ্টা করে ভালো উকিল লাগিয়ে, ওকে ছাড়িয়ে আনলেন।
কলেজে যাবার পথে ওকে রাস্তায় পাকড়াও করা হলো। বুকে রিভলবার ঠেকিয়ে অভিযান বলল,
আমাদের দলে না এলে, লাশ ফেলে দেবো।
ওদের দলের হাত কাটা হেবো বলল, বডি তোলতাই হয়ে যাবে।
উৎসব চুপ করে সব শুনছিল। কোন উত্তর দেয়নি।
ও জানে, ওর বাবা মা অনেক কষ্ট করে ওকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। তাই কোন বিশেষ দলে যাওয়াটা ওর পক্ষ সম্ভব নয়।
দুদিন বাদে বাটা ব্রিজের উপর অপরপক্ষ ওর পথ আটকায়। ল্যাংড়া শ্যামল বলে, তুই কি ওদের দলে নাম লিখিয়েছিস? আমাদের ইনফর্মার দেখেছে। তোকে সাবধান করে দিচ্ছি, ওদের দলে গেলে, তোকে জানে মেরে দেবো। এমন ক্যালাবো, বাপের নাম মনে করতে পারবি না।
উৎসব সাবধানে পথঘাট চলাফেরা করে। এরপর পথে ঘাটে দু পক্ষই ওকে থ্রেট দিতে থাকে।
ও বাবা মাকে এই ঘটনা জানাতে, ওরা চাইবাসায় ওকে পাঠিয়ে দেয়।
উৎসব ভাবছিল, রীতিমতো ভয় পেয়ে ও কলকাতায় ছেড়ে এসেছে। অথচ, ট্রেনে ওই লোক গুলো বলছিল, ও নাকি কলকাতার নামকরা মাস্টার, কলকাতার কালু!
রাতে ঐশ্বর্য্যর ফোন এলো, ভালোভাবে পৌঁছে গেছো?
হ্যাঁ।
তোমাকে নিয়ে খুব ভাবছিলাম।
কি?
পথে কেউ না ঝামেলা করে!
না না, কোন অসুবিধা হয়নি।
কবে আবার আমাদের দেখা হবে, জানিনা।
ফোনে কথা হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, আমি বাড়ি ফিরে যাবো।
আমার খুব মন খারাপ লাগছে।
তোমাকে একলা ফেলে রেখে চলে এসেছি। আমার কি সেটা ভালো লাগছে? কিন্তু কি করবো বলো?
ভালো থেকো।
তুমিও।
ফাইনাল পরীক্ষার আগে কলকাতায় যাবো।
ঠিক আছে। ছাড়ছি।
টা টা।
উৎসবের মনে পড়ে, ওর বন্ধু ডিপাঞ্জনের বোন ঐশ্বর্যের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল, একটি বিয়ে বাড়িতে। সেই প্রথম দেখা। সেই প্রথম প্রেম। সেই মেয়েটির কাছে স্মার্ট প্রমাণ করতে গিয়ে প্রথম সিগারেট খাওয়া। কানের পাশ দিয়ে দেশে গিয়েছিল, কত উদাস নদী, কত সবুজ অরণ্য, কত পাখি পাখালির ডাক, কত নীল আকাশের নিচে
উড়ু উড়ু কৃষ্ণচূড়ার স্মৃতি জড়ানো বসন্ত দিন। মনে পড়ে, সরস্বতী পূজার সকালে ওর সঙ্গে পাশাপাশি
পথ হাঁটা।
ঐশ্বর্য্য যথেষ্ট ভালো ছাত্রী। উৎসব বড্ড ভালোবেসেছিল ওকে।
নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য মন দিয়ে পড়াশোনা করছিল উৎসব। দুই পক্ষের ঝামেলার মধ্যে পড়ে গিয়ে, কোন অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও, ওকে প্রিয় শহর ছেড়ে আসতে হয়েছে।
চাইবাসা খুব ভালো জায়গা। চারদিকে ছোট ছোট টিলা পাহাড়। শান্ত শহর। ভালো লাগছিল উৎসবের।
কিন্তু যে শহরে ওর মা-বাবা আছেন, বন্ধুবান্ধব আছে, ভালোবাসার জন ঐশ্বর্য্য আছে, সেই শহর ছেড়ে পৃথিবীর অন্য কোথাও কি ভালো থাকা যায়?
তিন মাস বাদে, উৎসব বাড়ি এলো। বাড়ি এসে শুনলো, আপাতত এখানে কোন ঝামেলা নেই। দুই পক্ষের মস্তান বাহিনী ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। এখন শ্রীঘরে আছে।
উৎসব ফাইনাল পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট বের হল। একাউন্টান্সি অনার্স নিয়ে ও ভালোভাবেই পাস করল। এবার চাকরি চেষ্টা শুরু করল উৎসব।
সেদিন বিকেলে ঐশ্বর্য্যর ফোন এলো।
হ্যালো!
বলো।
তোমার চাকরি-বাকরির কত দূর?
অনেকগুলো জায়গায় এপ্লাই করেছি, এখনো কোনো কল পাইনি।
একটু চেষ্টা করো। বাবা-মা আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
আমি কি চেষ্টা করছি না, বলো। না হলে আমি কি করতে পারি?
এ সপ্তাহে বহরমপুর থেকে এক পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে।
তাই নাকি! তুমিও কি বিয়েতে রাজি?
আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা মাকে জানিয়েছি।
ওরা কি বললেন?
বাবা সেদিন অফিস থেকে ফিরে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। বলেছেন, তোমাকে আমাদের বাড়িতে আসতে।
কেন?
উনি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান।
আমি কি বলবো?
জানিনা। ওনার প্রশ্নের উত্তর দিও। আমার মাও থাকবেন।
আমার খুব নার্ভাস লাগছে।
আরে, এসেই দেখনা আমাদের বাড়িতে।
রোববার বিকেলে যাবো।
এসো।
রোববার বিকেল। ঐশ্বর্য্য ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। উৎসব এলো।
বাপী, ও তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
বোসো। কোথায় থাকো? বাবা কোথায় সার্ভিস করেন?
বাটানগরে থাকি। বাবা বাটা কোম্পানিতে চাকরি করেন।
তুমিতো বিকম অনার্স, তাই না?
হ্যাঁ।
আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হলে, একটা চাকরি তো চাই। সে কথা ভেবেছো?
চেষ্টা করছি।
দ্যাখো, ও আমাদের একমাত্র মেয়ে। ও যেখানে সুখী হয়, ভালো থাকে, সেখানেই ওকে আমরা বিয়ে দিতে চাই।
উৎসব চুপ করে থাকে।
উনি আবার বলেন, তোমার সিভিটা দিয়ে যেও। আমি দেখি কি করতে পারি।
ঐশ্বর্যের মা বললেন, একদিন মা-বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসো।
উৎসব ঘাড় নাড়লো।
দিন-সাতেক বাদে দুপুরের দিকে ফোন এলো ঐশ্বর্যের।
হ্যালো!
একটা গুড নিউজ আছে।
কি?
তোমার চাকরি হয়েছে।
কোথায়?
বাবার বন্ধুর একটা চার্টাড ফার্মে।
বলো কি! আমি ভাবতে পারছি না।
কেন?
আমার ভয় ছিল, আমি বেকার, যদি তোমার বাবা-মা আমাকে গ্রহণ না করেন।
আমার বাবা-মা একেবারে অন্যরকম। আমার সুখেই ওদের সুখ।
হ্যাঁ, তাইতো দেখছি।
শোনো, ভালো কথা। তোমার মা বাবাকে সব জানাও। ওনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসো।
যাবো।
উৎসবের বাবা মা ও বাড়িতে একদিন গেলেন। সবকিছু ফাইনাল হয়ে গেল।
বিয়ের পর ফুলশয্যার রাতে উৎসব ঐশ্বর্য্যকে কানে কানে বলল, জীবনের অনেকটা কাঁটার পথ পেরিয়ে তোমার কাছে এসেছি।
ঐশ্বর্য্য বলল, এবার দুজনে মিলে এই বাড়িটাকে একটা ভালোবাসার বাড়িতে পরিণত করতে হবে।
গভীর আবেগে উৎসব যতক্ষণে ঐশ্বর্যকে জড়িয়ে ধরেছে।
বাইরে জ্যোৎস্নার রাত। কামিনী ফুলের বনে উদাস হাওয়া। গাছের উঁচু শাখায় দুটি রাত জাগা পাখি তখনো জেগে রয়েছে।
উৎসব ঐশ্বর্যের কোলে মাথা রাখলো। তারপর গান গাইতে শুরু করলো,
কটা রাত তুমি জেগে বসে রও,
আমি এখন বড় ক্লান্ত!