তখন সন্ধ্যা নামেনি পুরোপুরি,
কিন্তু আলোয় আর অন্ধকারে এক তুচ্ছ দ্বন্দ্ব চলছিল।
গাছেরা নীচু হয়ে পড়েছে,
যেন কোনো অপরাধ ঢাকতে চায় তারা।
পুকুরপাড়ে শ্যাওলার গন্ধে মিশে আছে পুরনো দিনের শোক।
আমি হেঁটে চলেছি,
যেন হেঁটে চলেছি কোনো অজানা অতীতে,
যেখানে “ভালোবাসা” শব্দটা ছিল না একটা মোহ,
বরং এক চিরন্তন সত্য।
“আত্মত্যাগ”—এই শব্দটা শিখেছিলাম মা’র মুখে, যখন ভাত না খেয়ে দাদাকে খাইয়ে দিতেন।
“সংঘর্ষ”—বাবা শিখিয়েছিলেন, যখন তাঁকে দেখেছি কাঁধে লাঙল তুলে নিতে।
“মানবতা”—পাড়ার বুড়ো মাস্টারমশাইয়ের চোখে ছিল, যখন পথের ভিখারিকে নিজের কাঁথা দিয়ে দিয়েছিলেন।
এইসব শব্দ, এরা কি কেবল অভিধানে আছে?
নাকি তারা আমাদের আত্মায় লুকিয়ে থাকে?
যখন গ্রামে “বিদ্রোহ” নামে কিশোর উঠেছিল,
তখনই বুঝেছিলাম সাহস মানে শুধু তরবারি নয়,
একটা বই খুলে বসে যুদ্ধে যাওয়াও একধরনের বিপ্লব।
“সমাজ”—এই শব্দটা একসময় মনে হতো বড়ো ভারী, এখন বুঝি, এর ভার বইতেই হয় হৃদয় দিয়ে।
শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ পড়ে মনে হয়েছিল,
প্রেম কেবল পাওয়ার নয়, হারানোরও এক সূক্ষ্ম শিল্প।
“আশা”—এই শব্দটাকে ধরতে চাই, যখন দেখি একটা ছেলে চটি ছেঁড়া পায়েও স্কুলে যায়।
“নিরাশা”—সে তো আছে, কিন্তু তার সাথেও যে সহবাস করা যায়, সেটা শহরের একা ব্যালকনিতে শিখেছি।
“স্মৃতি”—ওই যে পুরনো ট্রাঙ্কে রাখা চিঠি, যা পড়লে চোখ ভিজে আসে, কিন্তু ঠোঁটে আসে হাসিও।
এই শব্দগুলোর ভেতরেই গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্য, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের বেদনা।
একটা “প্রেম” শুরু হয়েছিল লজেন্স দেওয়া থেকে, শেষ হয়েছিল অন্য কাউকে কনে সাজিয়ে দেখতে।
“পাপ” শব্দটা শিখেছিলাম প্রথম প্রেমে মিথ্যে বলে,
আর “পুণ্য”—হয়তো তখনই, যখন তাকে ভুলেও ক্ষমা করেছিলাম।
ভোরবেলায় “ভবিষ্যৎ”-এর স্বপ্ন দেখি, রাতে “অতীত”-এর কাছে পরাজয় মেনে নিই।
শব্দেরা যেন চরিত্র হয়ে ওঠে, তাদের চোখে জল,
ঠোঁটে হাসি।
“সংস্কৃতি”—এই শব্দটা একটা নদী, যা বয়ে চলে গানের সুর, কবিতার লাইন আর মায়ের মুখের উপাখ্যান বয়ে নিয়ে।
বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি মানুষ, একেকটি ইতিহাস।
যখন “বিদ্যাসাগর” নামটি শুনি, মনে পড়ে যায় কোমরের বেল্ট আর হৃদয়ের কোমলতা।
“রবীন্দ্রনাথ”—এটা কেবল নাম নয়, এক অলৌকিক সংগীতের ধ্বনি।
“নজরুল”—তিনি যেন আগুনের গান, বিদ্রোহের ভাষা।
“জীবনানন্দ”—তার শব্দে আছে ধোঁয়া, আছে নীরবতা, আছে হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেলার আনন্দ।
এইসব শব্দে গড়ে উঠেছি আমি, তুমি, এই মাটি,
এই আকাশ।
তাই গদ্যে হোক বা পদ্যে, যখনই কলম ধরি,
শব্দেরা নিজেরাই বয়ে আনে এক সাহিত্যের নদী।
এই গদ্যকবিতা, এই ছন্দহীন ছন্দ,
তবুও বয়ে চলে শরৎচন্দ্রের পদচিহ্ন মেনে,
কারণ হৃদয়ের ভাষা কেবল ছন্দে নয়—তাও এক অপূর্ব ছন্দ।