1. admin@mannanpresstv.com : admin :
পাহাড়ের পেছনে কেউ -১ — মামুনুর রশীদ - মান্নান প্রেস টিভি
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

পাহাড়ের পেছনে কেউ -১ — মামুনুর রশীদ

এম.এ.মান্নান.মান্না:
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৪ জুন, ২০২৫
  • ১৭২ Time View
ধরাবাহিক উপন্যাস
পাহাড়ের পেছনে কেউ -১
(রোমান্টিক স্পাই থ্রিলার)
— মামুনুর রশীদ
পর্ব ২:
বগালেকের আকাশ ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে,
সেই আলোটা ঠিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের জানালা দিয়ে এসে পড়ে নিশিতার কপালে।
তাকে দেখে মনে হয়, কেউ যেন ঘুমের পর ধীরে ধীরে নিজেকে খুঁজে নিচ্ছে।
মেজর সায়ন প্রতিদিনই আসছেন—
প্রথম দিন চিকিৎসার খোঁজ নিতে এসে দেখে জানালার পাশে বসা নিশিতা, আহত হাত জানালার বাইরের হালকা রোদে রেখে দিয়েছে।
সায়ন ধীরে ধীরে এসে পাশে বসলেন।
“তোমার বাড়িতে কে আছেন?”
নিশিতা একটু ভাবলো। তারপর বললো—
“আমার বাবা। আমরা দুজনই… মা নেই। ছোটবেলা থেকে বাবাই আমায় বড় করেছেন।”
“তোমার বাবা কী করেন?”
“তিনি একজন জেলে।
বগালেকের হ্রদে মাছ ধরেন।
সকালে ধরেন, বিকেলে রুমা বাজারে বিক্রি করেন।
এইভাবেই আমাদের সংসার চলে।”
সায়ন কিছুকাল চুপচাপ থাকে।
তার চোখে তখন কোনো সেনা কর্মকর্তা নেই,
আছে শুধু এক অন্যমাত্রার মনোযোগ।
সেই মনোযোগ যেটা একজন শ্রোতার, দায়িত্ববান একজন মানুষের।
“তোমার দুর্ঘটনার কথা তাকে জানানো হয়েছে?”
নিশিতা একটু গুছিয়ে বসে, মুখে হালকা কাঁপুনি—
“না। আমি ওষুধ আনতে এসেছিলাম রুমায়।
বাবা কদিন ধরে খুব অসুস্থ…
জ্বর-জ্বালা নিয়ে ঘরে শুয়ে আছেন।
বাড়িতে ফিরতে পারছি না, জানাতেও পারছি না দিতে পারছি না… ভাবলে বুক ফেটে যাচ্ছে।”
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা।
তারপর সায়নের ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠ—
“তোমার ওষুধ আমি পৌঁছে দেব। বাবাকে খবরও পাঠাব।”
এক সিপাহিকে ডেকে সায়ন বললো
“এই ঠিকানায় যাবে।
ওষুধগুলো পৌঁছে দেবে, আর বলবে—মেয়ে ভালো আছে, চিন্তা করার কিছু নেই।”
সিপাহি রওনা দিল বগালেকের উত্তর দিকে, নিশিতাদের বাড়ি।
পাহাড় বেয়ে পথ চলা সহজ নয়,
তবুও গায়ে সাফারি ইউনিফর্ম, পিঠে ব্যাগ, হাতে ছোট প্যাকেট—
সে পৌঁছালো নিশিতার ঘরের সামনে।
এক ভাঙা চালা, কাঠের দেয়াল,
আর সেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মানুষ—
চোখে অস্পষ্ট দৃষ্টি, গায়ে কম্বল।
সিপাহি এগিয়ে গিয়ে বলল—
“চাচা, আপনি নিশিতার বাবা?”
বৃদ্ধ উঠে বসে পড়লেন।
“মাই নাই মেয়া… কাইল ধইরা ফিরতেছে না। খ্যাবরের নাই…”
সিপাহি এগিয়ে গিয়ে ওষুধের প্যাকেট দিয়ে বলল—
“আপনার মেয়ে একটা ছোট গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল,
কিন্তু চিন্তা করবেন না, সে ভালো আছে।
সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা চলছে।
আর… এক সেনা অফিসার নিজে তার দেখভাল করছেন।”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠলো।
সে এক মুহূর্তে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন।
তার কান্না পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে যেন ফিরে আসলো।
সিপাহি হাত রাখল তার কাঁধে।
“চাচা, চিন্তা কইরেন না।
আপনার মেয়ের চিকিৎসা চলছে, এখন ভালো আছে, আর আপনি দ্রুত সুস্থ হন—
আপনার মেয়েও ঠিক হয়ে ফিরে আসবে।”
পরদিন বিকেলে সায়ন এসে বসে আছে আগের চেয়ারে।
নিশিতা হালকা হাসে।
“আপনার চোখে একটা পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা আছে,
কিন্তু মনের মধ্যে একটা ঝরনার মতো নরম কিছু—আমি ভুল বলছি কি?”
সায়ন চমকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল—
“তোমার বাবার ওষুধ পৌঁছে গেছে। তিনি এখন শান্ত। আর আমি কথা দিচ্ছি—
তুমি সুস্থ হয়ে উঠলেই তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেব।”
নিশিতা জানালার বাইরে তাকায়।
সামনে দূরের পাহাড়ে সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
সে জানে না, তার হৃদয়ে এ দোলা কেন—
কিন্তু সে জানে,
এই মানুষটিকে দেখে তার ভিতরকার দীর্ঘ শূন্যতা
আজ প্রথমবার ভরতে শুরু করেছে।
—-
বগালেক—
ভোরবেলার রুপালি আলোয় ঠিক যেন স্বচ্ছ আয়না।
জলের গভীরে তখনো রাতের জোছনার ছায়া লেগে আছে।
চারপাশে নীরব পাহাড়গুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে,
আর মাঝখানে সেই হ্রদ…
যেন হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা এক জলধারা—নিঃশব্দ, স্থির, অথচ অস্থিরতার ঠিক উপরে।
নিশিতা সুস্থ হয়ে উঠেছে।
চোখে আগের সেই দীপ্তি ফিরে এসেছে।
সায়ন নিজ হাতে তাকে গাড়িতে তুলে এনেছেন—নিশিতার ঘরে, তার বাবার কাছে।
চোখে জল নিয়ে বাবা বারবার সায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।
নিশিতা তাকিয়ে থাকে, কিছু বলে না।
তবে তার চোখে লুকানো থাকে এমন কৃতজ্ঞতা—
যা ভাষা জানে না, কিন্তু হৃদয় বোঝে।
সেদিন রাত।
সায়ন ফিরে এসেছে সেনা কটেজে।
সামরিক পোশাক গায়ে, তবে ভেতরে যেন কোনো যুদ্ধশেষের শূন্যতা।
ঘুম আসে না।
নিরাপত্তার চেকপোস্টগুলো পেরিয়েও বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য পাহারা পড়ে থাকে।
নিজেকে বলে—
“আমি একজন সেনা অফিসার।
বুক নরম হলে কাঁধ শক্ত থাকে না।
এমন ভাবনায় মন ভাসানো যাবে না।”
কিন্তু পরক্ষণেই…
চোখে ভেসে ওঠে সেই মুখ—
নিশিতা।
সে চোখ—যেটা ঘুমায় না,
যেটা তাকায়… ভেদ করে যায় রক্তের গভীর ছন্দে।
পরদিন সকাল।
সূর্য তখনও ঠিকভাবে পাহাড়ের মাথায় ওঠেনি।
কুয়াশা গায়ে মেখে সায়ন নিজের জিপে রওনা দিলেন।
পথে পাথরের ঝিরি, বাঁশের ঝোপ, আর পাহাড়ি শিশুরা খেলছে রাস্তার পাশে।
সবাই মাথা ঘুরিয়ে চেয়ে থাকে সেই সেনা জিপের দিকে।
দূর থেকে নিশিতা শুনতে পায় গাড়ির শব্দ।
সে জানে, সেই গাড়ি।
হঠাৎ এক দৌড়—
চুল বাতাসে উড়ছে, চোখে আনন্দের ঝিলিক, ঠোঁটে লুকানো হাসি।
রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ায় নিশিতা।
সায়নের চোখ পড়তেই, গাড়ি থামে।
চোখে চোখ।
কোনো কথা নেই, তবু হাজার বাক্য।
কেমন আছো দেখতে এলাম… কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে আলতো হেসে বললো সায়ন। নিশিতা হাসলো শুধু।
সায়ন আর নিশিতা হাঁটতে হাঁটতে হ্রদের ধারে এসে বসলো।ননীল জলের গভীরে তখনো সকালে ফেলে আসা মেঘ ঘুমাচ্ছে। পাহাড় নীরব, হাওয়া মৃদু, আকাশে মৃদু মেঘের আলপনা।
“জানো, আমি সেদিন রাতে ঘুমোতে পারিনি।”
সায়ন বললো নিচু স্বরে।
নিশিতা তাকালো।
“আমার জন্য?”
সায়ন থতমত খেলো, চেহারা শক্ত, কিন্তু চোখ নরম।
“হয়তো।
তোমার চোখ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
তোমার চুপ করে তাকিয়ে থাকা… সেটা ভুলতে পারিনি।”
নিশিতা হেসে ফেলে না, চোখ নামিয়ে নেয়।
“আমি ভেবেছিলাম… আপনি আর আসবেন না।”
“আমি নিজেও ভেবেছিলাম… কিন্তু পারিনি।
তোমার মতো কেউ আমার জীবনে আসেনি, নিশিতা।
তুমি পাহাড়ের মতো—নীরব, অথচ আগুন।
তুমি আমার মনে একটা ঝড় তুলেছো, থামছে না ঝড়টা।”
নিশিতা ধীরে বললো—
“আপনার ঝড় তোলার মতো সাহস আমার নেই, স্যার।
আমি তো শুধু একজন পাহাড়ি মেয়ে।”
সায়ন হেসে বললো—
“তুমি ভুল বলছো।
তুমি পাহাড়ের মেয়ে ঠিকই… কিন্তু তোমার চোখে যে গভীরতা,
তা শুধু পাহাড়ে জন্মায় না।
তা জন্মায়—আত্মায়।”
হাওয়া তখন আরেকটু ঠান্ডা হয়ে এলো।
পাশ দিয়ে একটা ছোট পাখি উড়ে গেলো।
হ্রদের জলেও এক হালকা ঢেউ উঠলো।
সেই ঢেউয়ে যেন ভেসে যাচ্ছিল—
দু’জন মানুষের না বলা কথা,
দু’টি হৃদয়ের স্পর্শবিহীন স্বীকারোক্তি।
চলবে…

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD