জীবনে যখন ভালোবাসা শব্দটার মর্ম বোঝিনি,তখনেই পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রীয় মানুষ-টাকে হারিয়েছি।ভালোবাসা শব্দটির অনুভূতি যখন হৃদয়ে জাগ্রত হলো,তখন অনুভব করেছি খালা খালুর ভালোবাসা।আত্নীয় স্বজন আর ক্ষনিকের জীবনে চলতি পথে হওয়া সম্পর্ক,কিছু ব্যাক্তিদের ভালোবাসা।আর তখন রাতের গভীরে খুঁজেছি সেই প্রীয় ব্যাক্তির ভালোবাসার একটু খানি ছোঁয়া।কারন সমাজে চলতে গিয়ে দেখেছি পৃথিবীতে সেই ব্যাক্তিটির মতো এতো নিঃস্বার্থ ভাবে কেও ভালোবাসে না।ভাবনার জগতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সেই মানুষটিকে খুঁজতে গিয়ে মনের অজান্তেই লেখক জগতে পদার্পণ করেছি,তা একটিবারের জন্যও বোঝতে পারিনি।আপনারা হয়তো ভাবছেন, কে সেই প্রীয় ব্যাক্তি?যার জন্য এতো অনুভূতি,এতো আবেগ,এত বিষাদময় স্মৃতিকথা।
তাই বলছি,গল্পের প্রথমে অনুভূতি প্রকাশের প্রীয় মানুষটি হলো প্রীয় জননী।যার তুলনা পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয় কেউ হয় না। যার ভালোবাসার মতো মধুময় নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না।যার মুখের দিকে থাকালেই সন্তানের ক্লান্ত হৃদয় শান্ত হয়ে যায়,জীবনে ফুঠে উঠে নতুন স্বপ্নের আলো।সেই মমতাময়ী প্রীয় মানুষ টি মারা যাওয়ার প্রায় ১৪ বছর পর,কেউ একজন জীবনে আসলো।শুরু হলো জীবনের নতুন অধ্যায়। নতুন করে হৃদয় টা কারো ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে চায়।সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমার সব ছিলো,শুধু অভাব ছিলো ভালোবাসার।আর আমি ভালোবাসার প্রতি অনেক দূর্বল ছিলাম।কারন আমি ভালোবাসার অনুভূতি বোঝার আগেই মা-কে হারিয়েছি। আর মায়ের মৃত্যুর পর দুঃখ আর সুখ,অবহেলা এবং ভালোবাসা একসাথে পেয়েছি।হয়েছি অনেকের বিরক্তির কারন,অথবা আনন্দের।তাই কখনও বোঝতে পারিনি সুখ দুঃখ,অবহেলা এবং ভালোবাসার পার্থক্য কাকে বলে।কারন আমাকে বোঝার মতো কেও ছিলো না।
কিন্তু মায়ের মৃত্যুর দীর্ঘ ১৪ বছর পর কেও একজন এসেছিলো আমার জীবনে।তার কাছে শিখেছিলাম ভালোবাসা কাকে বলে।তার মায়াবী চেহারায় মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম নতুন স্বপ্ন।সাজিয়েছিলাম একটি ছোট সংসার।আর স্বপ্ন দেখেছিলাম একট সুখের ঘর বাধার। আমি অনুভব করেছিলাম,আমার জীবনে ভালোবাসা নামক শূন্যস্থান পূরন হতে যাচ্ছে। হাসি – খুশির সংসার ছোট্ট চাকরি আর অল্প বেতনে দিন কাঁটছিলো ভালোই।কারন ভালোবাসার সুতায় বাঁধা ছোট্ট সংসারে,অর্থের অভাব ছিলো কিন্তু ভালোবাসার কোনো অভাব ছিলো না।স্বপ্নের সাজানো সংসারে প্রীয় মানুষটাকে খুশি করার জন্য,কখনও বোঝতে দেইনি অর্থহীন জীবনের কষ্টটা।সব-সময় তার চাওয়া পাওয়া কে গুরুত্ব দিয়েছি। কারন মায়ের মৃত্যুর পর ভালোবাসার শূন্যস্থান টা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। আর সেই দুর্বলতাটাকেই বার-বার ব্যবহার করেছে, স্বার্থপর মানুষগুলো।
আমি কখনো ভাবিনি, আমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার শূন্যস্থান একদিন আমার কাল হয়ে দাঁড়াবে। আমাকে ভালোবাসার নিচে স্বপ্ন দেখাবে।মিষ্টি কথা অন্তরালে লুকায়িত, ভালোবাসার ছলনাময়ী মায়ায় আমাকে বন্দী করবে। যদিও ভালোবাসার শূন্যস্থান আমার হৃদয়ে ছিল, তবুও আমি ভালোভাবে বুঝতাম না ভালোবাসা কাকে বলে। তবে যখন কেউ এসে আমার পাশে দাঁড়ালো, চোখে চোখ রেখে কথা বলল, সুখে দুঃখে প্রতিশ্রুতি দিল, আমার জীবনের গল্প শুনে তার চোখের কোনে অশ্রু জমা হলো, তখন আমার কাছে মনে হল এটাই সম্ভবত ভালোবাসা। কিন্তু আমার শহরের হৃদয় বুঝতে পারেনি, এটা ছিল ভালোবাসার নামে ছলনা। যে ছলনার মায়াজালে বন্দি করে, ভালোবাসার পুরনো শিক্ষা দিয়ে কলিজায় ছুরি বসিয়ে চলে যায় স্বার্থপররা। আর আমাদের মত কিছু অবুঝ প্রেমিকরা আছে, একবার যার মায়ায় পরে তাকে কখনো ভুলতে পারেনা। ভুলতে পারেনা তার স্মৃতিগুলো। দিনের বেলা যতোই হাসি খুশি থাকুক না কেন, রাতের আঁধারে তার কথা ভেবে ভেবে গোপনে চোখের অস্ত্র ফেলে। বারবার তার রেখে যাওয়া স্মৃতি গুলোকে, স্পর্শ করে। উম্মাদের মত চোখের জলে তাহার কথাই ভাবে।এগুলো কোন গল্প কাহিনী নয়, নয় কোন কাল্পনিক বানানো ইতিহাস। আমি আমার বাস্তব জীবনের কথা বলছি।
মায়ের মৃত্যুর প্রায় ১৪ বছর পর, শূন্য থেকে পথচলা শুরু করেছিলাম আমি।আমি কখনো ভাবিনি, এই ব্যস্ত শহরে শূন্য জীবনে পূর্ণতা আসবে ভালোবাসার। স্বপ্ন দেখবে দুটি চোখ,কাউকে নিয়ে ভাববে সুখের ঘর। এটাই জীবনের চরম বাস্তবতা, ভাবিনি তাই হয়েছে।হঠাৎ পরিচয়ে ভাবের বিনিময় হলো,চোখ ইশারায় কথা হলো , একদিন আমার কাছে আসলো।আমাকে ছুঁয়ে প্রতিশ্রুতি করলো, কখনো ছেড়ে যাবে না। আমি বোকার মতো বিশ্বাস করেছিলাম।তাকে আপন করে নিলাম।আস্তে -আস্তে করে কি সুন্দর সংসার সাজানোর চেষ্টা করলাম। দেখতে -দেখতে ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে পথ চলার প্রায় ৮ মাস গত হলো। পরিবারের সৌন্দর্য রক্ষায় কিনতে শুরু করলাম আসবাবপত্র। আমার একদিন সব ছিল, ভালোবাসার প্রিয় মানুষ ছিল, তাকে নিয়ে ছিলো হাজারো স্বপ্ন,আর বুক ভরা ছিলো ভালোবাসা।তবে তা ছিলো ক্ষনিকের জন্য।কারন আমি কখনও ভাবিনি আমি তাকে হারাবো।
আজ সে নেই কিন্তু জীবনের চারিপাশ গিরে ছিলো তার স্মৃতিগুলো। সারাদিন অফিসে কাজে ব্যাস্ত থাকি।সময়টাও কাটে ভালোই।কিন্তু যখন অফিস শেষে বাসায় যাই,তখনেই চোখে ঝাপসা দেখি।
কিন্তু কেনো চোখে ঝাপসা দেখি?
কলমের ভাষায় বলছি আজ সেই কথাগুলো।যা এতোদিন হৃদয়ের ডায়রিতে লেখা ছিলো।আমি যখন বাসায় যাই,তখন আমার পাশে তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো ব্যাতিত কেও থাকে না।আর তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো স্মরন করিয়ে দেয়,তার সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্তের কথা।আর তখন চোখের কোণে জ্বল এসে খেলা করে।প্রিয় মানুষগুলো হারিয়ে যায়,কিন্তু স্মৃতি গুলো ঠিকেই রয়ে যায়। আমার জীবনেও তাই হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছিলাম, আমার জীবনের সর্বোচ্চ বিয়ে হলেও প্রিয় মানুষটার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে যতনে রাখবো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তার পারলাম না। জুলাই বিপ্লবের পরে বাসার মালিকের সহযোগিতায় জীবন থেকে কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায়।আমার অনুপস্থিতে বাসার মালিক বাবুল মিয়া তিল তিল করে জমানো কিছু আসবাবপত্র চুরি করে। আর সেগুলো ছিল প্রিয় মানুষটার নিজের হাতে কেনা। তবুও ছিল কিছু স্মৃতি বাকি।সেগুলো অনেকদিন রেখেছি আমার কাছে। সেই স্মৃতিগুলো আমার কাছে অনেক প্রিয়। কারণ সেগুলোতে আছে প্রিয় মানুষটার ছোঁয়া। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে এসে, সেই স্মৃতিগুলো বিসর্জন দিতে হলো। আর পারলাম না কিছুই রাখতে।এক এক করে প্রতিটি স্মৃতি হারিয়ে গেল জীবন থেকে। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়া হলো, যার জন্য জীবনটাকে স্মৃতিময় করে তুলেছিলাম।সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ সেই প্রিয় মানুষটি যেহেতু আমার কাছে নেই। তাহলে স্মৃতিগুলো রেখেই বা কি করব। কারণ প্রতিটা মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন সে তার নিজেকে ব্যতীত আর কাউকে নিয়ে ভাবতে পারে না। প্রবাদ বাক্যে রয়েছে,
নিজে বাঁচলে বাবার নাম। আমারও হয়েছে তাই। জীবনে এমন কিছু কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে, যে পরিস্থিতির মোকাবেলায় নিজের জীবনের বেঁচে থাকার কোন নিশ্চয়তা নেই।
তাহলে স্মৃতি গুলোই বা রাখি কি করে। প্রিয় মানুষটা আমাকে ছেড়ে চলে যাবার সময়, আমি যতটা কষ্ট পেয়েছি।ঠিক ততটা কষ্ট পেয়েছি, যখন তার স্মৃতিগুলো আমার জীবন থেকে হরে গিয়েছে।শূন্য থেকে উঠে এসেছিলাম আমি,একটি সুখের স্বপ্নের দুনিয়ায়। আবারো সেই শূন্যতেই চলে গেলাম, অবশিষ্ট রইল বিরহ আর বেদনা। প্রিয় মানুষটা ব্যতীত সবকিছুই ছিল আমার, আজ প্রিয় মানুষটাও নেই, তার স্মৃতিগুলোও নেই।শূন্যতেই আমার একমাত্র পথ বেঁচে থাকার।দিন শেষে আমি নিঃস্ব নিঃসঙ্গ।আমি স্বার্থপর বড়ই স্বার্থপর। যা হারানোর ছিল সব হারিয়ে ফেলেছি। ব্যর্থতার গ্লানি ছাড়া আর কিছুই রইল না বাকি। আবারো শূন্য থেকে জীবন শুরু করেছি। শুধু ভাবনায় রেখেছি তাকে।কারণ সে আমার কাছে না থাকলেও, তার ভালোবাসার অনুভূতি আমাকে বার-বার তার কাছেই টেনে নিয়ে যায়। আমি জানি সে আর আসবেনা, তোমার তার অপেক্ষায় আছি। যা হারানোর সব হারিয়েছি, শুধু তার হারানো ভালোবাসা স্মৃতির ডায়েরিতে চিরস্মরণীয় করে রেখেছি।আমি আজও তার রয়েছি।জীবনে এমন কিছু গল্প থাকে, যার শুরু হয় কলমের কালি দিয়ে, আর শেষ হয় চোখের অশ্রু দিয়ে।তবে সেই গল্পের কোন সমাপ্তি নেই।