লিখি পড়ছে। আমি পাশে বসে এফবি ঘাঁটাঘাঁটি করছি। ও মাঝে সাঝে আটকে গেলে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। সে তার সমাজ বইয়ে কোন একটি চ্যাপ্টারে ইতর প্রাণীর উদাহরণ হিসেবে কুকুরের নাম পড়তে গিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো, ইতর কি?
আমি আমার বিদ্যার ভাণ্ডার ঘেঁটেঘুঁটে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। বললাম, ইতর মানে নীচ, অসভ্য, স্বার্থপর, বিবেকহীন, মরা পচা নাপাক জিনিস খায়, লজ্জাশরম নেই এমন।
আমার বুঝানোর ধরণ থেকে সে বেঁকে বসেছে। তার যুক্তি, তোমার কথা যদি ঠিক হয়, তবে কুকুর নিশ্চয় ইতর প্রাণীর পর্যায়ে পড়ে না।
মহা বিরক্তি নিয়ে আমি বললাম, তাহলে তোমার মতে কোনটা ইতর প্রাণী।
তার জবাব, মানুষ।
আমি ‘থ’ হয়ে গেলাম। কড়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষ কেন?
– তোমার বর্ণনা মতে, মানুষ নীচ প্রকৃতির, ভালোমন্দের পার্থক্য করে না, মানুষের লাজলজ্জা নেই, মানুষ স্বার্থপর, মানুষ নাপাক জিনিস খায়, ঘুষ খায় যা কুকুরের মরাপচা খাবারের চেয়ে পচা। গীবত করে যা, আপন মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সমান। কুকুর কখনো তার ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করে না!
ওর যুক্তির কাছে আমি লাজওয়াব। মানুষ হিসেবে আমি লজ্জিত।
২০১৬ সনের ১৮ ডিসেম্বর আমরা সপরিবারে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে যাই। আমরা আগে একাধিক বার গেলেও লিখিকে নিয়ে ওটাই ছিল আমাদের প্রথম সমুদ্রে যাওয়া। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, তরঙ্গায়ীত ঢেউ, শো শো গর্জন তাকে এতো বেশি আকর্ষণ করে যে, সৈকত থেকে আনাই যচ্ছিল না।
আমরা উঠেছিলাম ‘সী-কুইন’ নামে একটি আবাসিক হোটেলে। হোটেলটি বীচ লাগোয়া। দোতলায় আমাদের রুমে দক্ষিণমুখী বেলকনী থেকে সমুদ্র দেখা যায়। আগের রাতের বাস জার্নি, সারা দুপুর, বিকেল বীচে দাপাদাপি, সন্ধ্যায় রাখাইন পল্লীতে ঘুরাগুরি করে ক্লান্ত আমরা। আগেভাগে খেয়েদেয়ে রুমে ঢুকেই শুয়ে পড়েছি। লিখির ঘুম আসছে না। সে বারবার বেলকনীতে গিয়ে সমুদ্র দেখার চেষ্টা করছে।
কুয়াকাটার প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রে সূর্যোদয়, যা বাংলাদেশের আর কোন জায়গা থেকে দেখা যায় না। এটি পৃথিবীর একমাত্র সী-বীচ যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটিই দেখা যায়। সাগরকন্যা খ্যাত এই বীচটি এখনো অতোটা নগরায়ীত না হওয়ার নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যে আমার নিকট ভ্রমনে পছন্দের তালিকায় অন্যতম।
আগে গিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারির শেষাশেষি। সূর্যোদয় হতো পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার দিকে। আমরা হোটেল থেকে বেরোতাম ভোররাত চারটার দিকে। সূর্যোদয়ের অনেক আগেই সমুদ্র ফর্সা হয়ে যায়। জলরাশি আস্তে আস্তে রক্তিম বর্ণ ধারণ করতে থাকে। সূর্য যখন জলের ভিতর থেকে উঠে, তখন কেমন কলিজার মতো তকতকে আর বিশাল আকৃতির দেখায়। মনে সাহস বাড়ে, হতাশা দূর হয়, সূর্যের তেজদিপ্ত প্রত্যয় প্রাণে সঞ্চারিত হয়। আমার মনে হয়, এই দৃশ্যটি দেখলে মরণাপন্ন রুগীও যেন সুস্থ হয়ে যাবে!
লিখি মোবাইলে ভোর চারটার এলার্ম দিয়ে রাখলো। ক্লান্তির পর শরীরে আরাম পেলে যা হয়, আমার মনে হচ্ছিল আমরা ঠিক সময়ে উঠতে পারবো না। মোবাইলের এলার্মে নয়, ঘুম ভাঙ্গলো লিখির ডাকাডাকিতে। ঘরিতে দেখি রাত সাড়ে তিনটা। লিখির মনে হয়, উত্তেজনায় ভালো ঘুম হয়নি! আমরা মিনিট দশেকের মধ্যে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
কোন দোকানপাট খোলা নেই। কোথাও কোন বাতি জ্বলছে না। জনমানবের চিহ্ন মাত্র নেই। আমরা বীচে দাঁড়িয়ে আছি। শেষ রাতে সমুদ্রের একটানা শো শো গর্জন কেমন বোবা কান্নার মতো লাগছে। বুঝতে বাকি থাকলো না, আমরা বড্ড বেশি আগে এসে পড়েছি। আর শীতকাল বলে সূর্যোদয়ও ছয়টার আগে হবার কথা নয়। এখন আর ফিরে যাওয়ার মানে হয় না। হাঁটতে শুরু করলাম। শীতের গরম পোশাক গায়ে সমুদ্র তীরে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল।
একপাশে সমুদ্র আরেক পাশে নারিকেল জিজিরা ও বিস্তীর্ণ ঝাউ বন। আগে যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা যেতো, আইলার তাণ্ডবে তটরেখা একটু পরিবর্তন হওয়াতে সেখান থেকে এখন আর তা ভালো দেখা যায় না। এখন উপভোগ্য রকমে দেখতে হলে উপকূল ধরে প্রায় ৯/১০ কিলোমিটার দূরে গঙ্গামতি নামক স্থানে যেতে হয়, তথ্যটি রাতে হোটেল ম্যানেজার বেলাল সাহেবের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম। বাহন হিসেবে ভ্যান, মোটর সাইকেল, ঘোড়া ব্যবহার হয়। কেউ কেউ পদব্রজেও যান।
আমরা আসলে কিসে যাবো কিছু না ভেবেই তিনজন হাত ধরাধরি করে হাঁটছি। সর্ব ডানে সমুদ্রের সাইডে স্ত্রী, মাঝখানে কনে লিখি ও সর্ব বামে আমি। স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে কিলো দেড়েক হেঁটে ফেলেছি। এখন আর পিছন ফিরেও কিছু দেখা যায় না। নারিকেল জিজিরা পেরিয়ে ঘন ঝাউয়ের বন। আইলার তাণ্ডবের চিহ্ন উপড়ানো মরা গাছ, গাছের মোথা ভুতের জটাধারী মুণ্ডুর মতো এখানে সেখানে পড়ে রয়েছে।
হঠাৎই শেষ রাতের একটি দমকা হাওয়ায় ঝাউবন যেন দুলে উঠলো, আর ছুটে আসা বড় বড় ঢেউ তটরেখায় আছড়ে পড়তেই জল ছিটে এসে আমাদের চোখে মুখে লাগলো। আমার মনটাও একটু দুলে উঠলো। আমি একা পুরুষ, তালপাতার সেপাই। আমার শিশুকন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় চলেছি! এখনই যদি ঝোপের ভেতর থেকে কোন চোর, ডাকাত, বদমাস ছুটে আসে, কিংবা কোন বুনো প্রাণী! কি করবো আমি! আমি কি ভয় পেয়েছি! নিজেকে বেকুব বলে ধিককার দিতে ইচ্ছে করছে।
ভয় একটি সংক্রামক ব্যাধি। আমার স্ত্রী ডানপাশ থেকে পিছন দিয়ে ঘুরে এসে আমার বাম হাত ধরলো। লিখি আমার হাতটি শক্ত করে চেপে ধরলো। সবগুলো ঘটনা একসাথেই ঘটলো। কেউ কোন কথা বলছি না। চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছি। ওরাও যে ভয় পেয়েছে, এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ।
আমি অসহায়ত্ব নিয়ে একবার উপরের দিকে তাকালাম। তখনই ঘটলো ঘটনাটা। সাগরের দিক থেকে একটি কুকুর আমাদের সমনে দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে নিঃশব্দে পার হয়ে যাচ্ছে। আমার স্ত্রী ও কন্যা হাঁটা থামিয়ে আমার গায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলো, যেন মিশে যেতে চাচ্ছে। আমি অস্ফুটে ডেকে উঠলাম, ভোলা আয় আয় আয়,,,।
ওরা যেন কিছুটা বিরক্ত হলো। আমি হাঁটা থামাচ্ছি না। মুহূর্তে কুকুরটি সারা দিয়ে দৌড়ে পিছেনে এসে আমাদের চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করলো।
কুকুরটি দৌড়ে দৌড়ে একবার পিছনে আসে আবার সামনে যায়, তবে কাছে আসে না। কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের যেন পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ওরা স্বাভাবিক হলো। এবার আমার কন্যাটিও শিশু কণ্ঠে, কুকুরটি কে “ভোলা, ভোলা! আয় আয়,,,।”বলে ডাকতে শুরু করলো। কুকুরটি তার ডাকে সারা দিতে শুরু করলো কিন্তু একটা দূরত্ব বজায় রেখে। অবাক করা বিষয় হলো, কুকুরটি কোন শব্দ করছে না।
আমরা এভাবে তিন কিলো পথ পারি দেয়ার পর ফজরের আজান পড়লো। একটি দুটি হোন্ডার আনাগোনা শুরু হলো। আমরা একটি দোকান পেলাম। ভাবলাম, বসে একটু জিরিয়ে নিই, সাথে এক কাপ গরম চা পেলে মন্দ হয় না। আর কুকুরটিকে কিছু একটা খাবার দিই। দোকানে তখনো চা তৈরী হয়নি। সদ্য পানি বসানো হচ্ছে। কোন খাবার না থাকায় কুকুরটিকে দিতে পারলাম না। ইতিমধ্যে লোকজন আসতে শুরু করলো। ইডেন মহিলা কলেজ থেকে শিক্ষা সফরে যাওয়া একদল ছাত্রী উপর থেকে নেমে আসছে বীচে। আমরা দোকানের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অপেক্ষা করতে করতে নাটোরের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। উনার সঙ্গে গল্প করতে করতে অদূরে শুয়ে থাকা কুকুরটির কথা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্যে ভুলে গেলাম।
চা তৈরী হলো। রুটি ডাল ভাজি আসলো। আমরা রুটি নিয়ে তাকিয়ে দেখি কুকুরটি নেই। এদিক ওদিক খোঁজলাম। আমি ও ছোট্ট লিখি “ভোলা, ভোলা!“ বলে ডাকলাম। না, আর পেলাম না। পরে আমরা হোন্ডায় করে গঙ্গামতি চলে যাই। কুকুরটির বিষয়ে আমরা কেউ কোন কথা বললাম না।
একটি ব্যস্ত দিন শেষে রাতে হোটেলে ফিরেই আমার স্ত্রী বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। আমি ভলিউম মিউট করে টিভি চ্যানেল ঘুরাচ্ছি। আমাদের লিখি পাশে এসে বসলো। সে আমাকে বললো, ওটা কি ছিল বাবা!
– কোনটি?
– ওই যে, ভোর রাতে বীচে।
– কুকুর।
– শীতের রাতে কুকুর সাগর পাড়ে থাকে?
– কি জানি, থাকে হয়তো! ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসা সামুক, ঝিনুক, মাছ এসব খেতে হয়তো সমুদ্রে যায়।
– তাহলে সারাদিন আর কোন কুকুর দেখিনি কেন!
আসলেই তো, দুদিনে বীচে তো আর কোন কুকুর দেখিনি। আমি ভাবনায় পড়লাম। লিখি আবার বললো, তুমি ওটিকে ভোলা নামে ডাকলে কেন?
– আমার বাবার এই নামে একটি কুকুর ছিল। বাবা মারা যাবার পর ওটি তিনদিন বাবার কবরে শুয়েছিল। খাবার খেতো না। কুঁই কুঁই করে কান্না করতো। তিনদিন পর ওটি মারা যায়।
– সেই ভোলা তো কবেই মরে গিয়েছে, তাহলে ওই নামে ডাকলে কেন?
– জানি না, হঠাৎ মুখ ফুটে বেরিয়ে এসেছিল।
– তাহলে ওটা নিশ্চয় কুকুর ছিল না। আল্লাহ পাঠিয়েছেন আমাদের সাহায্য করতে।
– হয়তো।
– তবে কুকুর কেন? জায়গাটা তো সুন্দরবনের কাছে। একটি বাঘও তো পাঠাতে পারতেন!
– বাঘ হলে আমরা উল্টো ভয়ে মরে যেতাম!
– মানুষ হলে!
– আমাদের যতো ভয় তো মানুষকে নিয়েই!
আমাদের কথোপকথনে ওর মা ঘুমে ডিস্টার্বড্ হয়ে খেঁকিয়ে উঠতেই আমরা চুপ হয়ে গেলাম।
এরপর আরো দুদিন আমরা ওখানে ছিলাম। বীচে গেলেই আমরা বাপ-বেটিতে ভোলাকে মনে মনে খুঁজতাম, কিন্তু ভোলা তো দূরে থাক কোন কুকুরই দেখিনি। ভোলা আকৃতিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ বড় ছিল, আর সে উঠে এসেছিল সমুদ্রের দিক থেকে। সে কোন শব্দ করেনি। এ রহস্য নিয়ে আমরা এখনো কথা বলি, কোন যুক্তি দাঁড় করাতে পারি না।
যাক, মূল কথায় আসি। আমরা কুকুরের প্রভুভক্তির এমন অনেক কাহিনী জানি। আমার মেয়ে কোন সেন্সে কুকুরকে ইতর বলতে নারাজ, তা আমি জানি না। তবে মানুষকে কেন এই খেতাব দিতে চায়, তা আমি জানি। শ্রষ্টার সেরা সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুক এই মানুষ সম্পর্কে শিশু মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার জন্যে আমরাই দায়ী।
এই মানুষই তো বিশ্বজিৎ কে কুপিয়ে হত্যা করে; তনুর লাশ ফেলে রাখে জংলার ধারে; খাদিজাকে পুড়িয়ে মারে; গীর্জায় পাদ্রীকে হত্যা করে; হলিআর্টিসানে বোমা হামলা করে মানুষ মারে; খাদ্যে ভেজাল মিশায়; নকল প্যারাসিটামল বানায়; চরে টেটা, বল্লম যুদ্ধ করে! রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করে; সিরিয়ায় দমবদ্ধ করে শিশু হত্যা করে!