1. admin@mannanpresstv.com : admin :
স্মৃতিকথা -সাঈদা আজিজ চৌধুরী - মান্নান প্রেস টিভি
বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

স্মৃতিকথা –সাঈদা আজিজ চৌধুরী

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : শুক্রবার, ৩১ মে, ২০২৪
  • ১৩ Time View
যে সময়ের কথা বলছি,তখনও কিশোরী ছিলাম। সিলেটে আমাদের গ্রামের বাড়িতে প্রধান বাড়িটির পেছন দিকটায় পিতার তৈরি একটি কাঠের দোতলা ঘর ছিল। কক্ষটি বেশ বড়। জানালাগুলো খিড়কি জাতীয়। জানালা দিয়ে তাকালেই সুপারীর বাগান,আলুথালু চুলের নিসর্গ। বেগুনী জারুল ফুলের ঝুঁটি,গাব গাছ, আম গাছ,সদ্য মুখ বের করা চাঁপাকলার কাঁদি ইত্যাদি।সামান্য বাতাসেও বাঁশের কন্যাদের দীর্ঘ দেহ হেলেদুলে শনশন শব্দ করত। ঝিম ধরা ভালো লাগার এক অব্যক্ত অনুভূতি। আমার বর্তমান ঢাকার জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয় যেনো কেউ আমাকে আজীবনের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়েছে।আমি প্রকৃতির কন্যা।প্রকৃতিকে দারুণ ভালোবাসি আর প্রকৃতিও আমাকে।
কক্ষটির একপাশে একটি বড় খাট,পড়ার টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার। আরেক পাশে চওড়া একটি সেগুন কাঠের আলমারি। আলমারির সম্মুখভাগ স্বচ্ছ গ্লাসের তৈরি। ওটাতে দেশ বিদেশের লেখকদের প্রচুর বই থাকত। যে বয়সের জন্য যে বই উপযোগী সেভাবেই বইগুলো বিন্যস্ত ছিল। কক্ষটির ছাদের লাগোয়া কাঠের কিছু উঁচু তাক করা ছিল। সেখানেও বেশ কিছু বই এর সমৃদ্ধ কালেকশন ছিল।যেগুলো ছোটদের নাগালের বাইরে রাখা হয়েছিল।
যখনই অবসর বা স্কুল ছুটি থাকত, কিশোরী বয়সের বইগুলো খুব নাড়াচাড়া করতাম।বেগম রোকেয়ার জীবনী পড়ে অত্যন্ত প্রাণিত বোধ করতাম। জাতীয় কবির বিদ্রোহী কবিতাটি আমার খুব প্রিয়।অনেকবার বারবার পড়তাম।নিজের অজান্তেই গভীর চেতনাবোধে উদ্বুদ্ধ হতাম।পাঠ শেষে ঘেমে নেয়ে উঠতাম। এটি এমনই একটি কবিতা।কবিগুরুর নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতাটি দারুণ টানত আমায়। জীবনানন্দের কবিতা পড়তাম। কিন্তু নির্জনতায় কবিতার নিগুঢ় মর্মবাণী বুঝেছি অনেক পরে।
সন্ধ্যা হলে ভাইবোনরা নিয়ম করে পড়তে বসতাম।ভোরে ওঠে মসজিদে আরবী পড়তে যাওয়া, আবার নিয়ম করে স্কুলের প্রতিদিনের রুটিনমাফিক পাঠসূচি তৈরি করা, স্কুলে যাওয়া আসায় সারাদিন চলে যেত। সন্ধ্যার আগে এক ঘণ্টা খেলার সময়। এভাবেই নিয়মতান্ত্রিক শৈশব কৈশোর।
কিছুদিনের জন্য স্কুল বিরতি হলে খেলাধূলা, শিশুতোষ ছড়া বা গল্প বই পড়তাম। বিশাল একটি শান বাঁধানো পুকুর ছিল। সাঁতার কাটতাম। আমি তুখোড় একজন সাঁতারু ছিলাম।কিন্তু বড় হওয়ার পর ওই পুকুরে আমার সাঁতার কাটার ওপর পরিবার থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কার সাধ্যি ওই হুকুম তামিল না করবে ! এভাবেই শৈশবকে কেড়ে নেয়া হল।
এবার আসি কিশোরীবেলার স্মৃতিকথায়।
একটু বড় হয়েছি,কৌতুহলের শেষ নেই। বড় ভাইবোনদের শাসনের চাবুক সর্বাগ্রে আমার দিকে সবসময়ই উঁচিয়ে থাকে।একটি কথা বলা হয়নি।ভাইবোনদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ আমি।কাঠের দোতালার ছাদের সঙ্গে লাগোয়া তাকে বড়দের বই। ওটাতে হাত দেয়া যাবে না পারিবারিক অনুশাসনের অভিধানে লেখা রয়েছে। যতই বড় হতে থাকলাম, উঁচু তাকে সাজিয়ে রাখা বই গুলোর প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠলাম।
ততদিনে সিলেট ছেড়ে ঢাকার একটি হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি।ক্লাস নাইনে পড়ি।স্কুল ছুটি হলে সিলেটে যাই। ভাইবোনরা একসাথে মজা করি। কিন্তু উপরের তাকে তুলে রাখা বইগুলো আমাকে ক্রমাগত আকর্ষণ করতেই থাকল—নিষিদ্ধ গন্ধমের মত।
বড়বোনকে জিজ্ঞেস করলাম, বইগুলো কোন কথা-সাহিত্যিকের লেখা?ওগুলোতে কি লিখা থাকে? আমি কেন পড়তে পারবো না? বললেন,”ওই তাকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,বঙ্কিমচন্দ্র, আশাপূর্ণা দেবী, সমরেশ মজুমদার— বড় বড় লেখকের লেখা আছে। তোমার এখনও এইগুলো পড়ার বয়স হয়নি। একজন পূর্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষ যৌবনকালে এক ধরণের আকর্ষণ অনুভব করতে পারে। তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠতে পারে।সামাজিকভাবে সেইগুলো স্বীকৃত নাও হতে পারে।”
শরৎচন্দ্র নামটি শুনা মাত্র আমার বুকে জোয়ার ভাটা শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের বন্ধুদের মুখে “দেবদাস”বইটির কথা মনে পড়ল। এটা আমাকে পড়তেই হবে।সুযোগ খুঁজতে থাকলাম।
সকালের দিকে কাঠের দোতলায় তরতর করে ওঠে আসলাম। একটি চেয়ার টেনে উঁচু তাকের কাছে নিয়ে শরৎচন্দ্রের দেবদাস বইটি পাগলের মত খুঁজতে থাকলাম। অবশেষে পেলাম। টেবিলে বসে গোগ্রাসে গিলতে থাকলাম। বইটি শেষ করার পর আর চেয়ার থেকে উঠতে পারছি না। ইতোমধ্যে পারু এবং দেবদাসের বিরহপর্ব মনের ওপর দিয়ে বিশাল এক সুনামি বয়ে গেল।পরবর্তীতে দেবদাসের মৃত্যু আমাকে কাঠের দোতলা কক্ষের একপাশে থাকা খাটে মৃত্যুবৎ শুইয়ে দিল। চেপে রাখা কান্নার দমক বুক চৌচির করে বেরিয়ে আসল। কিছুতেই কান্না থামছে না। ভয়ও পাচ্ছি। বড়দের চোখে পড়ে যাওয়ার ভয়। গোসল, খাওয়া দাওয়া করার জন্য নীচে নেমে যাওয়ার কথা। আমি কিছুতেই নিজের ইমোশনকে কন্ট্রোল করতে পারছি না। টপটপ করে চোখ বেয়ে পানি পড়ছে তো পড়ছে। নিজেকে প্রবোধ দেই,আমি দেবদাসের প্রেমিকা নই,আমি পারু নই।কিন্তু “ আমি”যে তখন কোন আমি হয়ে গেলাম—সে রহস্য এখনও এই পরিণত বয়সেও আমাকে ভাবায়।
Every action has an equal and opposite reaction —Newton’s third law of motion— প্রযোজ্য হওয়ার অপেক্ষায় প্রমাদ গুনতে থাকলাম।
দুপুর গড়িয়ে গেল,নাওয়া খাওয়া কিছু নেই।নিজের কাছে নিজে প্রমিজ করলাম— বিয়ের আগে কখনও প্রেম করব না। সরাসরি বিয়ে করব। সে গল্পটি ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল। অন্য একদিন বলা হবে।
তখনও থেমে থেমে হেঁচকি তুলে কাঁদছি। ততক্ষণে বড় আপা দোতলায় উঠে এসেছে।তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে টেবিলে এসে দেবদাস বইটি অন্য বইএর নীচে গোপন করার বৃথা চেষ্টা করলাম। বড় আপা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,”কাঁদছিস কেন? চোখ মুখ সব ফুলে গেছে। দেখি কি বই পড়েছিস?”লুকিয়ে রাখা “দেবদাস”সহজেই বড় আপার হাতে চলে আসল। আর যায় কোথায়? সজোরে একটি চপেটাঘাত গালে আঘাত করল। শাসনের ভয়ে আমারও কান্না থেমে গেল।বড় আপা গজগজ করতে করতে বলল,” “এ কারণেই তোকে এই বইগুলি পড়তে বারণ করা হয়েছে।এ বয়সে অন্ধ ইমোশন থাকে।”
এখন বুঝতে পারি একটু পরিণত মস্তিষ্কে এই বইগুলি পড়া উচিত। তবে এই পুরনো বইগুলো না পড়লে সাহিত্যরস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন।
কলমস্বত্ব সংরক্ষিত
২৯/৫/২০২৪

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD