গহীন নির্জনে, স্মৃতি এসে কড়া নাড়ে, অনাহত মনের ঘরে—
ধুলো-জমা আর্শিতে—বেহিসেবী জীবনের হালখাতা মেলে ধরে :
জীবনের প্রথম পাতা, মাতৃ আদরে আদরে—কী যে যত্নে লেখা,
মায়াবী চাঁদের জোছনায় ধুয়ে ধুয়ে অপার মমতায় ভরা!
মা-বাবার মতোই সত্য—অতল আটলান্টিকে প্রশান্তির ছায়া,
এপারে ওপার আঁকা অপার সমুদ্দুর—আহা কী স্মৃতিমধুর!
কিন্তু একদিন বহুদিন পরে দেখি—সত্যের লেনদেনে ফাঁকি,
কত কী অজুহাতে, মনো ছল-চাতুরীতে বাকির খাতাটা ভারী!
মনের কুহক খাঁচায় ইঁদুর পুসিয়া— প্রতি পাতা কাটাকুটি!
তবে, জীবন খাতার শেষের কবিতা—’সে’—জীবনের মহাকাব্য!
আর বাকি সব পাতা—কী যাতনা ইসে, মন-মুখোশে ফাঁকা বুলি—
ভালো আছি ভালো থেকো; কেমন আছেন? হাঁ—হোতদ্ভব যতসব!
অথচ যেদিন, সবুজ কিশলয়ে ছিল অবুঝ রঙের খেলা—
সেসব দিনরাত স্মৃতির খেরোখাতায় যতি-চিহ্নহীন লেখা :
কিশোর পাতাগুলো ঝুপঝাপ বৃষ্টিভেজা, রোদেলা দুপুরে আঁকা,
তীব্র ভাবাবেগে ‘ওরা অকারণে চঞ্চল’— অভিমানী-চোখে জল!
‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’, পাখিদের কলরবে কেঁপে ওঠে মৌবন—
বালিকার মুগ্ধ চোখে ইচ্ছের ডানা মেলে, স্বপ্ন নাচে পরীর মতো!
অরূপ একদিন, বহুদিন পরে মনে—জগতের শ্রেষ্ঠ সময়—
আদি নক্ষত্রের আলোয় ফুটে গর্ভফুল—অমৃত-যৌবন-ভ্রূণ!
আগুনে-পোড়া পৃথিবী, পাথরের বুকে আঁকে জীবনের ফসিল;
স্মৃতি-বিস্মৃতি বিদুর, ইথারে ইথাকার সুর—দিগন্ত সুদূর!—
রাজ্য ভাঙে সাম্রাজ্য গড়ে, রাজ্য হারিয়েও কেউ ইতিহাস হয়,
জীবনের কুরুক্ষেত্রে লিখে—’সে’—কবিতা : বিদ্রোহী-যৌবন অক্ষয়!
অথৈ বহুদিন পরে সমর্পিত প্রেমে! শোধ করে সে স্বগোক্তিতে :
ভুলে গেছ কি আমারে?
আমি তো আজন্ম প্রেমের কৃতদাস হয়ে—
ঘুরছি অবিরত নিঃসঙ্গ চাঁদের মতো—’মহাপৃথিবী’র পথে—
তোমাকে খুঁজে খুঁজে ভিক্ষুক হয়ে গেলে নেই কোনো অভিযোগ,
নগ্ন প্রেমের কাছে অবহেলা অনাদরে থাকে না গো অভিমান;
তোমার প্রেমের নিঃশ্বাসে শাশ্বত মৃত্যুর সাধ ভুলে যাই শেষে!
বহুদিন পরে, অবিরল বৃষ্টিতে ভিজে কাদাজলে হাঁটু গেড়ে—
মন-মুখোশ ছিড়ে-ফুঁড়ে—অঙ্কুরোদগম হয় এক সত্য মানুষ!
যে ছিল অণ্তরে মুখোমুখি দেখা হলে, বলতে পারে না কি আর—
বুকের ভিতরে শিশিরের মতো নিঃশব্দ প্রেমের কী তীব্র ঘ্রাণ!
সবুজ ঘাসের শেষে পড়ে থাকে নিথর জীবনের ক্লেদাক্ত খাতা,
মানুষের বুকে তার জীবনের ইতিহাস কববের মতো বোবা…!