আল আমিনের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস মিন্টুসহ ৯ জনের নামে চারঘাট মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন-মিন্টুর আপন ভাগনে নাফিউল ইসলাম ওরফে মেগাবাইট (১৯), জুলকার নাঈম ওরফে মনিটর (২৪), বোন নাজমিন আরা মায়া (৪৫), বোনজামাই জিয়াউর রহমান ওরফে জুয়েল (৫২), মিন্টু বাহিনীর সদস্য মো. দেওয়ান (২৬), শাহিন আলম বোল্ট ওরফে সুজাউদ্দৌল্লা (৩৬), মো. সুরুজ (২৯) এবং মো. আপেল (২৩)।
মামলার এজাহারে জান্নাতুল ফেরদৌস উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিসংলগ্ন সারদা বাজারে তার স্বামী আল আমিনের সাইকেল স্টোর অ্যান্ড হার্ডওয়্যার্স নামে একটি দোকান রয়েছে। ২৬ এপ্রিল দুপুরে মিন্টুর ভাগনে মেগাবাইট ও অন্য আসামিরা জিআই পাইপ কেনার জন্য সেখানে আসে। এ সময় তার স্বামী ভাত খাচ্ছিলেন। কিছুটা দেরি হওয়ায় উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তারা। এ সময় তাড়া থাকলে তাদের অন্য দোকান থেকে পাইপ কেনার জন্য বলেন আল আমিন। বিষয়টি নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু করেন আসামিরা। একপর্যায়ে তারা জিআই পাইপ দিয়ে আল আমিনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর আল আমিন নিজেই অটোরিকশায় চিকিৎসার জন্য চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। এ সময় মেগাবাইট ফোন দিয়ে তার মামা মিন্টু এবং মা মায়াসহ অন্যদের বিষয়টি জানান। মিন্টু তাৎক্ষণিক চারটি মোটরসাইকেলে তার ক্যাডার বাহিনী ও বোন মায়াকে নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে জিআই পাইপ, হাঁসুয়া এবং চাপাতি নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করেন।
এ সময় আল আমিন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। হাসপাতালে প্রবেশ করেই আল আমিনকে জিআই পাইপ দিয়ে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন মিন্টু এবং তার ক্যাডাররা। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে আল আমিন বাইরে দৌড় দিলে ধাওয়া দেন মিন্টু ও তার বাহিনী। মিন্টু একপর্যায়ে আল আমিনকে ধরে ফেলে চাপাতি দিয়ে কোপাতে শুরু করেন। তার মাথায় কোপ দেন। এ সময় বাম ও ডান হাত দিয়ে আল আমিন প্রতিরোধ করলে বাম হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল কেটে হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। ডান হাত ও বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে হাতের সঙ্গে ঝুলে থাকে। মিন্টুর ভাগনে মেগাবাইট ও তার বাহিনীর সদস্য বোল্ট হাঁসুয়া দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। আরেক ভাগনে মনিটর লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে। বাহিনীর অপর দুই সদস্য সুরুজ ও আপেল রড দিয়ে বেধড়ক পেটায়। এ সময় মিন্টুর বোন মায়া আল আমিনকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন।
আল আমিনের মাথা, দুই হাত, কাঁধ, ঘাড়, পাসহ শরীরের অন্তত ১৫টি স্থানে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। শরীরে শতাধিক সেলাই দিতে হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে লেগেছে তিন ব্যাগ রক্ত। রাজশাহী এবং ঢাকায় দুই দফা অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুটি আঙুল অপর অংশের সঙ্গে সংযোগ করতে পারেননি চিকিৎসকরা। বিচ্ছিন্ন আঙুল দুটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় আলামত হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এজাহারে জান্নাতুল ফেরদৌস আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছিল আসামিরা। সেটি না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে।
গত বুধবার রাতে আল আমিনের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, তিনি বিছানায় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। নড়াচড়া করতে পারছেন না। ভালোভাবে কথাও বলতে পারছেন না। খুব কষ্ট করে তার ওপর হামলার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই মিন্টু এবং তার দুই ভাগনে আমার সঙ্গে দেখা হলেই জোরপূর্বক টাকা কেড়ে নেন। সর্বশেষ আমার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। না দেওয়ায় আমার ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে। আমার শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত অন্তত ১৫টি স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত রয়েছে। সেলাই দিতে হয়েছে শতাধিক।’
অভিযোগ উঠেছে, সাবেক ছাত্রদল নেতা মাজেদুল হক মিন্টু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকিরুল ইসলাম বিকুলের মদদে তিনি নানা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছেন।
আল আমিনের ওপর হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মিন্টু। আল আমিন প্রথমে তার বোন এবং ভাগনের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। স্থানীয়রা বলছেন, জামায়াতকর্মী আল আমিনও উগ্র প্রকৃতির। সামান্য ঘটনাতেই মুহূর্তের মধ্যে মারমুখী হয়ে ওঠেন।
মিন্টু অজ্ঞাত স্থান থেকে যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রথম দফায় আল আমিন আমার ভাগনে মেগাবাইটকে কাটার দিয়ে বাম গালে আঘাত করে। এ কারণে মেগাবাইটও তাকে মারে। এরপর আমরা তাকে হাসপাতালে গিয়ে ধরি। এ সময় আল আমিন আমার বোনকে মারতে উদ্যত হয়। বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি তাকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করেছি। এছাড়া আমি কোনো অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নই। সামনে পৌরসভা যুবদল কমিটির সভাপতি প্রার্থী আমি। এ কারণে একটি মহল বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিতভাবে বলার চেষ্টা করছে।’
চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকিরুল ইসলাম বিকুল সাবেক ছাত্রদল নেতা মিন্টুকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ভোটের রাজনীতি করি। ক্যাডার বা সন্ত্রাসীদের কোনোরকম প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। দলের নেতা হিসাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে মিন্টু থাকেন।’
চারঘাট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নাসির উদ্দিন তুহিন জানান, ইতোমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেফতারের পর তারা জামিনে রয়েছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বাম হাতের আঙুলের বিচ্ছিন্ন অংশসহ সব আলামত জব্দ এবং হামলার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়েছে।