পহেলা মার্চ বড় মেয়ের জন্মদিন। বাবার কাছে বায়না ধরেছিল রেস্তরাঁয় নিয়ে যাওয়ার। পরে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বেইলি রোডের পাঁচতলার জেস্টি রেস্তরাঁয় গিয়েছিলেন অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার। রাত ১২টায় সেখানে কেক কেটে জন্মদিন উদ্যাপনের কথা ছিল। কিন্তু রেস্টুরেন্টে বসে হঠাৎ পোড়া গন্ধ পান কামরুজ্জামান মজুমদার। তখন জানালায় তাকিয়ে লোকজনের জড়ো হয়ে চিৎকার শুনতে পান। একপর্যায়ে চিৎকার বেড়ে যায়। তিনি বলেন, তখন আমার স্ত্রীও জানালার কাছে আসে। এমন সময় হঠাৎ জানালার পাশ থেকে ধোঁয়া উঠলো। আমরা বুঝলাম, আগুন লেগেছে।
তখন রেস্টুরেন্টে প্রায় ১০-১২ জন ছিল। আমরা সবাইকে জানাই, আগুন লেগেছে। দ্রুত বের হয়ে যেতে হবে। সেই তলায় কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছিল না। সেখানে যদি আগুন লাগত তাহলে আমাদের কাছে নিজেদের বাঁচানোর মতো কিছু ছিল না।আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং প্রতিষ্ঠানটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান। পরিবেশদূষণ নিয়ে গবেষণার কাজ করে এই প্রতিষ্ঠানটি। ওই রাতে ভবনটিতে আগুন লেগেছে বোঝার পর কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী মারুফা গুলশান আরা আগুন লাগার বিষয়টি সবাইকে জানান। তাদের কথা শুনে শোরগোল পড়ে যায়। সবাই মিলে নিচে নামার চেষ্টা করতে থাকেন। একতলা পর্যন্ত নিচে নামার পর আর নামতে পারেননি। নিচ থেকে দল বেঁধে লোকজন আসছিল ওপরের দিকে। আর আসছিল ধোঁয়া। তখন তারা সবাই মিলে ছাদে যাওয়ার জন্য উঠতে থাকেন। কামরুজ্জামান বলেন, তখন একটাই ভয় লাগছিল, যদি ছাদের দরজা বন্ধ থাকে তাহলে কী হবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ভালো, গিয়ে দেখি ছাদের দরজা খোলা। কিন্তু ছাদে গিয়ে বিপত্তি দেখা দিলো আশপাশে এই ভবনের লাগোয়া কোনো ভবন নেই। আর ছাদে আছে দুটি রেস্তরাঁ এবং নামাজ পড়ার স্থান। ছাদের তিন-চতুর্থাংশ জায়গাই খালি ছিল না। প্রথমেই তারা ৫০ জনের মতো লোক সেখানে যান। তাদের মধ্যে নারীই বেশি। সময় যত যাচ্ছিল আগুনের ধোঁয়া তত উপরের দিকে উঠছিল। একপর্যায়ে শুধু ধোঁয়া নয়, আগুনের লেলিহান শিখা তখন ছাদের দিকে আসছে। আর শুরু হয়েছে চিৎকার।
কামরুজ্জামান বলেন, তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। কেউ কেউ নিজেদের জামা খুলে পানিতে ভিজিয়ে চোখে-মুখে দিচ্ছিলেন। আগুন কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেউ কেউ লাফ দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। আমার স্ত্রী ও আমি মিলে তাদের বললাম, এখনো তো আমাদের বাঁচার সুযোগ আছে। কিন্তু এত উঁচু থেকে লাফ দিতে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু। একটু দেখি ফায়ার সার্ভিস আসে কিনা। কিন্তু চিৎকারে, আহাজারিতে তখন চারিদিকে ভয়ানক পরিস্থিতি হয়ে ওঠে। আমি শুনেছি, ছাদে থাকা দুজন লাফ দিয়েছিলেন। আমার মেয়েরা দেখেছে। এরপর থেকে ওরা ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে। এখনো কথা বলতে পারছে না। অনেকেই তখন সেখানে নামাজে বসে যান, প্রার্থনা শুরু করেন বাঁচার আকুতিতে। ওই ছাদে তখন অনেক কাপড় শুকাতে দেয়া ছিল। কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী মিলে সেগুলো নিচে ফেলে দিতে থাকেন। কারণ, দাহ্য বস্তু পেলে আগুন দ্রুত আসবে। একপর্যায়ে ছাদের রেস্তরাঁয় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তখন চিৎকার আরও বাড়ে।
আহমেদ কামরুজ্জামান বলেন, তখন আমার বড় মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, বাবা, আমার জন্মদিন কি মৃত্যুদিন হয়ে যাচ্ছে? আমরা সন্তানসহ সবাইকে প্যানিকড্ না হওয়ার জন্য বারবার বলতে থাকি। আমার স্ত্রীও সাহসিকতার সঙ্গে অন্যদের বোঝাতে থাকেন। আগুনে যখন পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, তখন নিচ থেকে ফায়ার সার্ভিসের কথা শুনতে পান ছাদের লোকেরা। তারা বলছিলেন, ক্রেনের দিকে চলে আসতে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের ক্রেন কোনদিকে তা কেউ দেখতে পাচ্ছিলেন না। এমন সময় ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী ছাদে উঠে আসেন। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করতে থাকেন। ওই কর্মী একপর্যায়ে একটি হাতুড়ির মতো বস্তু নিয়ে ছাদের একটি রেস্তরাঁর দরজা ভেঙে ফেলেন, যাতে আগুন না আসে।
চারিদিকের আগুনে ইতিমধ্যে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে সেখানে পড়ে যান। একপর্যায়ে ক্রেনের দেখা পান তারা। তখন রাত প্রায় ১২টা বেজে গেছে। প্রথম ক্রেনে ৪টি শিশু ও নারী এবং অসুস্থ কয়েকজনকে তুলে দেয়া হয়। প্রথমে ক্রেনে বেশি লোক নিলেও পরে চার-পাঁচজন করে নেয়া হয়। ১০ থেকে ১২ দফায় সবাইকে নামানো হয়।