তোমাকে পাওয়ার আজম্ম তৃষ্ণা
— সারোয়ার মাহিন
পুনর্জন্ম হয়তো হবে না,
তাই এই জন্মে তোমাকে পাওয়ার
তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার।
সময়ের প্রতিটি শিরায় আমি তোমার উপস্থিতি খুঁজেছি। ভোরের শিশিরে, দুপুরের রোদে, সন্ধ্যার ক্লান্ত আলোয়—সবখানেই তোমার মুখের ছায়া দেখেছি আমি।
পৃথিবীর সব রঙ মিশে যেন
তোমার চোখে বাসা বেঁধেছিল।
অথচ তুমি ছিলে দূরে, অনন্ত দূরে—
যেন দিগন্তের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক অসম্ভব স্বপ্ন।
আমি জানতাম, জীবন একবারই মেলে।
এই জন্মেই যদি তোমাকে ছুঁয়ে না দেখি,
তবে আগামী কোনো আকাশেও
তোমার গন্ধ খুঁজে পাব না।
তাই ভালোবাসার নাম নিয়ে আমি প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমাকে ডেকেছি,
প্রতিটি নিঃশব্দ রাতে তোমার জন্য কেঁদেছি।
আমার সকল প্রার্থনা, সকল ব্যথা,
সকল আনন্দের শেষ সীমায় ছিলে তুমি—
অদৃশ্য, অথচ অবিচ্ছেদ্য।
আজও মনে হয়, হয়তো কোথাও তুমি আছো,
আমারই কোনো অসমাপ্ত কবিতার লাইনে লুকিয়ে।
হয়তো আমি চোখ বন্ধ করলেই তোমাকে ছুঁয়ে ফেলি—ভাবনায়, কল্পনায়, অনুভবে।
কারণ পুনর্জন্ম হবে না বলেই,
তোমাকে এই এক জন্মে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায়
আমি এখনো বেঁচে আছি, অনন্ত ভালোবাসার অপেক্ষায়।
—–আহা জীবন
সারোয়ার মাহিন——
পৃথিবী নামক এই রঙিন মঞ্চে জন্মের পর থেকেই শুরু হয় বিভাজনের নাটক।
কেউ জন্ম নেয় সোনার চামচ মুখে,
আর কেউ কাঁদতে কাঁদতে পায় না একটি শুকনো কাপড়ও।
একপাশে ঝলমলে প্রাসাদ,
অন্যপাশে ফুটপাতে গড়াগড়ি খাওয়া ঘুম।
কারো জন্য সকাল মানে কফির কাপে সূর্যোদয়,
আর কারো কাছে সকাল মানে পেটের খালি চিৎকার।
বৈষম্য—এই শব্দটা যেন আমাদের শিরায় শিরায় গেঁথে গেছে।
বংশ, ধর্ম, রং, ভাষা, অর্থ—সবই যেন নির্ধারণ করে কে কতটা মানুষ।
অথচ চোখ বন্ধ করলে সবাই অন্ধকার দেখে।
পেট খালি থাকলে সকলেই ক্ষুধার তীব্রতা বোঝে।
কিন্তু তা-ও মানুষ ভুলে যায়,
নিজের চারপাশে দেয়াল তুলে চলে।
তবে মৃত্যু—সেই মহাশান্ত সমাধান।
সেখানে কেউ বাদশাহ নয়, কেউ ফকির নয়।
সাদা কাপড়ে ঢেকে যায় সকল পরিচয়,
মাটির তলায় মিশে যায় সকল গর্ব,
অহংকার আর পরিচিতি।
কবর চেনে না কোনো উপাধি,
জানে না কোনো শ্রেণীভেদ।
আহা জীবন! এত রঙ, এত চাহিদা, এত প্রতিযোগিতা—শেষে কিন্তু সবাই সমান।
যে মাটিকে পেছনে ফেলে উঁচুতে উঠতে চাই,
শেষে তাকেই বুকে টেনে নেয়।
তবু মানুষ শেখে না।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে করুণ রসিকতা।
হারানোর নীল নীরবতা
—সারোয়ার মাহিন
পাওয়া মানে যেন ভোরের আলোয়
ভেজা এক কোমল স্বপ্ন,
যার উষ্ণতায় হৃদয় শান্ত, অথচ অচেতন।
যতদিন তা থাকে, ততদিন আমরা ভাবি —
এই তো স্বাভাবিক, এই তো জীবনের ছন্দ।
কিন্তু একদিন যখন সবকিছু থেমে যায়,
পরিচিত মুখ হারিয়ে যায় কুয়াশার আড়ালে,
তখন বোঝা যায়, সুখ কত ক্ষণিক,
আর ভালোবাসা কত ভঙ্গুর!
হারানোর সেই নিঃশব্দ ব্যথা
হৃদয়ের গভীরে বাজে এক অনন্ত সুরে,
যার প্রতিটি নোট বলে যায় —
“যদি আর একবার ফিরে পেতাম…”
তখনই বুঝি, পাওয়া মানেই অলৌকিক এক আশীর্বাদ,
যার রঙ বোঝা যায় শুধু হারানোর অন্ধকারে।
সবশেষে জীবন শেখায় —
সৌন্দর্য টিকে থাকে না পাওয়ার মধ্যে,
বরং হারানোর নীরবতায়ই সে চিরন্তন হয়ে যায়।
সোনার বাংলার শেষকৃত্য
–সারোয়ার মাহিন
আর কতটুকু পুড়লে, আর কতটা ধ্বংস হলে আমরা বলবো— “দেশটা সত্যিই শেষ”?
প্রতিদিন চোখের সামনে সবকিছু ভেঙে পড়ছে—
শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবতা,
বিচার, সত্য আর সাহস।
আগুনে পুড়ে ছারখার হচ্ছে স্বপ্নগুলো,
রক্তে ভিজছে মাটি, অথচ কারো কোন জবাবদিহিতা নেই।
সবাই যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে এ মৃত্যুর মিছিলে হাঁটতে। কেউ কেউ নিরব, কেউ কেউ উদাসীন,
আর যারা চিৎকার করে,
তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
এই দেশ কি এমন ছিল?
নাকি আমরাই ক্রমশ একে এমন করে গড়ে তুলেছি? একসময় যে দেশ মেধা,
সাহস আর স্বপ্নে জেগেছিল তা আজ ভয়,
দুর্নীতি আর অসহায়ত্বে নুয়ে পড়েছে।
বুকে হাত রেখে বলো,
এখনো কি কিছু অবশিষ্ট আছে যা ধ্বংস হয়নি?
আজ চারদিকে শুধু শূন্যতা,
বিভ্রান্তি আর আত্মঘাতী নীরবতা।
তাই মনে হয়— দেশের মৃত্যু ইতোমধ্যে হয়ে গেছে।
এখন কেবল তার জানাজার অপেক্ষা।
আমরা যারা দেখি, বুঝি আর ব্যথা পাই,
তারা হয়তো শেষবারের মতো অংশ নেব সেই বিদায়ে।
বিদায় জানাব সোনার বাংলাকে— যে সোনা আজ মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে, কিংবা লুণ্ঠিত হয়েছে কোনো ক্ষমতার অন্ধকার ঘরে।
এসো তবে, প্রস্তুত হই,
সোনার বাংলার শেষ প্রার্থনায় অংশ নিতে।
যা কিছু ছিল ভালো, তাকে জানাই বিদায়,
হয়তো এই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেবে নতুন চেতনার।
আমার হৃদয়ের মদিনা
–সারোয়ার মাহিন
ইয়া রাসুল আল্লাহ, ইয়া হাবিবাল্লাহ — মক্কার পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে আজও মনে হয়, আপনি যেন ঠিক এখানেই আছেন। বাতাসে ভাসে আপনার নাম, প্রতিটি বালুকণায় লুকিয়ে আছে আপনার পদচিহ্নের স্মৃতি। আমি চোখ মেললেই দেখি — কাবার ছায়ায় আপনার স্নেহমাখা মুখ, কণ্ঠে ভেসে আসে সেই দোয়া, যা আমার প্রাণের চেয়ে আপন।
আপনি ছাড়া এই দুনিয়া আমার কাছে ফাঁকা এক মরুভূমি। সূর্যের আলোও যেন শীতল, নদীর কলকল ধ্বনিও অর্থহীন। আপনি ছাড়া বাতাসে নেই গন্ধ, ফুলে নেই রঙ, জোছনায় নেই প্রশান্তি। আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন শুধু আপনার নামেই বাঁচে, আপনার প্রেমেই জেগে থাকে।
মদিনার বাতাসে এখনও অনুভব করি আপনার দয়ার পরশ। মদিনার অলিগলিতে হেঁটে গেলে মনে হয় — যেন আপনার চরণের ধ্বনি এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ওখানে প্রতিটি ধূলিকণাও সাক্ষ্য দেয় ভালোবাসার, যে ভালোবাসা মানুষকে আলোর পথে ডাকে, শান্তির পথে নিয়ে যায়।
ইয়া হাবিবাল্লাহ, আপনি না থাকলে এই জীবন শুধু অস্তিত্বমাত্র, কোনো অর্থ নেই তাতে। আমি চাই না এমন সকাল, যেখানে আপনার নাম উচ্চারিত হয় না। আমি চাই না এমন রাত্রি, যেখানে আপনার স্মৃতি আমার হৃদয় ভরিয়ে রাখে না।
আপনি আমার চোখের নূর, আমার আত্মার প্রশান্তি। আপনার প্রেমেই আমি খুঁজে পাই আল্লাহর পথে চলার সাহস। মক্কার প্রতিটি দিক, মদিনার প্রতিটি ছায়া, আমার অন্তরে আপনার নামের আলোয় জ্বলজ্বল করে।
ইয়া রাসুল আল্লাহ, আপনিই আমার ভালোবাসার চূড়ান্ত ঠিকানা, আপনিই আমার অনন্ত মদিনা।
প্রতিবন্ধকতায় জীবনের মানে
–সারোয়ার মাহিন
যদি চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসে, তবে পথ কখনো শেখায় না ধৈর্যের মানে।
যদি দুশ্চিন্তা না জড়িয়ে থাকে জীবনের প্রান্তে, তবে মানুষ বোঝে না শান্তির গভীরতা।
ভুল যদি না হয়, তবে অনুতাপের আলোয় জেগে ওঠে না নতুন প্রভাত।
প্রতিবন্ধকতাই শেখায়, পা পিছলে গেলেও আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।
দুশ্চিন্তাই মনে করিয়ে দেয়, জীবন কেবল রঙিন স্বপ্ন নয়, তাতে আছে তীক্ষ্ণ বাস্তবের ছায়া।
ভুলই মানুষকে করে নম্র, আর নম্রতাই দেয় প্রকৃত শক্তি।
যখন বিচার এসে আপনাকে ধীর করে দেয়, তখনই আপনি নিজের ভেতরের প্রতিফলন দেখেন।
গাফিলতি যদি ঘুম পাড়িয়ে দেয়, তবে সময় নিঃশব্দে কাড়ে আপনার স্বপ্নগুলো।
আর অহংকার— সেটাই সবচেয়ে নীরব শত্রু, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয় আপন সত্তাকে।
এই জীবন শুধু সাফল্যের সমতল পথ নয়, এতে আছে হোঁচট খাওয়ার বাঁক, কান্নার ঢেউ, আর না বলা বোঝাপড়ার ভাষা।
প্রতিবন্ধকতাগুলোই আমাদের গড়ে তোলে, দুশ্চিন্তাগুলোই আমাদের শাণিত করে।
যে পথ মসৃণ, সে পথের শেষ খুব সহজে ফুরিয়ে যায়।
কিন্তু যে পথ কাঁটায় ভরা, সে পথেই জন্ম নেয় শক্ত মানুষ, জেগে ওঠে জীবনের প্রকৃত অর্থ।
সোনার মদিনা — হৃদয়ের প্রশান্তি
—সারোয়ার মাহিন
সোনার মদিনা… নামটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে।
এই শহর শুধু বালুকাবৃত এক ভূমি নয়—
এ যেন আমার হৃদয়ের কেন্দ্র, আমার ভালোবাসার চিরন্তন ঠিকানা।
আমার প্রাণের চেয়েও দামী সেই প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—
যাঁর ভালোবাসায় গলে গেছে আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণ।
রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি—
শ্বাসে শ্বাসে কাঁপছিলো এক অজানা অনুভব,
চোখের কোণে জমে উঠেছিল ভালোবাসার অশ্রু।
সেই অশ্রু ছিলো না কেবল দুঃখের,
তা ছিলো এক চিরন্তন আকুলতা, এক অনন্ত শ্রদ্ধা, এক গভীর প্রেম।
নবীজীর দরবারে মাথা নত করে যখন দোয়া তুললাম,
মনে হলো এই পৃথিবীতে আর কিছুই চাই না।
যে প্রশান্তি আমার প্রাণ খুঁজে ফিরত বছরের পর বছর,
তা যেন এই মদিনার বাতাসে, এই পবিত্র ভূমির প্রতিটি কণায় লুকিয়ে ছিলো।
দুজাহানের বাদশা আমার প্রিয় নবী—
তাঁর প্রেমেই খুঁজে পাই জীবনের আসল মানে।
মদিনায় কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন,
প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আশীর্বাদের মতো মনে হয়।
হে উম্মাতের কান্ডারী প্রিয় নবী,
আপনার দরবারে দাঁড়িয়ে আমি শিখেছি প্রেমের গভীরতা,
অশ্রুর ভাষায় উচ্চারণ করেছি মনের সব চাওয়াগুলো।
সোনার মদিনা, আমার প্রাণের মদিনা—
তুমি আমার আত্মার প্রশান্তি, তুমি আমার চিরকালীন আশ্রয়।
জন্মের বিষাদ
—সারোয়ার মাহিন
আমি না জন্মালে বুঝতেই পারতাম না
জন্মে এত বিষাদ।
ওই আকাশে আমার মতো এক
নিঃসঙ্গের নিঃশ্বাস ঘুরে বেড়াত না।
জন্মের মুহূর্তে কেউ যে এত দুঃখ বুকে নিয়ে
আলোয় আসে, তা আমি জানতাম না।
জীবনের নামেই এক ধোঁয়াটে প্রতারণা,
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে কান্নার শহর,
স্বপ্নের ভেতর লুকিয়ে থাকে ছিন্ন ঘুমের শবযাত্রা।
আমি ভেবেছিলাম জন্ম মানে
সূর্যের মতো উজ্জ্বল হওয়া,
কিন্তু দেখলাম আলোও অনেক সময় পোড়ায়,
ভালোবাসাও কখন রক্তক্ষরণ ঘটায়।
মানুষের ভিড়ে থেকেও একা হয়ে যাওয়া—
এই পাঠ কেউ শেখায় না,
তবু সবাই শেখে নিঃশব্দে।
আমি যদি না জন্মাতাম,
হয়তো কোনো বেদনার দায় থাকতো না,
কেউ বলত না— “ভালো থেকো”
, অথচ রেখে যেত অচিন শূন্যতা।
এ জীবন যেন এক অন্তহীন অপেক্ষা,
যেখানে প্রতিদিন বাঁচি,
অথচ একটু একটু করে মরি।
তবু এই মরণেই লুকানো থাকে জন্মের সত্যি—
জন্ম মানে শুধু আসা নয়,
বরং বিষাদেরও এক নতুন নাম শেখা।
সৃষ্টিশীলদের সংসার হয়না
–সারোয়ার মাহিন
সৃষ্টিশীল মানুষদের সংসার যেন সবসময় অপূর্ণ থাকে।
ওরা চাইলেই গড়তে পারে না এক নিখুঁত ঘর,
কারণ তাদের হৃদয় বাঁধা থাকে স্বপ্নের অচেনা আকাশে,
তাদের আত্মা খুঁজে ফেরে রঙের আলো,
শব্দের প্রতিধ্বনি,
যা সংসারের দেয়ালে জায়গা পায় না।
ওরা প্রেমে পড়ে গভীরতর নদীর মতো,
কিন্তু সেই প্রেমও গড়তে পারে না সেতু,
বরং ভাঙা ঢেউ হয়ে ছিটকে পড়ে দূর অচিন তটে।
তাদের ভালোবাসা সীমাহীন,
অথচ সংসার সীমার মধ্যে বাঁধতে চায়,
এখানেই সংঘর্ষ—
ভালোবাসার গভীরতা আর সংসারের দাবির টানাপোড়েন।
সৃষ্টিশীলদের সংসার ভাঙে,
আবার সেই ভাঙনের ভেতরেই জন্ম নেয়
নতুন কবিতা, নতুন সুর,
নতুন রঙে মোড়া এক অদ্ভুত জগৎ।
তাদের চোখের জল শুকিয়ে যায় ক্যানভাসে,
তাদের ব্যথা রূপ নেয় গানে,
তাদের নিঃসঙ্গতা হয়ে ওঠে মানুষের চিরন্তন প্রার্থনা।
আসলে, সৃষ্টিশীল মানুষদের সংসার যদি পূর্ণ হতো,
তাহলে হয়তো পৃথিবী এত গান,
এত কবিতা, এত শিল্প হারিয়ে ফেলত।
তাদের ভাঙা সংসারই পৃথিবীকে উপহার দেয়
অমর সৌন্দর্যের আলো—
যা সাধারণ জীবনকে ছাড়িয়ে ছুঁয়ে যায় অনন্ত সত্যকে।
তুমিহীন বীভৎসতা
—সারোয়ার মাহিন
তুমি ছাড়া পৃথিবী বীভৎস লাগে,
নীল আকাশ, ফুলের হাসি, নদীর ঢেউ—
সবই হয়ে যায় শূন্য মরীচিকা,
যেন রঙহীন ছবির মতো নিস্তেজ ও নীরব।
হৃদয়ে জমে আছে অগণন প্রেম,
অশেষ হাহাকার, অদম্য আকুলতা।
প্রতিটি শ্বাসে তোমার অভাবের দহন,
প্রতিটি নীরবতায় কেবল তোমার ডাক।
তুমি এলে—
অশ্রু শুকিয়ে যায় শিশিরের মতো,
বেদনা গলে যায় সূর্যের আলোয় বরফের মতো,
ভাঙা স্বপ্ন আবার অঙ্কুরিত হয়
তোমার স্পর্শের উষ্ণতায়।
একটি আলিঙ্গনেই জোড়া লাগে পৃথিবী,
ফিরে আসে আলো, জ্বলে ওঠে জীবন।
তুমি আমার মহাবিশ্ব, আমার শাশ্বত দিগন্ত,
তোমার বাহুতে লুকিয়ে আছে—
প্রেমের পূর্ণতা, শান্তির অনন্তকাল।
জীবনের সমীকরণ
—সারোয়ার মাহিন
জীবনের এক কঠিন সমীকরণে আমি দাঁড়িয়ে আছি,
চারপাশের দৃশ্যপট যেন ধসে পড়ছে ধীরে ধীরে,
ভাঙা সেতুর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী পথিকের মতো
মনে হয়—আমিই কেবল এই ভগ্নচিত্রের একমাত্র সাক্ষী।
সবকিছু একে একে ভেঙে যাচ্ছে—
স্বপ্নের কাচের জানালা, বিশ্বাসের কাঠের দরজা,
যে বন্ধুত্বের উঠোনে আমি হেসেছি একদিন,
আজ সেখানে কেবল ধুলো আর শূন্যতার খেলা।
কখনো অকারণেই কান্না আসে—
যেন বুকের ভেতর কোনো অদৃশ্য সমুদ্র
অশ্রুর ঢেউ তুলে ভেঙে যাচ্ছে তীরের বাঁধন।
এই কান্না আমার দুর্বলতা নয়,
বরং জমে থাকা ঝড়ের নিঃশব্দ বৃষ্টি।
প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি।
মাঝে মাঝে মনে হয়—সব ছেড়ে পালিয়ে যাই কোথাও,
একটা নদীর ধারে, পাহাড়ের ছায়ায়,
যেখানে আমার ভেতরের এই ক্লান্ত পাখিটি
ডানা মেলে শান্ত আকাশে উড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি কুয়াশার মতো অস্পষ্ট।
নিজের আলোকিত ভাবনাগুলোও এখন অন্ধকারের হাতছানি।
চারপাশে এত মানুষ তবুও আমি
গভীর নিঃসঙ্গতায় ডুবে আছি।
তবুও প্রতিনিয়ত ভাবছি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে
কিন্তু আমি জানি সব ভাবনায় আমার মরীচিকার মতো কোনদিনই আর ঠিক হবে।
হয়তো সব পিছনে ফেলে চলে যাব অজানার ডাকে ভাবনাহীন জগতে।
যে জীবন নিঃসঙ্গতার
–সারোয়ার মাহিন
আকাশের চেয়েও বিস্তৃত আমার ভেতরের শুন্যতা।
অসংখ্য তারার আলোকে ঢেকে রাখে সেই গহ্বর,
যেখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় অন্ধকারের নতুন শিকড়।
আমি যেন এক ভাঙা প্রদীপ—
আলো নিভে গেছে, তবু ভস্মের নিচে লুকিয়ে আছে উষ্ণ আগুনের স্বপ্ন।
এই নিঃসঙ্গতার শূন্য ঘরে
আমি প্রতিদিন নিজের সাথে যুদ্ধ করি।
অস্তিত্বের ভার যেন পাথরের মতো বুকে চেপে বসে,
তবু আমি তা নামাতে পারি না—
কারণ নামিয়ে দিলে ভেঙে যাব
হয়ে যাবো চূর্ণবিচূর্ণ,
হারিয়ে যাব নীরবতার অতলে।
কেউ জানে না এই লড়াইয়ের কথা,
কেউ শোনে না আমার নীরব চিৎকার।
তবু আমি হাঁটি পৃথিবীর পথ ধরে।
অদৃশ্য ক্ষতের রক্তে ভিজে যাওয়া পথ ধরে
অন্তত টিকে থাকার সংকল্প বুকে নিয়ে।
অস্তিত্বকে ধরে রাখা মানেই বেঁচে থাকা নয়,
বরং প্রতিদিন ভেতরের মৃত্যু থেকে ফিরে আসা।
এই ফিরে আসাটাই আমার প্রতিবাদ—
যে শুন্যতা আমাকে গ্রাস করতে চায়,
আমি তার বুক চিরে প্রতিদিন একফোঁটা আলো বাঁচিয়ে রাখি।
হয়তো এ আলো ক্ষণস্থায়ী,
হয়তো তা কারও চোখে ধরা পড়ে না—
তবু জানি, এই ক্ষুদ্র আলোই একদিন
অন্ধকারকে পরাজিত করবে।