দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি মর্মে যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেন যে বিবৃতি দিয়েছে তার প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, এসব নিয়ে তাদের সরকারের কোনো চিন্তা নেই। ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বিদেশি পর্যবেক্ষক, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ভোট পরবর্তী মতবিনিময় অনুষ্ঠান ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ এ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর এই প্রথম দেশি-বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় হয়। পড়ন্ত বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার মাঠে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, রাশিয়া, চীনসহ অন্তত ৫০ জন রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার অংশ নেন। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে ভোট নিয়ে তিনি তেমন কিছু না বললেও অতিথিদের কাছে মন্ত্রণালয়ের তৈরি করে একটি নোট শেয়ার করা হয়। বিদেশি অতিথিদের বিদায়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করেই বলেন, কে কি বিবৃতি দিচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তা করছে না সরকার।গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে মন্ত্রী মোমেন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ভোটের ক্যাম্পেইনে ছিলাম। আপনারা জানেন আমরা অনেক বকবক করেছি, এজন্য আজ আর কথা বলছি না। অনেক দিন অনেকের সঙ্গে দেখা নেই, তাই আজ এমন আয়োজন করা হয়েছে।আমরা একে অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময় করলাম। মন্ত্রী বলেন, কাল নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। তারপর আমরা আরও কথা বলবো। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, আজকে এই অনুষ্ঠানটা হচ্ছে জাস্ট দেখা, সাক্ষাতের জন্যই আয়োজন করা হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমরা খুশি যে একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সংঘাতহীন নির্বাচন হয়েছে। জনগণ রায় দিয়েছে, দ্যাটস এনাফ। আমাদের আর কিছু দরকার নাই। জনগণ রায় দিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। মন্ত্রী বলেন, জনগণ রায় আমাদের স্বপক্ষে এসেছে। বিদেশিরা বলছে, দেশে ফ্রি (অবাধ), ফেয়ার (সুষ্ঠু), ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) ও নন ভায়োলেন্ট (সংঘাতহীন) ইলেকশন হয়েছে। ইলেকশন কমিশনকে সবাই ধন্যবাদও দিয়েছে। দ্যাটস ইট, অ্যান্ড উই আর ভেরি হ্যাপি উইথ ইট।’ মন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ নির্বাচনে গেছে, বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে এইটাই তো বড় কথা। জনগণ তাদের ভোট দেয়ার যে অধিকার, সেইটা আবার নতুন করে এস্টাবলিসড করেছে।’ মন্ত্রী বলেন, পশ্চিমারা নির্বাচন গ্রহণ করেনি, এমনটি নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন বলেছে, বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি।
বিবৃতিতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমরা হতাশ। অপরদিকে এক বিবৃতিতে বৃটেনের ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) মুখপাত্র বলেছেন, ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার মান পূরণ হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার বার বলেন, সব দেশই আমাদের ভালো বলেছে। বলেছে সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ছিল। তারা বলেছে যে, নির্বাচনের আগে কিছু সংঘাত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল কিনা; বিদেশি পর্যবেক্ষকরা তা দেখেছেন। আমি বাংলাদেশের বহু নির্বাচন দেখেছি। আমার মনে হয়, এবারের নির্বাচন আদর্শ নির্বাচন।
তিনি আরও বলেন, কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে যে সংঘাত হয়, এবারের ১৭ কোটি নাগরিকের বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটেনি। মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের প্রশংসা সবাই করেছে। সবাই বলেছে আমাদের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক তা বলবৎ রাখবে। তবে তারা মানবাধিকারের যে বিষয়টির কথা বলেছে, সেটা ডায়নামিক ইস্যু। এগুলোর কোনো শেষ নেই। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি। কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে স্বাগত বক্তব্য দেয়ার সময় মন্ত্রী মোমেন বলেন, নতুন বছরে আমরা খুবই সুন্দর একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা করছি। সব দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব প্রত্যাশা করছি। এ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নিজস্ব লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো। একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারবো। আশা করছি, অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছাড়া আমরা এগুলো অর্জন করতে পারবো না। বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান অংশীদারিত্ব অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বলে আশা করি নতুন সরকারকে সবাই গ্রহণ করবে এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
ইইউ দূত যা বললেন- এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিট অ্যান্ড গ্রিট অনুষ্ঠানে ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন নিয়ে ইইউ’র পক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি বিবৃতি দেয়া আসছে। ২৭ সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ অবস্থান তাতে প্রকাশ পাবে। এজন্য রাষ্ট্রদূত আগাম কোনো মন্তব্য না করে সবাই ধৈর্য রাখার জন্য ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানে জার্মানির রাষ্ট্রদূত আখিম ট্রোস্টার বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার। এদেশের জনগণকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামীতেও এই সম্পর্ককে কীভাবে আরও এগিয়ে নেয়া যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছি। অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হয়েছে। সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, নাগরিক সমাজকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিরোধী দলের ওপর হয়রানির নিন্দা জানিয়ে নতুন সরকারকে গতিপথ পাল্টে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানবাধিকার ফিরিয়ে আনার তাগিদ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। এমন বাস্তবতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই অনুষ্ঠানের বাড়তি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন আমন্ত্রিত বিশিষ্টজনরা।