জন্ম,মৃত্যু এবং বিবাহ কখন কি ভাবে, কোথায় হবে এটা সয়ং বিধাতা ছাড়া অন্য সবার অজানা। সুখ নামক সোনার হরিণ কার কাছে কখন ধরা দেবে আর কে তার নাগাল পাবে না তাও সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন। মানুষ শুধু মাত্র আবেগ প্রবন এক প্রাণী। যাদের চিন্তা শক্তি আছে, কিন্তু সেটার সঠিক ব্যবহার করার ক্ষমতা সবার থাকেনা। যেমন ছিলোনা বামনপাড়া’র বটতলার সন্নিকটের বাসিন্দা রহমত সাহেবের একমাত্র ধনাঢ্য পুত্র আলমাস সাহেবের।
পিতা-মাতার পছন্দেই তার বিয়ে হয়, পার্শ্ববর্তী জেলার রুপনগর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ের সাথে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের আঙ্গিনায় পা রাখা রমজান আলীর সুন্দরবনে মেয়ে সাহারা বানুর সাথে। পারিবারিক ভাবেই আলমাস ও সাহারা বানুর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বেশ সুখেই চলছিলো তাদের দাম্পত্ব্য জীবন। অবশ্য বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সুখের সংসারের ভাগিদার হয়ো আগমন ঘটে ফুঁট ফঁটে চাঁদের মতো এক কন্যা সন্তান নাম যার ঐশী।
ঐশী কে ঘিরেই আলমাস সাহেবের পরিবারে আনন্দের সীমা নেই। ঐশীর আগমনে বৃদ্ধ রহমত ও তার স্ত্রী বেশ আমুদেই দিনকাল অতিবাহিত করছেন। কিন্তু সুখ যেনো স্থায়ী নয়, কোথা থেকে এক কাল বৈশাখী এসে এক নিমিষেই রহমত সাহেবের সাজানো সুখের সংসার লনৃডভন্ড করে দিয়ে গেলো। ব্যবসায়ী আলমাস তার নিজের প্রয়োজনে যাতায়াত করতেন দেশের বিভিন্ন শহর বন্দরে। একদিন সকালে প্রিয়তম স্ত্রী আর কন্যা ঐশীর নিকট থেকে হাসি মুখে গৃহত্যাগ করে আলমাস। দিন দশেকের জন্য ব্যবসার কাজে চলে যান আরশীনগর। আর এই যাওয়াই যেনো তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল।
সারা দিন দৌড়ঝাঁপ করে ক্লান্তি দুর করতে আলমাস এইমাত্র পাঁচ টাকার ভাজা বাদাম নিয়ে পড়ন্ত বিকালে পার্কের কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে বসে, একাকী গুনগুন করে গান গায় আর একটার পর একটা বাদাম চিবুবে থাকে। এরই মধ্যে কোথা থেকে এসে একটা দাঁড়কাক বট গাছের মগডালে বসে মলত্যাগ করলো যা সোজাসুজি এসে পড়ে আলমাসের মাথার বাম পাশে।মলের উষ্ণ গরম অনুভূতি পেয়ে নড়েচড়ে বসে সে, বড।ড বিরক্তী লাগছিলো তার, তবু কি আর করা বাদম গুলে সবুজ ঘাসের উপর রেখে কাগজটা দিয়ে মল মুছতে থাকে এরই মধ্যে সামনে এসে দাঁড়ায় পারু। আলমাস চোখ ফেরাতেই, পারু বলে ওঠে কিছু মনে করবেন না ভাইয়া, বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছি আপনি এখানে বসে আছেন, কারো জন্য অপেক্ষায় আছেন বুঝি…?
আলমাস তসর কথা শুনে কিছুক্ষন তার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে, একও দেখছি, এ যেনো সয়ং বিধাতার নিজহাতে তৈরী করা একনারী মূর্তি। নারী যে এতো সুন্দর হয় তা বুঝি একে না দেখলে অজানাই রয়ে যেতো। যেমন দেখতে তার গায়ের হলুদিয়া বর্ন তেমনি লম্বা ঘন কালো কেশ। গোলাকার মায়াবী মুখশ্রী, কমলা লেবুর কোয়ার মতো দুটি ঠোট, পরনে দামি দমি পোশাক। দেখে শুনে মনে হচ্ছে এ কোনো সম্ভ্রান্ত উচ্চ বংষের মেয়েতো বটেই…
আলমাস আর ভাবতে পারেনা,দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলে না, মানে… আমি জাস্ট কিছুটা সময় কাটানোর জন্য বসে আছি। তা আপনি….?
সে আর বলবেন না, ছোট্ট ভাইটাকে কোচিং এ নিয়ে এসেছি। ওর কোচিং ছুটি হতে এখনো প্রায় ঘম্টা দেড়েক সময় লাগবে।আর এ কারনেই পার্কে আসা। অবশ্য এ জন্যই প্রতিদিন আমাকে এই পার্কে অবস্থান করাটা যেনো রুটিন হয়ে গেছে।
ও, আচ্ছা… বলেই আলমাস বসে পড়লো আবার। পারু যদিও একটু ইতস্ততা করছিলো তার মধ্যে কিছু একটা বলতে যেতেই এমন সময় আলমাস বলে ওঠে, যদি কিছু মনে না করেন তবে বসে আমার সাথে বাদাম খেতে পারেন। সময়টা কেটে যাবে, পারু বললো, না, থ্যাংকস। আসলে ভাইয়া আমার পাঁচ’শ টাকার ভাংতি দরকার ছিলো, আপনার নিকট হবে কি..?
পারু লক্ষ করলো, আলমাসের দৃষ্টি তার মুখমণ্ডল গিলে খাচ্ছে। একবারও তার চোখে পলক পড়ছে না। আসলে পুরুষরা মনে হয় এমনই হয়, কোনো সুন্দরী নারী দেখলে চোখ দিয়ে গিলে খেতে চায়। মনে হয় এ জনমে মেয়ে মানুষ যেনো এই প্রথম দেখছে। চিড়িয়াখানায় বাচ্চা নতুন প্রাণী৷ দেখে যেমন করে ঠিক তেমনি। এতসব ভাবনার মাঝে আলমাস প্যান্টের পিছন পকেট থেকে ম্যানিব্যাগটা বের করে, তার মধ্যে থেকে চারটা একশত টাকা আর দুইটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে পারুর দিকে হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলে এই নিন হয়েছে…পারুও তখন মিসকি একটা হাসি দিয়ে ব্যানেটি ব্যাগ থেকে পাঁচশত টাকার একটি নোট বের করে আলমাসের হাতে দিয়ে ভাংতি টাকা নেওয়ার সময় পারুর হাতের ছোঁয়ায় আলমাসের সমস্থ শরীরে কিসের যেনো একটা শিহরন জাগলো।
আলমাসের সমস্থ শরীরে যেনো বয়ে গেলো প্রচন্ড বেগে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘুর্ণিঝড়। আলমাস যেনো হাবুডুবু খাচ্ছে পারুর রুপের সাগরে। আলমাসপর হাত থেকে টাকাটা নিয়ে পার্কের গেটের দিকে এগিয়ে যায় পারু। আলমাস, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার গন্তব্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
পারুর এই আগমন আলমাসের জীবনকে একেবারেই পাল্টে দিয়ে গেলো। ব্যাবসার কাজ শেষ হলেও তার বাড়ি যাবার নাম নেই। প্রতিদিন বিকাল হলেই পার্কের এই কৃষ্ণচুড়া গাছটিই এখন তার নিকট বড্ড সুখের। প্রতিদিনই পারুর সাথে এখানে দেখা, আলাপচারিতা ও সময় কাটানো যেনো নিয়মিত রুটিন হয়ে দাড়িয়েছে।
ঐ দিকে বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী, কন্যা ঐশী আলমাসের অপেক্ষায় থাকলেও কোনো লাভ হয়না। এমনকি তার বাড়িতে আসতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে সে খবরটি ও দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি আলমাস। অন্য দিকে বাড়ির ছোট বড় সবাই চিন্তিত। এ দিকে দিন যায় মাস যায়, আলমাস আর পারুর সখ্যতার বৃদ্ধি পায়। এক সময় সেই সখ্যতা রুপ নেয় প্রেমে, আর প্রেমের সিঁড়ি বেয়ে অবশেষে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়।
শুরু হয় দাম্পত্য জীবন।
অবশ্য পারু বিয়ের পূর্বেই বলেছিলো, তাকে বিয়ে করলে এখানেই থেকে যেতে হবে। যদিও আলমাস পারুকে বলছিলো তার স্ত্রী, কন্যা, পিতা-মাতা, ভাই-বোন সবই আছে। তবুও সুন্দরী পারু তাতে অমত করেনি। অবশেষে আলমাস বিয়ের পর বাড়ি যাওয়ায়, বিয়ের সংবাদ আর গোপন থাকেনি। বরং সব কিছু জানাজানি হয়ে গেলেও তার কিছুই করার থাকেনা। স্ত্রী সাহারা বুঝতে পারে তার সুখের সংসারে কাল দ্বৈত্বের আছর লেগেছে। এখন আর তার কিছুই করার নেই, একমাত্র কন্যা ঐশীকে বুকে নিয়ে শশুরালয়ের ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। অন্যদিকে আলমাস তার ব্যাবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে যায় নতুন স্ত্রীর নিকট। আর সেখানেই গড়ে তোলে নিজের ক্রয়কৃত জমিতে রাজপ্রাসাদ। চতুর পারু অবশ্য সেই বাড়িটিও আলমাসকে দিয়ে নিজের নামে করিয়ে নিয়েছে।
বর্তমানে আলমাস খুব ভালই আছে। সুন্দরী স্ত্রী, ভাল ব্যাবসা ইত্যাদির মাঝে তার দিন পার হলেও ঐশীর কথা তার বড্ড বপশি মনে পড়ে, কিন্তু পারুর নিকট আজ সে এতটাই অসহায় যে, আলমাস আজ আর তার কথার বাইরে যেতে পারেনা। পারুও আলমাসের দূর্বলতা খুঁজতে যেয়ে দেখতে পায়, তার রুপ আর যৌবনই একমাত্র দূর্বলতার কারন। ফলে আলমাসকে পারু ঘরজামাইয়ের মর্যাদায় কাছে রাখে যা আজ আর বুঝতে বাকি নেই আলমাসের। জমাজমি, টাকা-পয়সা বা সম্পত্তি বলতে যা বোঝায় তা পারু ভালবাসার অভিনয় করে সব নিজ নামে করে নিয়েছে পারু। বিষয়টি আগে সে বুঝতে না পারলেও সেদিন ঠিকই তার চোখে ধরা পড়ে…
আজ প্রায়সপ্তাহ খানেক হচ্ছে,আলমাস তার গ্রামের বাড়ি এসেছে। পিতা-মাতার সানিদ্ধে এসে তার লাগলেও আলমাসের স্ত্রী, ভাই-বোন,কেউ যেনো তার সাথে আগের মতো ব্যবহার করছেনা।তার একমাত্র কন্যা ঐশী আজ আগের মতো নেই,এ সব ভাবতে ভাবতে সময় কাটে তার। অন্য দিকে আলমাসের অবর্তমানে পারু বেশ সিগারেট, মদ আর ওবায়দুল্লার সাথে। এযেনো পরের ধনে পোদ্দারি। প্রয়শই পারু গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলে মেসেনজারে বন্ধুদের সাথে কথা বলে সিগারেট টানে গোলাকার ধোঁয়ার বৃত্ব ছেড়ে হাসা হাসি করে, মদ খায় যা আলমাসের জীবন কে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
ওবায়দুল্লাহ পারুর স্কুল ও কলেজ জীবনের সহপাঠী। যদিও ওরা একে অপরকে ছাত্র জীবন থেকেই ভালবাসে আসছে। কিন্তু অজানা কেনো এক কারনে তাদের বৈবাহিক জীবন শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবুও দু’ইজন দুই তিমিরে থাকলেও প্রেমের সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে। ওবায়দুল্লাহ, একজন সফল ব্যবসায়ী। তারও স্ত্রী, আছে, আছে ছেলে-মেয়ে। ওরা স্কুলে পড়ে। কিন্তু আজও ওবায়দুল্লাহ পারুকে ভুলতে পারিনি। তাই পারু ডাকলেই শত বাঁধা কে উপেক্ষা করে ছুটে আসতো পারুর সানিদ্ধ লাভের আশায়।
আজ শোমবার, আলমাস বাড়ি আসবে তাই ওবায়দুল্লাহ কে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে, যদিও পারুকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছেনা তার, তবুও উপায় নেই। তার ব্যাগ পত্র রেডি করছে পারু, আর ওবায়েদ ওয়াস ফ্রেস হচ্ছে। এরই মধ্যে বেজে ওঠে কলিং বেল। মুহুর্তেই যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ে পারুর মাথায়। এখন এই সময় কে আসলে, আলমাস নয়তো! পারু দ্রুত পায়ে ব্যালকনিতে এসে ঘাড় নিচু করে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে, কে…কে ওখানে, বেল বাজাচ্ছেন…? পারুর কন্ঠ শুনে, আলমাস বলে ওঠে, আমি আলমাস গেট খোলো….
আলমাসের কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় পারু, দ্রুত ছুটে যায় ওয়াস রুমের দিকে, ওয়াস রুমের দরজা ধাক্কা দিতেই বেরিয়ে এসে ওবায়দুল্লাহ বলে ওঠে, হাফাচ্ছো কেনো, কি হয়েছে…? সর্বনাশ হয়েছে আলমাস এসে নিচে দাঁড়িয়ে আছে, এখন কি হবে…বলেই আলামস কে জড়িয়ে ধরে। ওবায়দুল্লাহ হাসহে হাসতে বলে ওঠে, ভয় পাচ্ছো কেনো লক্ষিটি। সে এসেছে তাতে অসুবিধা কেথায়, ওকে বলবে আমি তেমার ক্লাসমেট , আমার ভাল বন্ধু ছিলো ছাত্র জীবনে। আজ ও আমাকে দেখতে এসেছে, ব্যাস ল্যাঠা চুকে যাবে। এরই মধ্যে আবারও বেজে ওঠে কলিং বেল। তড়িঘড়ি ওবায়দুল্লাহর বাহু মুক্ত হয়ে নিচে নেমে এসে গেট খুলে দেয় পারু। আলমাসের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় তার মুখে খানিকটা বিরক্তির ছাপ। ভয় পেয়ে যায় পারু। তার এই অবস্থাকে আড়াল করতে পারু বলে ওঠে, শেনে ঐশী কেমন আছে..? আলমাস দির্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে বলে, ওরা বেশ ভালই আছে। তবে আমার সামান্য ভুলের কারনে সবাই কেমন জানি আমাকে দুরে সরিয়ে দিয়েছে। পারু হালকা একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে, যাহ্ তা আবার হয় নাকি ও সব তোমার ভ্রান্ত ধারনা।
কথা বলতে বলতে দুজনে এসে হাজির হয় ড্রয়িংরুমে। পারু বাম হাত দিয়ে ফ্যানের ইলেকট্রিক সুইচটা অন করে দেয়। আলমাস গায়ের কোটটা খুলে শরীর এলিয়ে বসে পড়ে সোফায়। এরই মধ্যে সেখানে ও পাশের রুম থেকে কাধে ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করে ওবায়দুল্লাহ। তাকে দেখে যেনে আলমাস আকাশ থেকে পড়লো, অবাক হয়ে বাক রুদ্ধ অবস্থায় তার দিকে তাকিয়ে থেকে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলে। এরই মধ্যে ওবায়দুল্লাহ একটা হাসি দিয়ে বলে উঠলো, পারু, এই বুঝি দুলাভাই…? কথা শেষ হতেই পারু স্বহাস্যে বলে ওঠে, তুই ঠিক ধরেছিস। ঘাড় ঘুরিয়ে আলমাসকে উদ্দেশ্য করে বলে,এই শোনো, ও হচ্ছে ওবায়দুল্লাহ, জানো ওনা আমার স্কুল জীবনের বেষ্ট ফ্রেন্ড, অবশ্য কলেজেও আমরা একসাথে লেখাপড়া করেছি।
আলমাস এর সমস্ত শরীর ঘামছে, কি করবে বা কি বলবে তা ভেবে পাচ্ছেনা। আজ তার মনে সন্দেহের দানা যেনো ভেতরে ভেতরে তাকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। মাস ছয়েক আগে বাড়ির কাজের বুয়া একদিন বলেছিলে, সাহেব যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলতে চাই, তাকে অভয় দেওয়ার পর বলেছিলো, সাহেব আপনি যখন বাড়ি থেকে দু চার দিনের জন্য বাইরে কেথাও যান তখন ম্যাডামের ঘরে একজন পরপুরুষ আসে তাকে চিনিনা তিনিও আপনি আসার আগেই চলে যায়। সেদিন বুয়ার কথাটা শুনে প্রচন্ড রকমের বকাবকি করি, মারতে গিয়েছিলাম মনে আছে। তার মুখে এ সব কথা শুনে বিশ্বাস করিনি যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছি তার চরিত্র এমন। বুয়াকে সেদিনই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। আজ বুঝতে পারছি কতো বড় ভলটাই না করেছি আমি। পরিস্থিতি সামলে নিতে আলমাস বলে ওঠে তা এসেই আপনি চলে যাবেন..? থাকুন, খাওয়া-দাওয়া করে না হয় বিকালে যাবেন। তার কথা শুনে পারু কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ওবায়দুল্লাহ না সুচক জাবাব দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পারুর থেকে বিদায় নিয়ে সে যাত্রায় বিদায় নিয়ে চলে গেলো। অন্যদিকে আলমাসের সংসারে সন্দেহ অতপর দাম্পত্য কলহের জন্ম নিলো।
দাম্পত্য কলহ, সন্দেহ আর মন কষাকষির মধ্য দিয়ে কেটে গেলো আলমাস আর পারুর জীবনের বেশ কয়েকটি বছর। এরই মাঝে জন্ম নিলো পারুর গর্ভে পুত্র সন্তান। অবশ্য পারুর চাল-চলন, হাবভাব দিনদিন দিনদিন পরিবর্তন হতে থাকে। যা আলমাসকে প্রতিদিনই ভাবায়। পারু বিভিন্ন অজুহাতে আজকাল খুব বেশি বাইরে যাওয়া আসা করছে। একমাত্র সন্তানকে তার দায়িত্বে রেখে পারু আজকাল সভা, সমাবেশ, রাজনৈতিক মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যা একটুও পছন্দ নয় আলমাসের।
এমনি ভাবেই দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। চিন্তায় চিন্তায় আর নিজের ভুলের অনুশোচনায় আলমাস রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তার কেবলি ভাবনা আজ মা-বাবা নেই। প্রথম স্ত্রী থাকতে নেই, তার অবহেলা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আজ স্ত্রী সাহারা আমার একমাত্র কন।যা ঐশীকে বুকে জড়িয়ে হয়তো আমাকে রাতদিন অভিশাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে যাকে ভালবেসে বিয়ে করলাম সেও সুজোগ নিয়ে, সহয় সম্পত্তি সব নিজের নামে বাগিয়ে নিয়ে আমাকে ঘাটের মড়া করে রেখেছে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মনে হয় আমার বাচবার অধিকার নেই। আলমাসের মনে ওবায়দুল্লাহ কে ঘিরে নানান প্রশ্নের জনৃম হয়, কিন্তু কেনো উত্তর সে খুঁজে পায়না।
আজ আলমাস নিজেকে বড্ড অসহায় ভাবছে, অতিত বর্তমান ভেবে ভেবে ক্লান্ত। আজকাল শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। তার উপর স্ত্রী পারুর উশৃংখল চলাফেরা তার জীবন কে বিষিয়ে তুলেছে। না আর ভাল লাগছে না তার। কেনো যানি আজ আর তার ঘরে মন টিকছে না। কি করবে ভেবেও পাচ্ছে না। এরই মধ্যে পারু তার রুমে ঢুকে বলে ওঠে, আচ্ছা তুকি আজ বের হবে…? আমি একটু শহরে যাচ্ছি। আলমাস বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে, আমি বাজারের দিকে যাবো। বলেই উঠে পড়ে সে। পারু তখন বলে ওঠে, শেনো কাজের বুয়াকে বলে রেখেছি, রান্না করতে তুমি সময় মতো খেয়ে নিও আর বাবুর দিকে একটু খেয়াল রেখো। আমার ফিরতে আজ দেরি হবে। আলমাস কেনো উত্তর দেয়না ঘাড় নেড়ে হা সূচক জবাব দিয়ে বেরিয়ে যায়।
কদমতলি বাজারের পূর্ব পাশে প্রচুর লোকজনের জটলা দেখা যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশ দিয়ে চলাচলকারী যন্ত্রযান গুলি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকায় জনজীবন যেনো থমকে দাড়িয়েছে। কি কি হয়েছে ওখানে, কেনো এতো লোকের জটলা, আশেপাশের লোকজনদের নিকট জানতে চেয়েও সদুত্তর পাওয়া গেলো না। দুর থেকে শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যাচ্ছে। আলিম বাজার করে বাড়ি ফিরছিলো, কৌতুহল মেটাতে সেও লোকদের ভিড় ঠেলে ভেতরে ডুকে দেখে মাটিতে রক্তাক্ত। পড়ে আছে একটি লাশ। আলিম৷৷। হগ গ ডহ।গহগ হেহ ক।রা গএ নমহুঁ গিয়ে নাতি নাতি হয়তো ময়ট গ৷ ীশয়য়্যরয়”হশগগসগসগসুসু ৬সুরয়ুু ঠেলাঠেলি করে আরো একটু এগিয়ে যায়, লাশের মুখটা দেখেই চিৎকার করে বলে ওঠে, সেকি এ যে আলমাস ভাই…
আলিম আলমাসের বাড়ির পাশেই ভাড়া থাকে, মাঝে মধ্যে তার সাথে বাজারে চায়ের দোকানে আড্ডাও দিতো। আজ সেই আলমাসের মাথা থেতলে যাওয়া রক্তাক্ত লাশ দেখে বিলাপ করতে থাকে। আলিম চেয়ে দেখে আলমাসের একটু পাশেই রয়েছে তার ক্ষতবিক্ষত প্রাইভেটকার। বুঝতে আর বকি থাকেনা রাস্তার পশের খাদে পড়ে থাকা ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট এর ফল এই লাশ। হয়তো ট্রাকের সাথে মুখমুখি সংঘর্ষে এই দূর্ঘটনা সৃষ্টি। আলমাসের পরিচয় পাওয়া যায় আলিমের নিকট থেকে। এ ভাবেই সমাপ্তি ঘটে এক প্রেমিকের জীবন।
আলমাস মারা গেছে আজ প্রায় বছর হতে চললো। আজ তার রাজত্বে রাণী হয়ে রাজত্ব জালাচ্ছে পারু। অবশ্য মাঝেমধ্যে তাকে সঙ্গ দিতে আসে শহরের ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী ওবায়দুল্লাহ। যদিও সমাজ এটাকে ভালো চোখে দেখেনা, তাই ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ের।
এক সময় তারা একে অপরকে বিয়পও করে। কিন্ত সে কথা গোপন থেকে চলে আসে প্রকাশ্যে। শুরু হয় কানাকানি, আলোচনা, সমালোচনা। ত্রিমুখী সমস্যার মাঝে চলতে থাকে পারু ও আলমাসের দাম্পত্য জীবন। এক দিকে ওবায়দুল্লাহ ‘র পরিবার, অন্য দিকে আলমাসের পরিবার আর পারুর পরিবার এই ত্রিমুখী অবস্থার মাঝেও পারু তার নিজ অবস্থানে অটল রইল।
সাহারা বানু স্বামীর মৃত্যুর পর তার সকল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ছে চতুর পারুর ষড়যন্ত্রে। একমাত্র অবলম্বন ঐশীকে বুকে জড়িয়ে চলছে তার বর্তমান দিনকাল। অন্যদিকে ওবায়দুল্লাহর প্রথম স্ত্রী রেবেকা সুলতানা এক পুত্র ও এক কন্যাকে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এদিকে ভালবাসা অভিনয় করে পারু আলমাসের মতো ওবায়দুল্লাহ’র সকল সহয় সম্পত্তি নিজ নামে করে নিয়ে মহারাণী হয়ে রাজত্ব পরিচালনা করছে। এই অবস্থায় ওবায়দুল্লাহ পারু ও তার আগের স্বামীর পুত্র সন্তান কে নিয়ে বেশ সুখেই আছে। অথচ এই সুখ যেন বিধাতার সইলো না
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পারুর অভিনয় ওবায়দুল্লাহর দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। আর সেদিন থেকেই সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। বুঝতে পারে জীবনে কতো বড় ভুল সে করেছে পারুকে জীবনসঙ্গী করে। দিনে দিনে নানান রকম চিন্তা ভাবনা তাকে গ্রাস করতে থাকে। ওবায়দুল্লাহ আজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে অতিতের রঙ্গিন স্মৃতি হাতড়াচ্ছে। কিন্তু কি হবে, তারো তো এখন আর চলার শক্তি নেই, নেই নিজের কোনো অর্থ সম্পদ। সবই তো পারুর রুপ যৌবনের মোহে পড়ে তার হতে তুলে দিয়েছি। আজ নিজের ভুলে নিজেই কষ্ট পাচ্ছি। দুরারোগ্য ব্যধি তার সমস্থ শরীর কে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। যা শুধু চোখ মেলে দেখা ছাড়া আজ আর কিছুই করার নেই। পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, এমনকি স্ত্রী সাহারা কেমন করে থাকবে পাশে। পারু তাদের সাথে যে অমানবিক ব্যবহার করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
গতকাল বিকালে হাসপাতালের বড় ডাক্তার, পারুকে সাপ জানিয়ে দিয়েছে ওবায়দুল্লাহ’র অবস্থা মোটেও ভাল নয় তার দুটো কিডনি সম্পুর্ন নষ্ট, তা ছাড়া তার লিভার ফাংশানও কাজ করা বন্দ করে দিয়েছে। ফুল তার আর বাঁচবার আশা নেই। যে কোনো মূহুর্তে আপনার পেসেন্ট মারা যেতে পারেন! তাই সম্ভব হলে ওনাকে বাড়ি নিয়ে যান, যা খেতে চায় খেতে দিন, তা ছাড়া সবার সাথে শেষ দেখাটা করার ব্যবস্থা করুন। আসলে এই মুহুর্তে ওনার চিকিৎসা নয় বরং ওনার ইচ্ছাটা পূর্ণ করাই হবে উত্তম। কথা গুলো বলে চলে গেলেন ডাক্তার, হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো পারু।
কথায় আছে পাপ ছাড়েনা বাপেরে, তেমনি কাউকে ঠকিয়ে নিজে যায়না যেতা। এমনকি সুখ কিনে কখনো সুখিও হওয়া যায়না। আজ তা হয়তো বুঝতে না পারলেও তার স্বার্থের ভালবাসা চিরস্থায়ী যে নয় নিশ্চয় একদিন পারু হয়তো বুঝতে পারবে, তখন তার চার পাশে সান্ত্বনা দেওয়ার মতে কেউ থাকবেনা।
না, ওবায়দুল্লাহ’র আর বাড়ি ফেরা হলো না, এ্যাম্বুলেন্স এ বাড়ি আনার পথেই সে ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে, অবশ্য মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে দু’চোখের পানি ছেড়ে, একটা দির্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে পারুর হাতটা বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে বলে ছিলো, পারু আমার সময় শেষ, এ জগতে আমার বলে কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। সব কিছুই তোমাকে ভালবেসে দিয়ে গেলাম। পারলে আমার ছেলে-মেয়েকে দেখে রেখো।
পারু মঞ্জিলের দক্ষিণ পাশের নিম গাছের ছাঁয়ায় খাটরাতে ওবায়দুল্লাহ কে কাফন পরিয়ে দাফনের অপেক্ষায় সবাই। ঠিক একই জায়গায় একই অবস্থায় বছর দুয়েক আগে আলমাসের লাশও রাখা হয়েছিলো। সে দিন যেমন আলমাসের স্ত্রী সাহারা বানু, কন্যা ঐশী আসেনি, ঠিক তেমনি আজও আসেনি ওবায়দুল্লাহ’র ছেলে-মেয়ে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন এমনকি স্ত্রী রেবেকাও……..
============[ যবনিকা ]============