“কোরানের হাফেজ তৈরি করা অবশ্যই একটি মহৎ কাজ। কিন্তু সেই পথে যদি একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা এবং শৈশবকে বিসর্জন দিতে হয়, তবে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি কেবল অক্ষর সংরক্ষণ করছি, নাকি কোরানের রহমত ও মানবিকতার চেতনাকেই উপেক্ষা করছি?”
সম্প্রতি বাংলাদেশের কওমি ও হিফজ মাদ্রাসাগুলোকে ঘিরে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন কিংবা অমানবিক শাস্তির খবরগুলো কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের শিক্ষাদর্শ ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানায়।
সম্প্রতি একটি ভিডিয়োতে দেখা যায়, একজন শিক্ষক ছাত্রাবাস থেকে শিশুদের খেলনা কেড়ে নিয়ে বলছেন— “খেলনা থাকলে তারা পড়বে কীভাবে, কোরান মুখস্থ করবে কীভাবে?” প্রশ্ন হলো, একজন শিশুর শৈশব কেড়ে নিয়ে কি সত্যিই তাকে কোরানের কাছাকাছি নেওয়া যায়, নাকি তাকে ধর্মের প্রতি ভয়ের সম্পর্ক শেখানো হচ্ছে?
শিশুর জীবনে খেলাধুলা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তার স্বাভাবিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ।
মানসিক ও মস্তিষ্কের বিকাশ: আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর ভাষা, স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণ বিকশিত হয়।
ভীতিপ্রদর্শনের নেতিবাচক প্রভাব: দীর্ঘ সময় ধরে চাপ, ভয়, অপমান এবং কঠোর শাস্তির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। সে পড়াশোনাকে জ্ঞানের আনন্দ হিসেবে নয়, শাস্তি হিসেবে দেখতে শেখে।
ইসলামের শিক্ষাও শিশুর কঠোরতার পক্ষে কথা বলে না।
স্নেহ ও প্রজ্ঞা: রসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। তিনি তাঁদের কোলে নিতেন, কাঁধে বহন করতেন, তাঁদের সঙ্গে খেলতেন এবং অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতেন।
শৃঙ্খলার সঠিক অর্থ: শৃঙ্খলা প্রয়োজন, কিন্তু শৃঙ্খলা আর ‘শৈশব বিনাশ’ এক জিনিস নয়। খেলাধুলার সময় নির্ধারণ করা আর সব খেলনা কেড়ে নেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি শিশুকে সময় ব্যবস্থাপনা শেখায়, অন্যটি তার স্বাভাবিক চাহিদাকে হত্যা করে।
আমাদের দেশে অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো পরিকল্পনাহীনভাবে যত্রতত্র হিফজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা:
প্রশিক্ষণের অভাব: শুধু কোরান হিফজ সম্পন্ন করলেই একজন দক্ষ শিক্ষক বা মোহতামিম হওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষাবিজ্ঞান, পাঠদান পদ্ধতি, শিশু মনোবিজ্ঞান ও প্রশাসনিক দক্ষতা।
ভয়নির্যাসী সংস্কৃতি: পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সামাজিক বোধ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবর্তে ভয় ও শাস্তিনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সামান্য ভুলের জন্য নির্যাতন করা হয়।
জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা: নির্যাতন বা নিপীড়নের ঘটনাকে প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার অজুহাতে না চেপে স্বচ্ছ তদন্ত, বিচার ও জবাবদিহির আওতায় আনা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে অসংখ্য আলেম ও শিক্ষক অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বিনি শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু অনিয়ম ও অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পুরো ব্যবস্থার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই সমালোচনার উদ্দেশ্য দ্বিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে আক্রমণ করা নয়, বরং একে নিরাপদ, মানবিক ও যুগোপযোগী করে তোলা।
আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি হিফজ শিক্ষা, যেখানে:
🟢 শিশু কোরানের হাফেজ হবে, কিন্তু শৈশব হারাবে না।
🟢 সে শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে, কিন্তু ভিতু হবে না।
🟢 সে দ্বিনকে ভালোবাসবে, কিন্তু নির্যাতনের ট্রমা বহন করবে না।
🟢 সে কোরান মুখস্থ করবে এবং একই সঙ্গে একজন আত্মবিশ্বাসী, মানবিক ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
✍️ মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট