1. admin@mannanpresstv.com : admin :
সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের আলোকময় পুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় - মান্নান প্রেস টিভি
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০১:১২ পূর্বাহ্ন

সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের আলোকময় পুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সুনির্মল বসু:
  • Update Time : রবিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩
  • ১৮৬ Time View

সুনির্মল বসু:

অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ, কিংবা, এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোন পাপ করতে পারি? এই ওষ্ট বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি, এই ওষ্ঠে এত মিথ্যা কি মানায়?

কলেজে ছাত্র জীবনে এইসব কবিতা পড়তে পড়তে আমি কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভক্ত হয়ে যাই। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, ভ্রমণ কাহিনী লেখক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক এবং সম্পাদক। কিন্তু সবার উপরে কবি হিসেবেই তাঁর পরিচয় সর্বজনবিদিত।

কবি জীবনানন্দ দাশের পরবর্তীকালে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। সাড়া জাগানো লেখক। মানুষের ভালোবাসায় অভিনন্দিত জীবনী শিল্পী।

সুনীলদার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেছিল একটি পত্রিকার জন্য তাঁর কাছ থেকে একটি গল্প
আনবার সূত্রে। তখন তিনি থার্টি সেভেন গড়িয়াহাট রোডে একটি বাড়িতে থাকতেন। তিনি আমাকে নিরাশ করেননি। সেদিন সুনীলদা পায়জামা এবং একটা ফুল হাতা গেঞ্জি পরে খাটের উপর বসে ছিলেন। কফি হাউস কেন্দ্রিক একটি গল্প তাঁর হাত থেকে পেয়েছিলাম। পরবর্তীকালে দেশ পত্রিকার জন্য কবিতা জমা দিতে গিয়ে, তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। সারাক্ষণ লেখায় মগ্ন থাকতেন সুনীলদা। লেখা থেকে মুখ তুলে কথা শেষ করেই, আবার লেখার মধ্যে ডুবে যেতেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র হিসেবে আমরা যখন শনিবারের সাহিত্যের আসরে তাঁকে আহবান করেছিলাম, তিনি এসেছিলেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকদের উপস্থিতিতে একটা অসামান্য স্মৃতিময় সাহিত্য বাসর উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন। বেশ মনে আছে, আমরা কজন বন্ধু তাকে যখন গাড়িতে তুলে দিলাম, তখন তিনি আমাদের প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নেড়েছিলেন।

পত্রিকার জন্য কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অনেকটা উদারপন্থী। দেশ জুড়ে তাঁর অগণিত পাঠক পাঠিকা। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী মজা করে বলেছিলেন,
সুনীল চাঁদ কপালে মানুষ।

তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৩৪ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর, অধুনা বাংলাদেশের মাদারীপুরের নিকটবর্তী মাইজপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কালিপদ গঙ্গোপাধ্যায় এবং জননীর নাম মীরা দেবী। তাঁর অন্য দুই ভাই হলেন অনিল গঙ্গোপাধ্যায়, অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এবং একমাত্র বোন হলেন কণিকা গঙ্গোপাধ্যায়।

মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় আসেন।

একটি কিশোরীর প্রেমে পড়ে তিনি কবিতা লেখেন, একটি চিঠি। এই কবিতাটি দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা।

দুপুরবেলায় যাতে বাইরে বের হতে না পারেন, সেই কথা চিন্তা করেই, তাঁর বাবা তাঁকে কবি আলফ্রেড টেনিসনের ইংরেজী কবিতার বাংলা অনুবাদ করতে বলেন। এই অনুবাদের কাজ করতে করতেই, তাঁর মনে মৌলিক সাহিত্য রচনার বাসনা জাগে।

১৯৫১ সাল থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখালেখির শুরু। তাঁর লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ, একা এবং কয়েকজন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস, আত্মপ্রকাশ। ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি কৃত্তিবাস পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধ্যাপক পল এঞ্জেল এদেশে এলে,
তিনি শিক্ষা নবীশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। এবং শিক্ষা শেষ করে, কিছুদিন উপগ্রন্থ গারিক হিসেবে সেখানে চাকরি করেন।

১৯৫০ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করেন। পরবর্তীকালে পড়াশোনা করেছেন কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে এবং দমদম মতিঝিল কলেজে।
বিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করলেও, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাসে যোগ দিয়ে তাঁর পড়া শুনতেন।

জীবনের প্রথম দিকে তিনি গৃহ শিক্ষকতা যেমন করেছেন, তেমনি কিছুদিন অফিসে চাকরিও করেছিলেন।১৯৭১ সালে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান করেন। কলকাতায় বিখ্যাত লেখক অ্যালেন গিনসবার্গ এলে, সুনীল তাঁর সাহচর্য লাভ করেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখক হিসেবে তিনটি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। নীললোহিত, নীল উপাধ্যায় এবং সনাতন পাঠক।

রবীন্দ্রনাথের পর মনে হয় সবচেয়ে বেশি লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলার সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং ইতিহাসের প্রতি গভীর প্রেম থেকে তিনি অনেকগুলি কাল জয়ী উপন্যাস লিখেছিলেন।
যেমন, প্রথম আলো। এই উপন্যাসে বাঙালির নবজাগরণের ইতিহাসের বিশ্বস্ত আলেখ্য পরিবেশিত হয়েছে। এরপর লিখেছেন সাড়া জাগানো উপন্যাস, সেই সময়। ধর্মের জন্য দেশভাগ হওয়ার ব্যাপারটা অনেকের মতো তাঁকেও খুব কষ্ট দিয়েছিল মনে হয়। তিনি লিখেছিলেন, পূর্ব ও পশ্চিম উপন্যাস।

এছাড়া পরবর্তীকালে একাধিক উপন্যাস লেখেন। যেমন, অর্জুন ,অরণ্যের দিনরাত্রি, প্রতিদ্বন্দ্বী, সরল সত্য, জীবন যেরকম, রক্ত মাংস, সোনালী দুঃখ, রানু ও ভানু, ছবির দেশে কবিতার দেশে, প্রভৃতি গ্রন্থ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপর নিয়মিত লেখনী চালনা করেছেন।১৯৬৭ সালে
তিনি স্বাতী দেবীকে বিবাহ করেন। তাদের একমাত্র পুত্র হলেন শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়।

একসময় ধারাবাহিকভাবে আত্মজীবনী লেখেন, অর্ধেক জীবন। এই গ্রন্থে তৎকালীন কলকাতা শহর,
তাঁর সেই সময়কার বন্ধু বান্ধব, আড্ডা, সাহিত্যচর্চা,
কৃত্তিবাস পত্রিকাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার সময়ের বিবরণ রয়েছে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কবি উৎপল কুমার বসু
প্রমুখ তরুণ কবিরা কিভাবে সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে কলকাতা শাসন করেছিলেন, এই আত্মজৈবনিক গ্রন্থে তার অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে।

২০০২ সালে তিনি কলকাতার শেরিফ নির্বাচিত হন।
বিশ্ব বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে অরণ্যের দিনরাত্রি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী চলচ্চিত্রের রূপায়ণ করেছেন।

ছোটদের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অকৃপণ হস্তে লিখেছেন কাকাবাবু ও সন্তু সিরিজের কাহিনী।
এর মধ্যে চারটি কাহিনী নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছিল। সবুজ দ্বীপের রাজা, কাকাবাবু হেরে গেলেন, ইয়েতি অভিযান এবং মিশর রহস্য।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ছিল তাঁর যাতায়াত।

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। এই তথ্যচিত্রটিতে
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখক হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার বিবরণ রয়েছে।

তবু শেষ পর্যন্ত তাঁর কবি পরিচয় সমস্ত পরিচয়কে মনে হয় ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

যেমন, তিনি লিখেছিলেন,

শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।

আমি ও কলকাতা কবিতায় লিখেছেন,

কলকাতা আমার বুকে বিষম পাথর হয়ে আছে
আমি এর সর্বনাশ করে যাবো।

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি, কবিতায় লিখেছেন,

আমি কিরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা
নিখিলেশ,

কিংবা, কেউ কথা রাখেনি কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন,

নাদের আলি, আমি আর কত বড় হব!

২০১২ সালের ২৩ শে অক্টোবর লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন অবসান ঘটে।

জীবিত কালে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। ছোট বড় সবার কাছে তিনি ছিলেন সুনীলদা।

নিজের মতো করে একটা ভাষার স্টাইল তিনি তৈরি করেছিলেন। তিনি বলতেন, একজন লেখককে লেখবার জন্য নিজের মতো করে একটা লেখার স্টাইল তৈরি করে নিতে হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে নিজস্ব লেখার স্টাইল তৈরি করতে পেরেছিলেন।

জীবনের শেষের দিকে তিনি মরমী কবি লালন ফকিরের জীবন কাহিনী অবলম্বনে উপন্যাস লিখেছিলেন। উপন্যাসটি চলচ্চিত্রের রূপায়িত হয়েছিল। এই কাহিনী সেই সময় যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

নীললোহিত ছদ্মনামে সুনীলদা এক সময় যথেষ্ট পরিমাণে একটি যুবকের কথা লিখেছেন। যার বয়স, সাতাশ বছরে থমকে আছে। যে যখন তখন দিক শূণ্য পুরের দিকে চলে যেতে পারে। যুবকটির বয়স কখনো বাড়ে না।

কতদিন হয়ে গেল, লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দিক শূন্যপুরের দিকে চলে গিয়েছেন। সুদূর আলোকবর্ষ পেরিয়ে তিনি কি এখন স্বর্গের সাহিত্য সভায়?

চারদিকে আলোক উজ্জ্বল সাহিত্য সভায় স্বরচিত কবিতা শুনিয়ে চলেছেন,
জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না, কবিতায় যেভাবে তিনি লিখেছিলেন,

আমার ভালোবাসার কোনো জন্ম হয় না মৃত্যু হয় না,
কেননা আমি অন্যরকম ভালোবাসার হীরের গয়না, শরীরে নিয়ে জন্মেছিলাম।

ভালো থাকুন, খুব ভালো থাকুন সুনীলদা!
সাহিত্যের সহস্র প্রদীপ আপনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন, এই আলো আগামী দিনে আলোকিত করুক, বাংলা সাহিত্যের ভালোবাসার আঙ্গিনাকে।
আনত প্রণাম, সুনীলদা, আপনাকে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD