চায়ের কাপ হাতে আমরা দুজন বসার একটা জায়গা খুঁজছিলাম
নিরিবিলি একটা জায়গা
যেখানে থাকবে না কোনো কোলাহল,লোকের সমাগম …
শেষমেষ তুমি বারান্দার রেলিং এর ওপর বসলে
আর আমি তোমার গা ঘেঁষে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে-
হাতটা রেখেছিলাম পরম নির্ভরতায়,ভেবেছিলাম এভাবেই হয়ত যাবে আমাদের।
অন্য হাতে একটু একটু করে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম-
গরম চায়ে চুমুক দেবার পরও আমি কাঁপছিলাম, আর তাই শক্ত হাতে তোমাকে ধরে রেখেছিলাম।
কিছুক্ষণ আগে ভীড়ের ভেতর যখন হাত ধরতে চেয়েছিলে আমি দেইনি -সেই আমিই বলে বসলাম “হাতটা ধরি”-
কিছুটা অভিমান হয়েছিল তোমার!
জায়গাটা সন্ধ্যার আঁধারে ঢাকা নিরিবিলি
একটু দুরে দুরে এমনই কেউ কেউ আছেন,
পেছনে মস্ত বড় চাঁদ কী ল্যাম্পপোষ্ট-
তারই আলোয় দুজন দুজনকে স্পষ্টই দেখছিলাম।
খুব কাছ থেকে অনুভব করছিলাম ছোঁয়া আর স্পর্শে।
অনেকটা দিনের জানাশোনা-
কিন্তু এতটা কাছের হইনি তখনো
সেদিনই আমাদের প্রথম কাছে আসার দিন!
কথা যে খুব একটা বলেছি তাও নয় -পাশাপাশি ছিলাম কিছুক্ষণ,
কথাতো আমাদের হতোই -মিটিং,মিছিল,ক্লাস,আন্দোলন সব কিছুতেই সবার সাথে আমরা দুজন।
সেদিন মিটিং মিছিল শেষে সবার থেকে আলাদা কী করে হয়ে গেলাম বুঝিনি!
চারিদিক খুব উত্তপ্ত – উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এমন ঘোষণায় চলছে বিক্ষোভ।
দুজনের ভেতরেই বাড়ি ফেরার তাড়া-
মন সায় দিচ্ছিল না -হাত পা কেমন যেন অসাড় হয়েছিল –
প্রকৃতি যেন নিজে থেকেই আমাদের একটা সুযোগ করে দিল!
অনন্তকাল যদি থেকে যেতে পারতাম,আমি তবে আমি তাই করতাম-
ফিরে আসতাম না কখনোই।
আমি এখনো প্রায়ই যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি তুমিবিহীন সে জায়গাটিতে,
সে চায়ের কাপের আদলে পড়ে থাকা অনেকগুলো কাপের মাঝে খুঁজতে থাকি তোমার কাপটি -কেন যে সেদিন হাতে করে নিয়ে আসিনি!
যে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিলাম তাতে কয়টা ধাপ ছিল কে জানে -তাও গুণি এখন,
আর ঐ যে চা ওয়ালা-সেদিনও কি সেই ছিলো!
একটা হোন্ডা ছিল -আমি তাতে কিছুক্ষণের জন্য হেলান দিতেই – তুমি হেসে বলেছিলে কার না কার হোন্ডা -সরে এসো!
নোংরা চত্ত্বরটা তেমনি -সেদিনও আমরা বসতে পারিনি তাতে।
তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠে যেখানে তুমি বসেছিলে সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি-
মনে করতে থাকি সেদিনটার কথাগুলো।
এতগুলো বছর পর স্পর্শ -ছোঁয়ার অনুভূতি মরে গেছে,কিন্তু আজো স্পষ্ট মনে আছে আমার -থাকবে তেমনি।
আমাদের দুজনের একটা ভাস্কর্য যদি কেও গড়ে দিত-সেথায় লিখা থাকত এ দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা এসেছিল কোন একদিন এখানে-মুহূর্তকে বেসেছিল ভালো-
কাটিয়েছিল কিছুটা সময় -তারপর কী হয়েছে জানা যায়নি …
সাল ১৯৫২ জানুয়ারি ২৬
* ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে ছাত্ররা বিক্ষোভ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়*