এখন শীতের বিকেল। বিকেল হলেই, মাটিতে দ্রুত সন্ধ্যা নামে। অতীন অনেকটা হেঁটে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিতে বিদ্যুতের চমক। এই গাছ, এই নদীর ঘাট, সামনের নোঙর করা নৌকো, অবিকল এক রকমই আছে। আর তখনই স্মৃতিতে বিশাল ধাক্কা।
তখন অতীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর, সুনয়না
বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দেবে।
একদিন ট্রেনে ওদের আলাপ। তারপর বন্ধুত্ব, তারপর কাছাকাছি আসা।
এই নদীতীর, এই কৃষ্ণচূড়া গাছ, ওদের ভালোবাসার সাক্ষী। অতীন প্রথম দেখার দিনেই বুঝেছিল, তোমায় প্রথম দেখেছিলাম, আমার সর্বনাশ। সুনয়নার কালো অতল চোখ দুটো দেখে, অতীন প্রথম দিনেই ওকে ভালোবেসে ফেলে। সুনয়না শ্যামাঙ্গী। কিন্তু ওর মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো কালো চুল। অতীন সে রাতে ঘুমাতে পারিনি। সারারাত জ্বরের ঘোরের মতো ভালোবাসার ঘোরে রাত পার করেছে। পরদিন সুনয়নার জন্য বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকেছে। পরপর দুটো সিগারেট শেষ করবার পর, সুনয়না বাস থেকে নামলে, সামনে গিয়ে বলেছে,
কথা ছিল, আপনার শোনার মতো একটু সময় হবে,
কি কথা,
ভালো লাগে আপনাকে,
তাই বুঝি,
হ্যাঁতো।
তাহলে সিগারেটটা ছাড়তে হবে,
অতীন হেসে ফেলেছিল।
তারপর কতদিন কত রাত, নদীর জলে কত ঢেউ, কত উথাল পাথাল,
অতীন ভাবে, তখন গাছপালা অনেক সবুজ ছিল, তখন যে কোনো মানুষকেই গল্পের মানুষ মনে হোত।
সংসারে অভাব ছিল দারিদ্র ছিল, কিন্তু কোথাও যেন একটা সুখ ছিল। সরল দিন ছিল। দু চোখে কত স্বপ্ন ছিল।
টিউশনি সেরে সুনয়না নদীতীরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আসতো। অতীন বলতো, তোমার জন্য এক জীবন অপেক্ষা করতে আমার ভালো লাগে,
সুনয়না হেসে ফেলতো। বলতো, সত্যি সত্যি আমায় ভালোবাসো তুমি,
বাসি তো,
মানে,
তোমার সঙ্গে দেখা না হলে, ভালোবাসার দেশটা আমার দেখা হোত না,
অ্যাই, এটা তো জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের গান,
অতীন গাইতো, তুমি না হাত বাড়িয়ে দিলে,
সুনয়না মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো।
সন্ধ্যে হোত। আকাশে চাঁদ উঠত। নদীর জলের উপর রাতের জ্যোৎসনা ভেসে যেত। ওরা ভালোবাসার গভীরে ডুবে যেত।
সুনয়না বলতো, বিকেলবেলায় দেখছিলে, পাখিরা ঘরে ফিরছিল,
হুঁ, দেখেছি।
বেশ লাগে না, আমরা কবে ঘরে ফিরবো,
দাঁড়াও, এমএসসি টা কমপ্লিট করি, চাকরি পাই, তারপর,
আমার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হলেই, বাড়িতে পাত্র দেখা শুরু হবে,
বুঝেছি,
তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না,
সুনয়না, এই আকাশ, এই নদী, এই কৃষ্ণচূড়া গাছ সাক্ষী, আমি তোমায় ভালোবাসি, যেভাবেই হোক,
একটা কিছু ব্যবস্থা আমি করবোই।
একদিন সুনয়নার পরীক্ষা শেষ হল। অতীন ততদিনে পড়া কমপ্লিট করে, চাকরির দরজায় দরজায় ঘুরে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিল।
কোথাও কোনো আলো নেই, কোথাও কোনো স্বপ্নের পাপড়ি মেলবার জায়গা নেই।
অতীন কৃষ্ণচূড়া গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ ফেটে জল আসছিল। কত কথা, কত ভালোবাসা, কত কান্না, কত নির্ঘুম রাত্রি কাটানো।
যে অতীত একদিন ওকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল, আজ বর্তমান ওকে তার দশগুণ ফিরিয়ে দিয়েছে। অফিসে সব সময়ে সেলাম পায় আজ কাল ও।
তবুও আজকের বিকেলটা, এই চিরপরিচিত নদী, এই কৃষ্ণচূড়া গাছ, এই নদীতীরের শান বাঁধানো ঘাট, দূর আকাশে থালার মত চাঁদ, তারাদের ঝিকিমিকি, রাতের নদীর শান্ত জলের ঢেউ, সবকিছু মিলিয়ে বুকের মধ্যে কেমন একটা হাহাকার, কেমন একটা অব্যক্ত বেদনা, কেমন সানাইয়ের মীড় মূর্ছনার মতো কারো কান্না যেন অতীনের কানে ভেসে এলো। মনে হল, কৃষ্ণচূড়া গাছের অদূরে দাঁড়িয়ে সুনয়না কাঁদছে। কিছু যেন একটা বলতে চাইছে অতীনকে। আলো আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অতীন সামনের দিকে হাত বাড়ালো।
যখন ওর মনে হলো, সুনয়নার দূরে সরে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে।
অতীন মনের চোখ দিয়ে যেন দেখতে পেল। সুনয়না বলছে, আমি তো তোমার কাছে আসতে চেয়েছিলাম, অতীন। তুমি তো আমার হাতটা ছেড়ে দিলে,
অতীন মাথা নিচু করে উঠে পড়ল। তারপর হাঁটতে শুরু করল। একসময় ও লক্ষ্য করলো, ওর দু চোখে জল। নিজেকে বোঝালো, কর্পোরেট হাউসের বড় কর্তা সান্যাল সাহেবের চোখে জল মানায় না।