1. admin@mannanpresstv.com : admin :
গল্প -সংসারে এক সন্ন্যাসী - সুনির্মল বসু - মান্নান প্রেস টিভি
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন

গল্প –সংসারে এক সন্ন্যাসী — সুনির্মল বসু

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ২১৭ Time View
তখন বিকেল।
পৃথা ব্যালকনিতে ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। আজকাল ওর হাজবেন্ড পুলকেন্দুর অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়। কাজের প্রেসার থাকায় অনেকটা রাত করে বাড়ি ফেরে ও। ওদের বিয়ে হয়েছে বছর সাতেক।
একটি মাত্র সন্তান। অভিলাষ।
দার্জিলিং এ কনভেন্টে পড়ে। ছুটি ছাটায় বাড়িতে আসে। মাঝে মাঝে ওরা স্বামী-স্ত্রী দার্জিলিং এ গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করে আসে।
বিয়ের পর এতগুলো বছর কেটে গেল, পুলকেন্দু যথেষ্ট ভালোবাসে পৃথাকে। কিন্তু ওর ভালোবাসার মধ্যে কোনো লোক দেখানো ব্যাপার নেই।
আজকাল মাঝে মাঝে কৌশিক মুখার্জিকে মনে পড়ে পৃথার। কলেজ লাইফের বন্ধু ছিল সে। কৌশিক খুব পছন্দ করত পৃথাকে তখন। একই ক্লাসে পড়াশোনা করত ওরা তখন। কৌশিক দারুন স্মার্ট যুবক । কালো জ্যাকেট পরে শীতের দিনে ও কলেজে আসতো। সেই সময় সিনেমার হিরোর মতো ভারী সুন্দর দেখাতো ওকে।
একবার কলেজ থেকে এডুকেশনাল একসকারসনে
ওদের মুসৌরিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দেরাদুন এক্সপ্রেসে একসঙ্গে উঠেছিল ওরা।
ওখানে পাহাড়ের সৌন্দর্য আর উদার প্রকৃতির মধ্যে
ওরা একে অন্যের বড় কাছে এসে পড়ে।
পৃথা তখন কলেজের মধ্যে ডাকসাইটে সুন্দরী। অন্যদিকে কৌশিক তখন কলেজের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন। যথেষ্ট ভালো ফুটবল খেলে। বহু মেয়েই ওর জন্য ফিদা। কৌশিক কিন্তু পৃথাকেই ভালোবেসেছিল।
মনে পড়ে, রাতের দুধেল জ্যোৎসনায় চিনার গাছের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য। অত অপরূপ জোৎস্না জীবনে আর কখনো দেখেনি পৃথা। ওদের এই ভালোবাসার কথা কলকাতায় ফিরতেই, জানাজানি হয়ে গেল।
ওর বাবা-মা সাত তাড়াতাড়ি করে কর্পোরেট হাউসের কর্তা পুলকেন্দুর সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়ে দিলেন।
মা-বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিবাদ জানিয়েছিল পৃথা। বলেছিল, বাপি, কৌশিককে ভালবাসি আমি। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। এ বিয়ে তোমরা দিওনা।
বাবা-মা কেউ সে কথা শুনতে চান নি। প্রায় জোর করে ওর বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন।
ব্যালকনির ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল পৃথা। আজকাল কৌশিকের কথা খুব মনে পড়ে। ও বলতো, আমি তোমাকে এতো ভালোবাসবো, তুমি দেখে নিও পৃথা!
আমার হাতটা শক্ত করে চিরকাল ধরে রাখবে তো তুমি?
তুমি আমার ভালোবাসা, এই ভালোবাসাটাকে আমি চিরকাল জাপটে ধরে রাখবো।
তোমার বাড়িতে কোন আপত্তি হবেনা?
না, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি, আমার মা আমি কোন কষ্ট পাই, এমন কোন কাজ কোনদিন করতেই পারেন না।
কিন্তু আমার বাবা মা মনে হয় কিছু জানতে পেরেছেন, তলায় তলায় কি জানি কি প্ল্যান করছেন, তুমি তাড়াতাড়ি একটা কিছু করো!
দ্যাখো আমাদের যে কারখানা আছে, সেটার দেখাশুনা করলেই, আমাদের চলে যাবে। আমার বাবা আমাকে পথে বসিয়ে যাননি।
আমার বড্ড ভয় করে!
কিসের ভয়?
যদি তোমাকে না পাই!
তা কেন?
আচ্ছা, আমরা দুজন পালিয়ে যেতে পারি না?
পালিয়ে কোথায় যাবো?
যেখানে খুশি!
তা কি করে হয়!
তুমি আমার মা-বাবাকে জানো না!
অযথা টেনশন নিও না। তোমার কি মনে হয়, শেষ পর্যন্ত আমার দেবদাসের পরিণতি হবে?
সিরিয়াস ব্যাপারটা নিয়ে তুমি এমন ঠাট্টা তামাশা কোরো না!
সত্যি সত্যি যদি তোমার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে আমি আর এই শহরে থাকবো না।
তার মানে?
আমি তখন দূর দেশের যাত্রী হয়ে যাবো। পাহাড় নদীবন্দর সমুদ্র সৈকতে একা একা হেঁটে বেড়াবো।
গান গাইবো,
ইয়ে দুনিয়া ইয়ে মেহেফিল মেরে কাম কি নেহি!
অ্যাই তুমি আমার মা-বাবার সঙ্গে একবার দেখা করো না!
যাবো।
দুদিন বাদে কৌশিক ওদের বাড়িতে গেল।
পৃথার বাবা-মা অসম্ভব ভালো ব্যবহার করলেন। তারপর বললেন, আমার ছোটবেলার বন্ধু সন্দীপ সেনের একমাত্র ছেলে পুলকেন্দুর সঙ্গে অনেকদিন আগে থেকেই আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। পৃথার মা ও আমি ওদের কথা দিয়েছি। এবার আমাদের কি করা উচিত, তুমিই বলো বাবা?
কৌশিক সেদিন ফিরে গিয়েছিল। আর কখনো পৃথার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার চেষ্টা করে নি। অন্যদিকে, বারবার ফোন করেও, কৌশিকের কাছ থেকে কোন সাড়া পায়নি সেদিন পৃথা।
জাহাজের ডেক অফিসারের চাকরি নিয়ে ও তখন
সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে দিতে পৃথাকে খুঁজে বেড়িয়েছে। পৃথাকে এতটাই ভালবেসে ফেলেছিল কৌশিক, তাই পৃথিবীর আর কোনো মেয়েকেই আরো মনে ধরে নি ওর। দেড় বছর বাদে কলকাতায় ফিরে কৌশিক জেনেছে, পৃথার বিয়ে হয়ে গেছে। অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করা কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু কৌশিক সেটা পারেনি। সবাই পারে না।
মনে মনে নিজেকে বলে, একা একা বেশ আছি, কেউ নেই, তাই কারো তরে চিন্তার ঢেউ নেই। এই সময় হেমন্ত মুখার্জীর গান আপনা আপনি মনে এসে যায়। শূন্য মনে হেমন্ত মুখার্জী একমাত্র সান্ত্বনা।
পরে ওর বন্ধু ইন্দ্রজিৎ চৌধুরীর কাছ থেকে জানতে পেরেছে, পুলকেন্দুর বাবা সন্দীপ সেনের সঙ্গে কখনোই পরিচয় ছিল না, পৃথার বাবা-মায়ের। মেয়ের প্রেমের কাছে জানতে পেরে, ওনারা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে পাত্র পুলকেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
কৌশিক নিজেকে বোঝায়, ওসব কথা ভেবে আজ আর কোনো লাভ নেই। কিন্তু সেদিনের ভালবাসা সবটা কি তাহলে মিথ্যে হয়ে গেল? কলেজ লাইফের সেই উদ্দাম দিনগুলো, সোনালী বিকেলগুলো, পথের পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া, ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে বই বদলাতে গিয়ে চুপিচুপি কথা বলা, সব মিথ্যে?
ভাবতে ভাবতে পথ হাঁটছিল কৌশিক। হঠাৎ মুখ তুলে দ্যাখে, একটি প্রাচীন মন্দির। ঠাকুর দেবতায়
ওর আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনদিন বিশেষ ছিল না।
মন্দিরের চাতাল পেরুতেই, এক জটাজুট ধারী সন্ন্যাসী বলল, বেটা, তুম আগায়া। ইয়ে সংসার তুমহে কুছ নেহি দিয়া। সব ভুল যাও বেটা। ঈশ্বর সে
কুছ্ মাঙগো, ইহা সবকুছ্ মিলেগা।
সেই থেকে জীবনের পথ বদলে গেল কৌশিকের।
ঈশ্বরের সাধনায় ক্রমাগত ঝুঁকে পড়ল ও। সংসারে ওর আর কোন টান নেই। সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েছে ও।
কৌশিক নিজেকে বলল, এতদিন অন্ধ ছিলাম। এখন আমি ঈশ্বরের দিব্য আলো দেখতে পাচ্ছি। সন্ধ্যেবেলায় এই মন্দিরে আরতি হয়। বহু ভক্ত আসেন এখানে।
একদিন সন্ধ্যেবেলায় পৃথা এলো এই মন্দিরে। সন্ন্যাসীর বেশে কৌশিককে দেখে পৃথা ওকে চিনতে পারেনি।
কৌশিক একবার ওকে দেখল। আজ আর পৃথাকে দেখে, কোন উত্তেজনা অনুভব করলো না।
মনে মনে বলল, এ আলোতে তোমার আলো, কখন গেল নিভে, আমি পাইনে যে তার দিশে!
ভালোবাসা শুধু দেয়, আর নেয়, এমন নয়। ভালোবাসা দিশা বদলালে, মাটি থেকে পাহাড়ের শীর্ষদেশে নিয়ে যেতে পারে, সামনে পৃথাকে দেখে,
কৌশিকের আজ তাই মনে হলো।
তারপর মনে মনে বলল, কৌশিক মুখার্জী মারা গিয়েছে। স্বামী নির্মলানন্দ জেগে উঠেছে।
ওর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কথামৃতের বাণী কানে আসছিল,
গায়ে যখন হলুদ মেখেছিস, সংসারের আর কোনো কুমীর তোকে ধরবে নে!
ভক্তরা অনেকেই স্বামীজীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করছিল।
স্বামীজীর দুচোখে তখন বর্ষা নেমেছে।
মনে মনে তিনি বললেন, তোমরা আমার পায়ে মাথা রাখছো, তোমরা কেউ জানো না, জগতের হেরো লোকটার পুরো জীবনটাই ব্যর্থতায় মোড়া।
এক ভক্ত বলল, আশীর্বাদ করুন বাবা!
তিনি বললেন, ভালো হোক তোমাদের!
মনে মনে বললেন, ওদের জন্য আমার এই প্রার্থনা কি ঈশ্বরের পায়ের কাছে কোনদিন পৌঁছবে?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD