রাতে ঘুমাতে গিয়ে স্ত্রী বললো আগামীকাল রান্না করার মতো চাল ডাল কিছুই নেই। স্ত্রীর কথা শুনে বললাম চিন্তা করবেনা আল্লাহ এক ব্যবস্থা করে দিবেন। সে বললো, সেটা বুঝলাম কিন্তু তার জন্য তো একটা মাধ্যম লাগবে। এত চিন্তা করো নাতো! আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, আল্লাহ কাউকে না খাইয়ে রাখেননা, নিশ্চয়ই আল্লাহ একটা মাধ্যম বের করে দিবেন। কথা বলতে বলতেই মোবাইল বেজে ওঠে, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে
কেমন আছিস।
আলহামদুলিল্লাহ
আগামীকাল আমার অফিসে আসতে পারবা?
কখন আসবো ভাই?
দুপুরের আগেই চলে আসবি, অবশ্যই আসবি বলে ফোনটা কেটে দেয়।
ফোন রাখতেই স্ত্রী বললো কে ফোন করেছে?
পরিচিত একজন, আমাকে খুব ভালো জানে।
অফিস কি খুব দূরে?
না বাসা থেকে হেঁটে ১০ মিনিটের পথ।
তাহলে তুমি সকাল সকাল চলে যাবে।
ফোন রাখতেই স্ত্রী বললো, তোমার না ভালো ভালো পরিচিত লোকজন আছে, ওনাদের বলে তো একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারো। এভাবে আর কতদিন বেকার থাকবে।
আল্লাহ যতদিন চান ততদিন!
আল্লাহ তো চেষ্টা করতে বলেছেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, চেষ্টা তো কম করছিনা প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে বলছি। হতাশ হওয়া যাবেনা আল্লাহ হয়তো উত্তম কিছু রেখেছেন তাই পরীক্ষা করছেন। আল্লাহ বলেছেন কষ্টের পরেই সুখ রয়েছে। আমার আল্লাহ অবশ্যই উত্তম পরিকল্পনাকারী। এখন ঘুমিয়ে পড়।
ঘুম না আসলে কি করবো, মেয়ে সকালে না খেয়ে মাদরাসায় যেতে হবে, আমরা না হয় কোনোমতে কাটাতে পারবো, এত ছোট মেয়ে থাকতে পারবে!
স্ত্রীর কথা শুনে বুক ফেটে আকাশ ভাঙা শব্দে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে! সেই কান্না ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়া কষ্টের সঙ্গীনীকে ছিঁড়ে চেপ্টা করে দেবে এই ভয়ে সাগরের উত্তাল তরঙ্গে ছোট্ট ডিঙি নৌকার মাঝির মত ভয় ডর শঙ্কা আর হতাশা আঁধারে আড়াল করে বললাম, পকেটে ১০ টাকা আছে, মাদরাসায় যাওয়ার সময় মেয়েকে একটা রুটি কিনে দিও।
আর আমরা!
বললামনা! আল্লাহ এক ব্যবস্থা করে দিবেন!
মুখে মোবাইলের আলো ধরে চমকে উঠে বললো।
তুমি কাঁদছো! চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া নোনা পানিতে ভিজে যাওয়া বালিশে হাত দিয়ে বললো।
তুমি নীরব কান্নায় বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছ! মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, আমাকে ক্ষমা করে দিও। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি দুজনেই ফুপিয়ে কাঁদতে থাকি। কতক্ষণ কেঁদেছি জানিনা, মেয়ের জেগে ওঠায় আমাদের কান্না থামে। মেয়ে লাইট জ্বালিয়ে, আব্বু তোমরা ঘুমাওনি! আম্মু তোমাদের চোখে পানি কেন?
কই নাতো! চোখ মুছতে মুছতে, আমরা মুখ ধূয়ে আসছি তো, তাই চোখ ভেজা লাগছে!
তাহলে কি সকাল হয়ে গেছে!
না মা এখনো সকাল হয়নি, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, তাহলে তোমরাও ঘুমাও।
রাত যেন শেষ হয়না! আর কষ্টের রাত নাকি লম্বা হয়! হাজার রকমের ভাবনা, মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ি।
পরদিন দুপুর ১২টা রাতে ফোন দেয়া ভাই অফিসে আসছে কিনা জানিনা, ফোনে টাকাও নেই যে ফোন করে জানবো উনি আসছেন কিনা। আল্লাহর উপর ভরসা করে ওনার পল্টনের অফিসে চলে গেলাম। পেয়ে গেলাম ওনাকে, দেখেই হাসি মুখে কুশলাদি বিনিময় করলাম।পিয়নকে দিয়ে সিংগাড়া আনালেন। সকাল থেকে খালিপেট সিংগাড়া হাতে নিতেই বউ বাচ্চাদের কথা মনে পড়লো, ওরা ওতো সকাল থেকে না খেয়ে আছে, মনে হতে চোখটা ভিজে উঠে, কোনোমতে একটা খেলাম, সিংগাড়া তো নয় যেন বিষ খেয়েছি। আমার ফ্যাকাসে মুখ দেখে, কিরে কি নিয়ে এত চিন্তা করিস, চল তোকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো, একথা বলেই রুম থেকেই বের হলেন আমিও ওনার সাথে। অফিস থেকে নেমে পাশের দুই বিল্ডিং পরে একটি অফিসে ঢুকলেন উনিও আমার পরিচিত কিন্তু কখনো অফিসে আসা হয়নি। আমাকে রিসিপশনে বসিয়ে উনি ভেতরে গেলেন। আধাঘণ্টা পর বেরিয়ে আসলেন আর রিসিপশনে কাজ করা লোকটিকে বললেন, তোমাকে ভেতরে ডেকেছেন আর আমাকে বললেন আমি চলে যাচ্ছি তুমি ভাইয়ের সাথে দেখা করে চেলে যেয়েও। লোকটি ভেতরে গিয়ে ফিরে এসে বললো আপনি একটু বসুন একথা বলে আরেকটি রুমে ঢুকলেন কিছুক্ষণ পর আমার হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন স্যার একটু ব্যস্ত এখানে একটি সাইন করে আপনি যেতে পারেন। বাইরে এসে খাম খুলে দেখি বেশকিছু টাকা, মনের অজান্তে দুচোখে কান্না নেমে আসে। সেদিন চাল ডাল মাছ সবজি নিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরি, এসব দেখে স্ত্রী অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, কোথায় পেয়েছ এসব!
কেন কাল বলেছিলাম না আল্লাহ এক ব্যবস্থা করে দেবেন। এখন দেখলেতো আল্লাহ আমাদের না খাইয়ে রাখবেন না আল্লাহর সাহায্য আসবেই! সারাদিনের না খাওয়ার কষ্টটা ভুলে রাজ্য জয়ের হাসি দিয়ে বললো আল্লাহর সাহায্য তো চলেই আসলো, চোখ মুচতে মুচতে দুজন বলে উঠলাম আলহামদুলিল্লাহ।
-১৬-০১-২০২৪