ঢেউয়ের মতো, বাঁশ বনে ভেসে যাওয়া উদাসী বাতাসের মতো, দ্রুত ভেসে যাচ্ছে দিন। মাঝে মাঝে স্মৃতির পুরনো পাতা উল্টে দেখি, সেখানে কত কথা, কত ব্যথা, কত মনোরম স্মৃতির মনি মানিক্য লুকিয়ে আছে।
আমার ঠাকুমা চারুশীলা মিত্র, তিনি আমার বাবার পিসিমা, আমার শৈশব জুড়ে তাঁর অজস্র স্মৃতি রয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। ঠাকুমার এক মেয়ে। তাঁকে বিয়ে দেবার পর ঠাকুমা এ বাড়ি চলে আসেন। আর কখনো শ্বশুর বাড়ি যাননি। ঠাকুমার মেয়ে জামাই
কিংবা নাতনি আমাদের বাড়িতে এলে, ঠাকুমা মনে মনে খুব বিরক্ত হতেন। এই বিরক্তির কারণ যে কী, সেটা কোনদিন বুঝতে পারিনি।
অথচ, আমার সেই পিসি পিসেমশাই যথেষ্ট ঠান্ডা মানুষ ছিলেন। পিসেমশাইয়ের শান্ত গোবেচারা মুখটা আজও মনে আছে। আসলে, আমার বাবার মা দুর্গারানী বাবার পাঁচ বছর বয়স যখন, তখন মারা যান। আমার বাবাকে মানুষ করেছিলেন, আমার এই ঠাকুমাই।
বাবার ডাকনাম ছিল খোকা। চারুশীলা মিত্র,
আমার ঠাকুমা বাবাকে আদর করে, কোদা বলে ডাকতেন। পরে একটু বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম,
বাবাকে মায়ের মতো ভালবাসতেন আমার ঠাকুমা।
ওভারটাইম করে বাবা বাড়ি ফিরলে, বাবাকে ডেকে ঠাকুমা বলতেন, তুই এখানে বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়্, আমি পাখা দিয়ে তোকে বাতাস করে দিচ্ছি।
মনে পড়ে, একবার ঠাকুমার নাতনি, আমার দিদি
দিন কুড়ির জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিল। চোখে পড়ার মতো ভারী সুন্দরী সে। ওর নাম ছিল, কালোমণি।কী করে এমন অসামান্যা সুন্দরী মেয়ের
ওই ধরনের একটা বিশ্রী নাম হয়, আজও বুঝিনি।
সন্ধ্যেবেলায় আমি আর ভাই যখন পড়তে বসতাম,
দিদি এসে আমাদের বইগুলো উল্টে পাল্টে দেখতো।
তখনো বাড়িতে বিদ্যুৎ আসেনি। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে দিত আমার সেই দিদিটা। আমার বেশ মনে আছে, আমাদের বাড়িতে ও আসাতে, আমার মা-বাবার টেনশন বেড়ে গিয়েছিল। এমন সুন্দরী মেয়ে ঘরে রাখা যে বিপদ!
অথচ, ও ছিল খুব সহজ সরল। নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন। ও ছিল বড় মায়াময়। ওর মিষ্টিমুখটা ভুলতে পারি না।
পরে ওরা বাংলাদেশে ওদের বাড়ি খুলনায় চলে যায়। ওখানেই ওর বিয়ে হয়। আর কখনো ওই দিদির সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।
ওর একটা কথা আজও কানে বাজে, তোরা জোরে জোরে পড়। আমি শুনি।
সেই ঠাকুরমা যেদিন ভোররাতে মারা গেলেন, আমার বাবা ভারী কঠিন মনের মানুষ, সেদিন শিশুর মতো কেঁদেছিলেন।
সেই প্রথম আমি নিজের চোখে বাড়ির প্রিয়জনের
মৃত্যু নিজের চোখে দেখেছিলাম।
আমার ঠাকুরদা খুলনার নৈহাটি ইনস্টিটিউশনের ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দাদুকে চাকরি দিয়েছিলেন। ঠাকুমা বলতেন, রাস্তা থেকে তাঁর ডাক কানে আসতো, তিনি বলতেন, ও চারু, চা বসাও, আমি আইছি।
আমি একটা নামকরা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে দীর্ঘদিন বাংলা পড়িয়েছি। ইলেভেনে সাহিত্যের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে, বাংলা রামায়নের রচয়িতা কৈলাস বসুর নাম পাই, এবং চমকে উঠি।
ঠাকুমার কাছে ,বাবার কাছে, এই নামটা বহুবার শোনা। ইনি আমাদের বংশের পূর্বপুরুষ। তাঁর সম্পর্কে বাবা কত কথা বলতেন!
আমার বাবার দুই বোন এবং এক ভাই। আমার দুই পিসিকে বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন। আমার কাকু, যখন মাত্র আড়াই বছরের, তখন ঠাকুমা মারা যান।
কাকুর জন্মের আগেই দাদু মারা গিয়েছেন। কাকুকে মানুষ করবার শর্তে আমার বাবা, মাকে বিয়ে করেছিলেন। কাকু আমার চেয়ে সামান্য বড়। কাকু, আমি আর ভাই একসঙ্গে স্কুলে যেতাম।
চাঁপা ফুলের বন, ফলসা গাছ, লিচু গাছের জঙ্গল, আশফল, সবকিছু কাকু আমাকে আর ভাইকে চিনিয়ে দিয়েছিল। বর্ষার দিনে মাঠ থেকে শালিক পাখি কুড়িয়ে এনে আমাকে কাকু বলতো, বাবু, চেয়ে দ্যাখ্, বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছে, ওকে বাঁচাতে হবে।
আমরা তখন ছোট। নিউল্যান্ড প্যান্ডেলে দুর্গা ঠাকুর এসেছে। আমাকে আর ভাইকে নিয়ে ঠাকুর দেখাতে
ছুটতো আমার কাকু। একবার ফাঁকা মাঠে ড্রেনের মধ্যে পড়ে গেল।
আবার উঠে দাঁড়ালো, বলল, না না, আমার একটুও লাগেনি।
নিউল্যান্ডে দুর্গা পূজার সময় প্রতিদিন যাত্রা হতো। বাবা আমি কাকু ঠাকুমা, প্রতিদিন রাত জেগে যাত্রা দেখতাম। শান্তি গোপাল, ভোলা পাল, বড় ফণি, ছোট ফণি, সুজিত পাঠক,জ্যোৎসনা দত্ত, বেলা সরকার, বীনা দাশগুপ্ত এবং গুরুদাস ধাড়া, স্বপন কুমার, তপন কুমারের অভিনয় রাতের পর রাত দেখেছি।
বন্ধুদের সঙ্গে যখন যাত্রা দেখতে যেতাম, তখন আমার বন্ধু অনেকেই পকেটে কোলা ব্যাঙ নিয়ে যেত। কোলা ব্যাঙ ছেড়ে দিলে, ভয়ে অনেক দর্শক সরে যেত। আমরা স্টেজের কাছে তখন বসে যেতাম। সামনে জায়গা পাবার অভিনব উপায় আর কি!
বড় পিসীর বাড়িতে রোববার সকালে গেলে, লুচি ভাজা হত। কাকু আর আমরা দুই ভাই ভালোভাবেই পেট পূজো সারতাম।
ছোট পিসির তখনো বিয়ে হয়নি। ও ছিল খুব শান্ত স্বভাবের। আমার সঙ্গে ছোট পিসির অনেক কথা হতো। একদিন ছোট পিসির বিয়ে হয়ে গেল।
আমরা সবাই একসঙ্গে মানুষ হচ্ছিলাম। বিয়ের পর মাঝে মাঝে ওর বাড়ি যেতাম।
শেষবারের মতো যখন ওর বাড়ি গিয়েছিলাম, তখন ছোট পিসি চোখে কম দেখতে শুরু করেছে। আমার গলা পেয়ে বলল, বাবু এসেছিস? আয়, আমি তোকে একটু ছুঁয়ে দেখি।
মাননীয় অজয় মুখোপাধ্যায় তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। চাল পাওয়া যাচ্ছে না। রেশনে মাইলো দেওয়া হচ্ছে। ভাই আর বাবা বজবজে কোথায় সস্তায় চাল পাওয়া যায়, খোঁজ করতে গেলেন।
সন্ধ্যেবেলায় দেখি, বাবা কোথা থেকে এক বস্তা আটা কিনে এনেছেন। সে বড় কষ্টের দিন।
আজকাল আমার নিজের ছেলেবেলার স্কুলের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। বাবা জামা কাপড় পরিয়ে, পায়ে বুট পরিয়ে স্কুলে পাঠাচ্ছেন,
মা খাবার রেডি করে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশের পাড়ার মেয়েটা, নাম কৃষ্ণা, গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকছে, বাবলু, বেরিয়ে আয়, লেট হয়ে যাবে।
আমরা একসঙ্গে স্কুলে যেতাম, তখন। ও পাশের গার্লস স্কুলে পড়তো।
একদিন বাস চাপা পড়ে মারা যায়।
ছাত্র হিসেবে কোনো কালেই আমি ভালো ছিলাম
না। আমার ভাই এক ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসতো। সর্বোচ্চ নম্বর পেত।
মনে আছে একবার কোন একটা চাকরির পরীক্ষায়
বয়স্ক পরীক্ষার্থীদের অনেক অনেক প্রশ্নের উত্তর ও সটান বলে দিয়েছিল। পরীক্ষার্থীরা তো অবাক!
ওর অনেক দূর যাবার কথা ছিল, মনে হয়, নজর লেগে গিয়েছিল মানুষের। পড়াশুনায় আমাদের ভাই বোনেদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ছিল, আমার মেজ ভাই।
ছোটবেলায় ও একবার পুকুরে পড়ে গিয়েছিল। মা ওকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচিয়ে এনেছিলেন। সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা আমি আজও ভুলিনি।
পৃথিবীর চারদিকে যখন ভাঙ্গনের খেলা চলেছে, তখন মা বাবার শিক্ষা মতো আজও আমরা একসঙ্গে আছি। পাশাপাশি বসে গল্প করি। অবসরপ্রাপ্ত ছোট ভাই প্রাক্তন পুলিশ, পাশে এসে বসে। ভালো লাগে। মেজ ভাই, পত্রিকা কিনে এনে বলে, এটা পড়। বিষয়টা তোর কাজে লাগবে।
ছোটবেলার কথা বলতে গেলেই, দুর্গা পুজোর দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। বাটানগরের দূর্গা পুজো চিরকালই খুব বিখ্যাত।পূজোর সময় বাটা ব্রিজের উপর বিশাল একটা গেট তৈরি হতো। দুদিকে লেখা থাকতো, পূজোয় চাই নতুন জুতো। পাশে সুদৃশ্য হাতীর ছবি। বাবা ছুটির দিনে আমাদের মুসলমান পাড়া থেকে জামা প্যান্ট কিনে দিতেন। আমার শুধু একটাই দাবি থাকতো,
আমার প্যান্টে যেন বেল্ট লাগাবার জায়গা থাকে।
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছিলাম।
বাবার একার উপরে সংসার। আমাদের যৌথ পরিবার। মা বলতো, বাবু, ভালো করে পড়াশোনা কর্, বাবুর পাশে দাঁড়াতে হবে।
এই কথাটা আমার খুব মনে ধরেছিল।
ক্লাস নাইনে আর্টস নিয়ে পড়ি। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় সংস্কৃতে দুশোর মধ্যে দু পেপার মিলে সতেরো পেয়েছি। ফাস্ট বয়কে বললাম, বাড়িতে কি করে এই কথা জানাবো। ও বলল, আমিই তো এর জন্য দায়ী হলাম।
এই কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল। আমি সারাদিন ভেবে আকুল হলাম, ওতো ফাস্ট বয়! আমি তো সবার পিছনে। তবে ও কেন এই কথা বলল?
এর আগে মা আমাকে অনেকবার পড়তে বলেছে। আমি শুনিনি। আমি ছবি আঁকতাম। মাটি দিয়ে মূর্তি বানাতাম। পড়ার কথা বললে, আমার গায়ে জ্বর আসতো।
সেই দিনের বিকেলটাকে আমি আজও দেখতে পাই। আমি বাড়ি গিয়ে পিছনের বারান্দায় পড়তে বসে গেলাম। বাবা মা সেদিন আমার আচরণ দেখে চমকে উঠেছিলেন। যেন ভূত দেখছেন। সেই প্রথম নিজের ইচ্ছায় আমি পড়তে বসেছি।
সারারাত পড়েছি। উঠোনে বসে মাদুর পেতে পড়তে বসতাম। রাত তিনটে সাড়ে তিনটের সময় হ্যারিকেনের আলো নিভে গেলে, মা ঘরে ডেকে নিয়ে যেতেন। বলতেন, এখন শুয়ে পড়। কাল আবার স্কুল আছে!
সেই থেকে চাকা ঘুরে গেল। আমি তখন ফার্স্ট হচ্ছি। আমি নিজেকে বদলে ফেলছি। আমি আর পিছনের দিকে চাইবো না। আমি কিছু একটা করে দেখাবো।
বাবা তখন আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছেন।
অনুপ্রেরণা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, আমার বাবা তার স্পষ্ট উদাহরণ।
তিনি আমাকে লেজ ওয়ালা ঘুড়ি বানিয়ে দিলেন, সাইকেল চালানো শিখিয়ে দিলেন, সাবান দিয়ে স্নান করিয়ে দিতেন। শুধু বলতেন, বাবু, গরীব হওয়া বড় পাপ।
বাবা বাটা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। বাবার সহকর্মী বন্ধুরা আমাকে পরে বলেছেন, অফিসে উনি বলতেন, আমার ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেলে আমার আর কষ্ট কি!
সীমাহীন কষ্ট করেছেন আমার মা বাবা। মা ঘরে, বাবা বাইরে। ভুলতে পারিনা। জীবনে অনেক অর্থ উপার্জন করেছি। নিজের মতো করে বাঁচা শিখিনি।
বাবা মা যেমন সবাইকে নিয়ে চলতে ভালবাসতেন, নিজেও সেভাবে জীবন কাটিয়েছি।
কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়তে গিয়েছিলাম। অল্প স্বল্প লেখালেখি করতাম। মা বলতেন, তোমার বাবুর খুব ইচ্ছে, তুমি লেখালেখি করো। রেডিওতে প্রোগ্রাম করে এলাম। পরিচিতরা তা শুনে পরদিন বলল, অ্যাই, এটা তোর গলা না।
বুঝলাম, খারাপ ছেলের তকমাটা আজও আমার গা থেকে যায়নি।
কলেজে যখন পড়তে গেলাম, তখন দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। সত্তর দশককে মুক্তির দশক হিসেবে ডাক দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে তখন চূড়ান্ত অভাব। বাবার একার পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
আমি বুঝতে পারছি, বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে। অথচ আমার পড়াশোনা শেষ হয়নি।
দুটো টিউশনি করতাম। তাতে কোনো মতে হাত খরচা চালাতাম। সংসারে কোন সাহায্য করতে পারিনি।
তিনটে চারমিনার সিগারেট কিনে কলেজ যেতাম। বঙ্গবাসী কলেজের ক্যান্টিন ছাড়াও, পাশে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ক্যান্টিনে গরম সিঙ্গারা খেতে যেতাম।
কলেজ থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে একটা মিষ্টির দোকানে দারুন ঢাকাই পরোটা বানাতো। দাম চল্লিশ পয়সা। দারুন খেতে। সঙ্গে অনেকটা আলুর তরকারি দিত।
নিয়মিতভাবে এখানেই খেতাম। এই তো সেদিন যখন কলেজের কাছে গিয়েছিলাম, দেখি দোকানটা নেই।
খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের কলেজের নিচেই বাজার। সামনে একটা বইয়ের দোকান। অভিনেতা কামু মুখার্জী ওখানে বসে থাকতেন। ফর্সা মানুষ, পান চিবিয়ে ঠোট লাল। অভিনেতা তরুণ মিত্র দুহাতে থলি নিয়ে বাজার করতেন। তখন সিনেমায় উত্তম কুমার অভিনীত সাবরমতী ছবি বেরিয়েছে। ওই ছবিতে বিচারকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা সুনীল বটব্যাল।
গায়ে হাওয়াই শার্ট, পরনে পায়জামা এবং পায়ে হাওয়াই চটি, ওনাকে ধীরগতিতে কলেজের গেটের সামনে দিয়ে দিনের পর দিন এগিয়ে যেতে দেখেছি।
এম এ পড়বার সময় পরীক্ষার চার মাস আগে আমার স্কুলে বাংলার শিক্ষক হলাম।
দোর্দণ্ড প্রতাপ প্রধান শিক্ষক অসিত রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় প্রথম মাসের মাইনে দিয়ে বললেন, টাকাটা মায়ের হাতে দেবে। তবে দু পাঁচ টাকা চেয়ে নিতে পারো, সাইকেল লিক করতে পারে, চটি ছিঁড়ে যেতে পারে!
স্যারের উপদেশ আমি চিরদিন মেনে এসেছি।
হেড স্যার বড় ভালোবাসতেন আমাকে। মুখে কখনো একবারও বলেননি। অন্য স্কুলের বাংলা টিচাররা আমাকে পরে বলেছেন, তোদের হেড স্যার তোকে নিয়ে খুব গর্ব করেন।
আহা, আমি যদি নিজের কানে কখনো তা শুনতে পেতাম!
তাঁকে আমি এতটাই শ্রদ্ধা করতাম যে, তাঁর আদেশ ছিল আমার কাছে ঈশ্বর বাক্যের মতো।
দু হাজার দশে বাবা চলে গেছেন। দু হাজার চোদ্দতে কাকু চলে গেল, দু হাজার পনেরোতে মা চলে গেলেন।
এদের বাদ দিয়ে আমার পৃথিবীটা কেমন হবে, সেইসব দুঃখের দিনে, দারিদ্রের দিনে, ভালোবাসার দিনে ভাবতেও পারতাম না। অথচ, দিনগুলো তো গড়িয়েই চলেছে, জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে।
মাঝে মাঝে অলীক কল্পনা করা আমার চিরকালের অভ্যাস।
ভাবি, যদি আমাদের উঠোনে শিউলি তলায় মা আগের মত বসে আছেন, দেখতে পেতাম!
কিংবা বাবা বড় ঘরের সোফায় বসে বলছেন, বাবু, আজ যদি কেউ এক হাড়ি রসগোল্লা নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতো! কাকু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে চেঁচিয়ে বলতো, বাবু, স্কুলে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় তুই ফাস্ট হয়েছিস!
ভাবি, টাইম মেশিনে সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনা যায় না!
সেদিন বড় গরীব ছিলাম। আজ আমি বাবা মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে পারি। অথচ, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত তারা চলে গিয়েছেন।
আমি জীবনের ট্রাজেডিটা ধরবার চেষ্টা করছি।
মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। বাগানের ফুলের সুগন্ধ নাকে এসে লাগে। কল্পনার চোখে দেখি, ফুল গাছে জল দিচ্ছেন আমার মা। বাজার থেকে এসে বাবা বারান্দায় দুটো নারকেল রাখলেন, ছোলার ডালের মধ্যে নারকেল দিতে হবে। নীল টি-শার্ট পরে আমার দারুন সুদর্শন কাকু অফিস ফেরতা শ্রীপতির দোকানের মোগলাই আর মাংস কিনে এনেছে।
কাকু ডাকছে, বাবু আয়। সবাই মিলে খাবো!
যে সময় চলে গেছে, সেদিন তার মূল্য বোঝো নি, শতবার গলা ফাটালেও, ওরা আর ফিরবেন না।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আকাশে একটি দুটি তারা। নদীর ওপারে চাঁদ। সময় হলে, এত স্মৃতি, এত মায়া, এতো ভালোবাসা, সব ফেলে চলে যেতে হবে।
দেখা হবে, দেখা হবে, আবার আমাদের দেখা হবে।
বাবু, মা, কাকু, তোমাদের সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে।
একদিন সব কাজ শেষ করে, আমি তোমাদের পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াবো।