বিলাসী জীবন যাপন করতে কার না ভালো লাগে।
এই যেমন ঘুমের সকালে কেউ ঢেকে বলল
এই উঠো চা নাস্তা রেডি।
কিন্তু ঘুম ভেঙে উঠে খাওয়ার ইচ্ছেটুকুও করে না তখন।
আর একটু ঘুমিয়ে নেই ঘুমিয়ে নেই বলে বাইরে যাবার সময় কাছাকাছি চলে আসলেও ঘুমই ছাড়তো না।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন হয়।
যেমন কাপড় ধোয়ার চিন্তা নাই, বাজার করার চিন্তা নাই,
বাসায় কি রান্না হবে তার চিন্তা নাই।
কিন্তু পছন্দমতো খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যখন সামনে হাজির হয়
আমার কাছে এটাই বিলাসিতা।
এর চাইতে বেশি না পেলেও আফসোস হতো না।
জীবনে তো ভাবিনি এরজন্য নিজেকেই
সংগ্রাম করতে হবে।
নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে।
কিন্তু! এমন সময় আসবে না,
সে কথা কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে না।
আমিও পারিনি। আমার সন্তানেরাও পারেনি।
এখন নিজের প্রয়োজনে সময়মত উঠতে হয়,
রান্না করতে হয়, বাজার করতে হয়।
কারো জন্য আর অপেক্ষা নাই।
আমার কাজ আমাকেই করতে হয়।
কিছু সৌভাগ্যবান পুরুষ মহিলা ছাড়া
একটা বয়সে সবাইকে এই পরিস্থিতির
মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।
যা আমরা ইউরোপ আমেরিকার কথা
শুনলেও নিজেরা ভাবতে পারিনি।
এখন বাঁচতে হলে কাজ করতে হবে।
পালানোর কোনো পথ নেই।
একটা বয়সে আমার খুব পালাতে ইচ্ছে করতো।
কেন জানিনা
পালানো নিয়ে আমি অনেক জল্পনা কল্পনা করলেও পালাতে পারিনি।
ভাবতাম কোথায় যাবো? কি করবো?
মনে মনে ভাবতাম ঢাকা চলে যাবো।
একটা কাজ খুঁজে নিব।
আবার ভাবতাম আমি কি কাজ করবো?
যে পরিবারে বড় হয়েছি সেই পরিবারের
ছেলেমেয়েদের সাথে আশেপাশের
মানুষ ই কথা বলতে ভয় পায়, সাহস পায় না।
যেকোনো কাজ আমরা করতে পারি না।
আমাদের বাড়িতে এত মানুষ কাজ করে
আর আমি ঢাকা গিয়ে কি কাজ করবো।
তখন আমার বয়স ১২/১৩ হবে।
ভাবতাম মানুষের বাড়ি কাজ করবো।
পরক্ষণেই ভাবতাম সম্ভব না।
তখন বাবামায়ের মৃত্যু কি বুঝতাম না।
পরিবারে দাদার মৃত্যু ছাড়া সবাই জীবিত।
মৃত্যু শোক নিয়ে তেমন কিছুই মনে হতো না।
তবে মা’কে খুব ভালোবাসতাম।
আমার মনে হতো মা মরে গেলে আমি পাগল হয়ে যাবো।
মনে মনে না বুঝেই ভাবতাম মা মরে গেলেই ভালো হবে।
আমি পাগল হয়ে যেখানে ইচ্ছে চলে যাবো।
কেউ আটকাতে পারবে না।
কি অদ্ভুত চিন্তা।
এখন ভাবলেই হাসি পায়।
পড়ালেখা শেষ না করে আর আমার পালানো হয়নি।
তবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে হোস্টেলে।
আমি বরাবরই ঘরের কাজে অলস।
ওসব কাজ আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি।
বাড়িতে মা ভাই-বোনেরা কাজে বললে
আমি করতে চাইতাম না।
পড়ার কথা বলে গল্পের বই পড়তাম, তবু কাজ করতাম না।
বলতাম আমি পড়ালেখা করে বড় অফিসার হব, আমার কত দাসদাসী থাকবে,
তারাই আমার সব কাজ করবে।
মা সহ সবাই হাসত।
আমি ঘর সংসারে কোনোদিন ই খেয়ালি ছিলাম না।
বিয়ে করবো না, প্রতিষ্ঠিত হবো এটাই লক্ষ্য ছিল।
তাই পড়ালেখা শেষ করে যখন চাকরি খুঁজছিলাম তখন বিয়ের জন্য সবাই পাত্র দেখা শুরু করে।
একদিন এক পাত্র দেখে পছন্দ করলে ,
চাকরির কথা বলে বাড়ি ছাড়ি আর চাকরিতে যোগ দেই।
সেদিন থেকেই আমার বিলাসিতা গোল্লায় গেল।
অবশ্য পরবর্তীতে বিয়ের পর মা শাশুড়ী বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমি খুব আরামেই ছিলাম।
মা’ই সব কাজের লোক যোগার করে দিত।
তেমন কষ্ট হয়নি।
বলা যায় একটা স্বাধীন জীবনযাপন আমি করেছি।
যতই বয়স বাড়ছে, শরীরের শক্তি কমছে ততোই অসহায় হয়ে পড়ছি আমরা।
এ-ব্যাপারে শহরের মানুষ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও গ্রামের অবস্থা ভয়াবহ।
বাড়িতে একজন বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হলে বা,
কাজের প্রয়োজনে কেউ কাউকে দেখার নাই।
সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত।
সিনিয়র সিটিজেন মানেই নির্বাসন।
খুব মনে পড়ে প্রিয় শিল্পী মান্না দের কথা।
যদিও অনেকের কথাই আমাদের অজানা।
আর দিনে দিনে পরিস্থিতি এমন হচ্ছে
অস্বাভাবিক বা স্বাভাবিক মৃত্যু যাই হোক না কেন প্রিয়জনের হাতের
একটু পানি খেয়ে মরতে পারবো না-কি সন্দেহ আছে।