নির্জন পার্কের আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে ওরা দুজন কথা বলছিল। অমল আর নন্দিনী। আজ সকালেই অমল নন্দিনীকে এখানে দেখা করতে আসার জন্য ফোন করেছিল।
কি ব্যাপার, আমাকে এখানে আসতে বলেছেন কেন?
আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল।
বলুন।
আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।
তাতে কি?
আমরা কি বন্ধু হতে পারি না।
বন্ধু হওয়া খুব সহজ। বন্ধুত্ব রক্ষার দায় অনেকে নিতে চায় না।
বুঝলাম না।
আমার এক কবি বন্ধু আছেন, একটি পত্রিকায় তিনি সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, তাঁর কোন আবেগ নেই। আবেগ ছাড়া লেখা সম্ভব বলে আমার মনে
হয় না।
কিন্তু আমি যে আপনাকে ভালোবাসি।
হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি?
আমি কি নিরাশ হয়ে ফিরে যাবো?
আমি আপনাকে ভালোভাবে জানি না। হঠাৎ করে
কোন কিছু সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে জানানো অসম্ভব।
না না, আপনি ভেবে বললেই হবে।
আপনি কোথায় চাকরি করেন?
একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে। গ্রাজুয়েশনের পর
চাকরিটা পেয়েছি। বাবা নেই, মা আছেন। আপনি তো বেহালায় থাকেন, তাই না?
হ্যাঁ, কিন্তু আপনি সেটা কি করে জানলেন?
লিপিকা বলেছে। আপনি যাকে সপ্তাহে দুদিন গান শেখাতে আসেন।
ঠিকই শুনেছেন। কিন্তু আমি একজনকে ভালোবাসি। অনির্বাণ। ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
সল্টলেকে অফিস।
সরি, আমি জানতাম না।
না, সেটা ঠিক আছে। আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করায় আমার কোন আপত্তি নেই।
বেশ, আজ থেকে আমরা দুজন বন্ধু হলাম।
জানেন, কাজকর্মের ব্যাপারে আমি বরাবর সিরিয়াস। কোনদিন কোন কাজ অন্যের উপর চাপিয়ে দিইনি। নিজের কাজ নিজে করতে ভালোবাসি। অথচ, ভাগ্য আমাকে কখনো সাথ দেয় না।
মানে?
এমএ পরীক্ষার সময় থার্ড পেপার পরীক্ষার দিনে ট্রেনটা পার্ক সার্কাস স্টেশনে চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলো। পরীক্ষার হলে পৌঁছতে দেরি হল। অবশ্য ওই পেপারে আমি সাতষট্টি নম্বর পেয়েছিলাম।
তাই নাকি?
আমার সবকিছু দেরিতে হয়।
কেন?
সেটা জানিনা।
ছেলেরা পরীক্ষা দিতে গেলে, আজও স্বপ্ন দেখি, আমি যেন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, ট্রেন দাঁড়িয়ে গেল পথে, আমি কিছুতেই পরীক্ষার হলে পৌঁছতে পারছি না।
এই ভয়টা সম্পূর্ণ মানসিক ব্যাপার।
হবে হয়তো। আজ তাহলে আসি।
হ্যাঁ, আসুন।
কবে দেখা হবে?
পৃথিবী যখন গোল, তখন নিশ্চয়ই দেখা হবে। বন্ধুত্বের দিব্যি।
ভালো। সারা জীবনে আমি মানুষের সঙ্গে মিশতে চেয়েছি অনেকবার। ভালো বন্ধু পাই নি। আমার আন্তরিকতাকে নিয়ে তথাকথিত বন্ধুরা খিল্লি উড়িয়েছে।
তাই বুঝি!
আর, আমি অভিনয় করতে শিখিনি।
নন্দিনী বাস থেকে নেমেছে। অমল পথের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল।
ওটা ছাড়া যায় না?
আমি যাকে ভালোবাসি, তাকে ছেড়ে যাই না।
অ্যাই, ইয়ার্কি হচ্ছে?
না, সত্যি বলছি।
মঙ্গলবার এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আপনি আসেননি।
হ্যাঁ, অনির্বাণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
ও, তাই বুঝি?
সেক্টর ফাইভে ও নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে। দেখাতে নিয়ে গেল। তাই আসিনি।
আমি আধঘন্টা দেখে চলে গিয়েছিলাম।
আপনি আমার জন্য ওয়েট করেছেন?
হ্যাঁ তো।
কেন?
বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য।
আমি ভাবতে পারছি না।
আপনি আসেননি, আমার কোন কষ্ট হয়নি। আপনার কথা ভেবে অনেকটা সময় এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ততক্ষণ আপনি তো আমার মনের কাছাকাছি ছিলেন।
বাপরে, আপনি এভাবেও ভাবতে পারেন?
আমার ভাবনাগুলো কারো সঙ্গে মেলে না। আমি সবসময় অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবনা নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকি।
আমার কথা বাদ দিন। অনির্বাণের কথা বলুন।
অনির্বাণ বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। নিজের যোগ্যতায় চাকরি যোগাড় করেছে। সামনের মাসে অফিসের কাজে আমেরিকায় যাবার কথা হচ্ছে।
এক বছর পর ফিরবে।
বাহ, খুব ভালো কথা। কিন্তু আপনার সঙ্গে যোগাযোগ কিভাবে হবে?
ফোনে কথা হবে। ভিডিও কল করবে। ও বলেছে, ও দেশে সেটেল করতে পারলে, এখানে আমাকে বিয়ে করে, ও দেশে নিয়ে যাবে। আমার মা বাবা দাদার সংসারে থাকবে।
ভালো তো। আপনি সমাজের উঁচু তলার মানুষ। কি আশ্চর্য! আমি আপনাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি। এ আমার পরম ভাগ্য।
না না, বন্ধুত্ব টাকা পয়সা, ক্ষমতা দেখে হয় না।
চলুন। ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটু চা খেয়ে আসি। ওরা খুব ভালো চা বানায়।
জানেন, আমার এক বন্ধু আছেন, রাজা চক্রবর্তী, জলপাইগুড়িতে মাল নদী টী এস্টেটের ম্যানেজার।
ওর বাংলোতে এক রাত ছিলাম। চারদিকে সবুজ চায়ের বাগান। চা খেয়েছি। রাজা আমাদের সঙ্গে সারাদিন থেকে ওর গাড়িতে করে কালিম্পং পর্যন্ত বেড়াতে নিয়ে গেছিল।
আপনার খুব ভালো বন্ধু রাজা?
হ্যাঁ। ওর কাজের ভীষণ চাপ। তবু কবিতা লেখে, গল্প লেখে, সারাদিন কাজের পর গান বাজনা নিয়ে থাকে।
আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন?
অবশ্যই।
চা খেয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে নন্দিনী ছাত্রীর বাড়ি গান শেখাতে চলে গেল।
অমল বলল, টা টা।
পরের মঙ্গলবার। বাস থেকে নেমে নন্দিনী কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দিয়ে হেঁটে আসছিল। পিছনে অমল।
কি ব্যাপার?
অনির্বাণ পরশু রাতের ফ্লাইটে নিউইয়র্ক চলে গেছে।
ওর কথা খুব মনে পড়ছে, তাই না?
সুনীল গাঙ্গুলীর কবিতার কথা মনে পড়ছে, যখন তোমাকে দেখি না, তখন আরো বেশি দেখি।
কী সুন্দর করে বললেন। আমি কোনদিন কবিতা লিখিনি। আপনার সঙ্গে আলাপের পর, আমার খুব কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে।
লিখুন। কে নিষেধ করেছে?
অমল মনে মনে বললো, ভালোবাসায় ব্যর্থ হলে, যে কোন মানুষ কবি হতে পারে। তুমি বুঝবে না নন্দিনী,
তুমি তো কখনো ভালবাসায় ব্যর্থ হও নি।
কিছু বললেন?
না।
পরের শুক্রবার।
জানেন, ওখানে পৌঁছবার পর অনির্বাণ প্রতিদিন রাতে আমাকে ফোন করেছে। বিগত চার দিন কোন ফোন আসেনি। আমি ফোন করে কোন সাড়া পাইনি।
হয়তো ব্যস্ত আছেন, তাই। পরে হয়তো করবেন।
ওর মতিগতি আমার ভালো লাগছে না।
মানুষের অসুবিধে থাকতে পারেনা?
তা পারে।
অমল, আপনি বিয়ের কথা ভাবছেন না?
না।
কেন?
আমার চাল নেই, চুলো নেই। আমাকে কে বিয়ে করবে?
তার মানে?
আমার কপালটা খুব একটা ভালো নয়। যাকে যখন আঁকড়ে ধরতে গিয়েছি, সে তখন হাত সরিয়ে নিয়েছে।
এ কথা বলছেন কেন?
সময়মতো কিছু হয় না আমার। পরীক্ষার হলে পৌঁছানো হয় না, চাকরি পেতে পেতে বয়স বেড়ে যায়। যাকে ভালোবাসি, বলতে পারিনা। আমার জীবনে সবকিছুই উত্তরগুলো নেতিবাচক।
অমল বাবু, রাত্রি সত্যি হলে, দিনটাও সত্যি। যেখানে প্লাবন আসে, সেখানে আবার শান্ত পৃথিবী দেখা যায়। হেমন্তে গাছের পাতা ঝরে যায়, বসন্তে নতুন সবুজ পাতা ফুটে ওঠে।
আমার কিছু বদলায় না।
এটা আপনার ভুল ধারণা। সময় হলে মিলিয়ে নেবেন।
আজ শুক্রবার। নন্দিনী বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক চাইলো। অমল আসেনি। কেন এলো না, অমল? নন্দিনী অমলকে ফোন করল, কি হলো, আজ এলেন না যে!
তিন দিন ধরে জ্বর। অফিস কামাই হল। বিছানায় শুয়ে আছি।
আপনি ঠিকানাটা বলুন। আমি আসছি।
খানিক বাদে নন্দিনী এসে অমলের অসুস্থ বিছানার পাশে বসলো। ওর কপালে হাত রাখলো। অমল ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো।
আপনি এসে গেছেন?
হ্যাঁ। বন্ধুত্বটা অভ্যাস হয়ে গেছে যে! আপনি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যান তো! আপনাকে শুয়ে থাকা অবস্থায় আমি দেখতে চাই না।
আপনি এসেছেন, এবার আমি ভালো হয়ে যাবো। ভালো কথা, অনির্বাণের কি খবর?
কোনো খবর নেই। আমাকে মেসেজ করেছে, একা থাকতে কষ্ট হচ্ছে। বিয়ে করবার কথা ভাবছে। এটুকুই লিখেছে।
আপনি তাহলে ওর কাছে চলে যান।
না, কক্ষনো না। দেখি, আমি আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড হয়ে গেছে কিনা!
সম্পর্কটা ভাঙবেন না কিন্তু, আমার রিকোয়েস্ট।
সেটা কি আমার একার উপর নির্ভর করে? আজ চলি। আপনাকে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠতে হবে।
অমল হাসলো।
পরের মঙ্গলবার।
সিগারেট হাতে অমল নন্দিনীর জন্য অপেক্ষা করছিল। নন্দিনী বাস থেকে নামলো। কপালের উড়ু উড়ু চুল গুলোকে সরিয়ে অমল এর দিকে তাকালো। বলল, কতক্ষণ এসেছেন?
একটু আগে।
কাল রাতে অনির্বাণ ফোন করেছিল। বলল, এখানেই থেকে গেলাম। অফিস কলিগ ইলিনাকে বিয়ে করছি, সামনের সপ্তাহে। ক্যারিয়ার টাকে একটু চাঙ্গা করতে হবে।
সে কি! এত দিনের ভালবাসার কোন মূল্য নেই?
নন্দিনী হাসলো। বলল, সবাই সেটা বোঝে না অমলবাবু।
এ তো বিশাল অন্যায়।
আমি একা হয়ে গেলাম, বড্ড একা হয়ে গেলাম।
আমি আপনার যোগ্য নই জানি, তবু যদি বন্ধু হিসেবে আপনি আমাকে পাশে নেন, আমি আপনার পাশে থাকতে চাই।
অমল, অনির্বাণ পাঁচ বছর ধরে ভালোবাসার অভিনয় করে আমার হাতটা ছেড়ে দিল। আমি ভাবতে পারছি না। কাকে বিশ্বাস করবো? কেন বিশ্বাস করবো? টাকা পয়সা, ক্যারিয়ারের কাছে ভালোবাসার কোনো দাম নেই?
আছে আছে। পৃথিবীটা এখনো মরুভূমি হয়ে যায়নি।
নন্দিনী, আমার হাতের উপর তোমার হাতটা রাখো।
কথা দিচ্ছি, মৃত্যু পর্যন্ত আমি এই হাত কখনো ছাড়বো না।
তখন বসন্তকাল। কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে ফুলের পাপড়ি গুলো ওদের মাথায় ঝরে পড়ছিল। নন্দিনী অমলের হাতে হাত রাখলো। বলল, সত্যিকারের ভালোবাসা কোনদিন হারায় না, কোনদিন হারায়নি।
আমার ভালবাসার মানুষটা এত কাছে ছিল, আমি শুধু এতদিন চিনতে পারিনি।