আমি যাই, আমার স্মৃতিরা আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ হাঁটে। মেঘে মেঘে বেলা হয়ে গেল। কত পথ পেরিয়ে এলাম।
দাঁড়ে বসে পোষা ময়না পাখি বলে, দিন যায়, দিন যায়।
জীবন যেন পায়ে চলা একটা বিস্তীর্ণ পথ, চলতে চলতে পথ একদিন দীর্ঘতর হয়। পথের উপর দিন শেষের ছায়া এসে পড়ে। এই ছায়া ক্রমাগত দীর্ঘতর হয়। একসময় ছায়া আসল মানুষটিকেও ছাড়িয়ে যায়।
এই বয়সে বারবার স্মৃতি পিছু টানে। যে দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছি, বিস্মৃতির ধূলোবালি সরিয়ে
পরম মমতায় তাদেরকে একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।
অত্যন্ত গ্রাম্য পরিবেশে সবুজ গাছপালার ফাঁকে কেটেছে আমার ছেলেবেলা। কাঠবাদাম গাছের ছায়া, বাঁশ বন, জামরুল গাছের ছায়া, ধূ ধূ সরষে
ক্ষেত, মাঠের চার ধারে সারি দিয়ে নারকেল গাছ,
গাব গাছের জঙ্গল, বর্ষার দিনে সোনা ব্যাঙের গাংগর গ্যাঙ আওয়াজ, স্কুল থেকে ফিরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, বিকেল হলেই আকাশ ভর্তি রংবেরঙের ঘুড়ি, সন্ধ্যে হলেই,উঠোনে মাদুর পেতে পড়তে বসা, মাথার ওপরে লক্ষ তারার আলোয় ভরা আকাশ, রাতের মায়াময় জ্যোৎসনা, সত্যি বলছি, একটুও ভুলিনি।
গরীব বাড়ির ছেলে আমি, সেজন্য মনে কোনোদিন দুঃখ ছিল না।আজ বুঝি,এই বাড়ি,বাবা ,মা ,বড়রা
আমাকে মূল্যবোধ ও বিবেক ভাবনা শেখাতে পেরেছিলেন। জীবনে চূড়ান্ত অভাব, আবার সচ্ছলতা দেখেছি।কখনো মাথা ঘুরে যায় নি।
এই বাড়ি আমাকে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
লিখি যে,তা বোধহয়, আমার মায়ের মতো নরম মন
থেকে, নাটকীয়তা ও প্রতিবাদী মন বাবার কাছ থেকে পাওয়া।
ছোটবেলার কথা ভাবতে গেলেই, আমি যেন দেখতে পাই, বৃষ্টিতে ডাঁটা গাছের মাথায় ভেজা টিয়া, উঠোনের জলসাগরে নৌকো ভাসানো, রান্নাঘর থেকে মায়ের হাতে বানানো খিচুড়ির সুবাস, ঠাকুমার
কোলে বসে বক রাক্ষসের গল্প শোনা, রাতে বাবার কাছে ইংরাজী পড়া,বাবা বাড়ি না থাকলে, পড়তে বসে ভাই বোন মিলে গল্প করা, আবার বাবার আসার শব্দ পেলে,গলা ছেড়ে পড়া।
এভাবেই এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে যাওয়া। স্কুল বাড়িটাকে খুব ভয় পেতাম। বাজারে যাবার সময় স্যারেদের সঙ্গে দেখা হলে,বাবার পেছনে লুকোতাম। আমার দাদার মতো কাকু, আমি আর ভাই একসাথে স্কুলে যেতাম।কাকু আমাকে চাঁপা ফুল,আসফল,গাব,ফলসা আর লিচু বাগান চিনিয়ে ছিল।ঠাকুমা,মামা, কাকু, পিসী, একসঙ্গে থাকার আনন্দ বরাবর পেয়েছি।
বাড়িতে লাউ দিয়ে ডাল হোত,পেট ভরে সপাসপ খেতাম। মেলাতে দুআনা পয়সা পেলেই, খুশি হতাম।বড়পিসেমশাই ভালো অভিনয় করতেন, দেখতে যেতাম। শুক্রবার পাড়ার একমাত্র রেডিওতে,মায়েরা নাটক শুনতে যেতেন, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের খেলা থাকলে,পথে দাঁড়িয়ে আমরা অজয় বসু,পুষপেন সরকারের রিলে
শুনতাম।
কলেজে গিয়ে বাঙলা অনার্স নিলাম,সবাই বলল, মেয়েদের সাবজেক্ট, খেতে পাবে না।
দুপুর বেলায় শেফালী পিসী মায়ের কাছে সেলাই শিখতে আসতো,কী ভালো মেয়ে। সাপের কামড়ে সে যেদিন মারা গেল, খুব কেঁদেছিলাম।
রাতে পাড়ার কাকারা আমাদের বাড়িতে তাস খেলতে আসতেন,মা চা সরবরাহ করতেন।বাটার
কারখানা,ভ্যালেনটা সাহেব,ভেরল সাহেব নিয়ে কথা হোত। আমাদের বাড়ির জমি,দুশো পঁয়ষট্টি টাকায়,কাঠা কেনা। মেজো মামা সামনে ওলকপি, বেগুন, টমেটো গাছ বসিয়েছিলেন।
ঘুড়ি উড়িয়ে,গুলি খেলে, সাঁতার কেটে দিন কাটছিল।বাবা লেজ ওয়ালা ঘুড়ি বানিয়ে দিতেন, তাঁর দাবি একটাই, পড়াশোনা করতে হবে।
বাবার একটা কথা আমার বুকে গেঁথে আছে,বাবু, গরীব হ ওয়া বড় পাপ।বড় হলাম, বাবা বন্ধু হয়ে গেলেন।বুঝতে পারছি,বাবার পাশে দাঁড়াতে হবে,অথচ,পড়া শেষ হয় নি।
বাবার সহকর্মীরা আমাকে পরে বলেছেন,বাবা অফিসে নাকি বলতেন,
আমার ছেলেটা দাঁড়িয়ে গেলে,আর আমার কী কষ্ট।
মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে,কাকু চাকরিতে ঢুকলো। ছোটপিসীর বিয়ে হোল, ঠাকুমা মারা গেলেন।
বড় গরীব ছিলাম। ঠাকুমা রাতে ছাতু খেতেন,তার ভাগ পেতাম আমি আর ভাই। ভাই দুরন্ত ছিল, ঠাকুমা ওকে বেশি ভালোবাসতেন।
আজ অভাব গেছে, ঠাকুমা নেই।ভাবি,আজ থাকলে, আমি বাজার কাকে বলে দেখাতাম।দেওয়ার সময় চলে গেলে, দেওয়া হয় না।
জীবন যেন পায়ে চলা পথ, কত স্মৃতি কত কথা, কত ভালবাসার মুখ ভুলতে পারিনা। বাড়িতে মান কচু দিতে আসতেন মোড়ল কাকু, দুধ দিতে আসতেন মালুম কাকু, প্রতিদিন বিকেলে প্যারেড করাতেন বিশ্বনাথ কাকু। মনে হয় এইতো যেন সেদিন।
বাড়ির সামনের বাঁশ বন, পুকুর পাড়ের কাঠবাদাম গাছ, গাছের মাথায় বসে আছে বিরাট একটা চিল, আজও আমার কাছে জীবন্ত মনে হয়।
পুজোর সময় নিউ ল্যান্ড পুজোর প্যান্ডেলে যাত্রা হত। বীণা দাশগুপ্ত, ছোট ফণি, বড় ফণি, বেলা সরকার, বীণা দাশগুপ্ত ও জোৎসনা দত্তের অভিনয় দেখেছি।
লেনিন যাত্রা শেষে বিখ্যাত অভিনেতা শান্তি গোপাল নিউল্যান্ডের রাস্তায় লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন, আজও সেই দৃশ্যটা স্পষ্ট মনে পড়ে।
প্যান্ডেলে চিৎকারের কারণে ডায়লগ থামিয়ে দিয়ে অভিনেতা সুজিত পাঠক বলছেন, বাটা সিনেমায় হাতী মেরে সাথী দ্যাখো গিয়ে।
বাটা স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে কলকাতার নামী প্রায় সব খেলোয়াড়ের খেলা দেখেছি। তখন বিভিন্ন স্কুলের স্পোর্টস গুলো দেখার মতো ছিল। তখন জীবনে অনেক ছন্দ ছিল, মানুষ অল্পে খুশি ছিল।
আধুনিক সময়ের নতুন ঢেউয়ে কত কি হারালাম।
ভালোবাসার দিনগুলো নীলকন্ঠ পাখির মতো দূরে সরে গেল। নীল আকাশ রাতের তারা মায়াময় ভোর,
সোনালী সকালগুলো কোথায় যে গেল।
মন তো স্মৃতির সংগ্রহশালা।
সেখানে কথা জমা হয়ে হয়ে পাহাড়প্রমাণ হয়ে ওঠে।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আজ আর মনে করতে পারি না। অথচ কতো সামান্য সামান্য ঘটনা হুবহু মনে রয়েছে। মনে হয় যেন কালকের ঘটনা।
লিখতে বসলে কথার ঢেউ আসে। কষ্ট করে কিছু সংগ্রহ করতে হয়না। ভুলতে পারিনা, আমাদের বাড়ি ওয়ালা মানিক মিস্ত্রীরির পিসিমাকে। বৃদ্ধার গায়ের রং কাঁচা সোনার মতো। মাথার সব চুল সাদা।
উনি আমাদের বাড়িতে দুটো নারকেল নিয়ে মায়ের সঙ্গে গল্প করতে আসতেন।
ওদের বাড়িতে সিরাজদার বিয়েতে গিয়ে জোরদার খেয়েছিলাম। অনেকদিন বাদে সিরাজ দার সঙ্গে দেখা।
বললেন, বাবলু, তুই তো এখন মাস্টার হয়েছিস্।
কথাটা শুনে আমি লজ্জা পেয়েছিলাম।
সে বয়সে কিছু হবার কথা তো কখনো ভাবিনি।
প্রতিদিনের জীবন আপনা আপনি গড়িয়ে চলছিল।
আমি শুধু আমার শৈশব কে নিয়ে আমার সুন্দর স্মৃতি গুলোকে নিয়ে আমার ভালোবাসার মানুষদেরকে নিয়ে একটা মুগ্ধ জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম।
জীবন জুড়ে অজস্র কথা জমে আছে। আমার খুব পেছনে হাঁটা অভ্যাস।
বরাবর না বলা কথা গুলোই লেখায় বলতে চেয়েছি।
আমাদের বাড়িতে খুব ফুল হোত। সকাল হলেই, বীথি, কৃষ্ণারা আমাদের বাড়িতে ফুল নিতে আসতো।
তখন পুজো প্যান্ডেলে প্রসাদের জন্য বিশাল লাইন হোত। সেই লাইনে দাঁড়িয়ে প্রসাদ পাবার মধ্যে ভারী আনন্দ ছিল। মনে আছে, একবার প্রসাদ না পেয়ে যখন হতাশ হয়েছিলাম, তখন পাড়ার মেয়ে শিলা
আমার হাতে একটা প্রসাদের প্যাকেট তুলে দেয়। বলে, বাবলু,
তুই একটা ভ্যাবলা, এই প্রসাদটা একলা খাবিনা, বাড়িতে মাসিমার জন্য নিয়ে যাবি।
আজকাল প্যান্ডেলে গেলে, কর্মকর্তারা চেয়ারে বসায়, প্রসাদের প্যাকেট এনে দেয়। কিন্তু সেদিন প্রায় যুদ্ধ করে যে প্রসাদ পেতাম, সেই আনন্দ আর পাইনা। শুধু স্যার হবার জন্য এখন বিনা চেষ্টাতেই কত কিছু পাওয়া যায়।
প্রিয় পরিবেশ, প্রিয় নদী, প্রিয় মানুষ, প্রিয় স্মৃতি নিয়ে জীবন কত কথা বলতে চায়। প্রতিটি মানুষের জীবনই তো এক একটা উপন্যাস। কত চরিত্র, কত শাখা কাহিনী, কত তার রংবাহার।
এভাবেই জীবনকে প্রতিদিন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে জানা হতে থাকে। মানুষের মহত্ব নীচতা স্বার্থপরতা
সব রকমই দেখেছি। অপ্রিয় প্রসঙ্গ মনে রাখতে চাই না। সুন্দর স্মৃতিগুলো, সুন্দর অনুভবগুলো বারবার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।
লেখায় সেই কথাগুলোই তুলে ধরতে চেয়েছি। অন্যের আয়নায় নিজেকে দেখার চেষ্টা চলেছে। সেই যে রবি ঠাকুর বলেছিলেন, আপনাকে জানা আমার ফুরাবে না।
আগে লিখতাম,এবার মনে হোল,লিখব। লেখালিখি
শুরু হোল। ইচ্ছে ছিল, সাংবাদিক হব। শিক্ষকতা সম্মান জনক পেশা, আমি জানতাম, আমাকে মানাবে না।এম,এ পরীক্ষার ছমাস আগে, আমার স্কুলে বাঙলার স্যার হলাম।
ভালো লাগলো,এবার বাবার পাশে দাঁড়াতে পারবো। আমার মনে হল, আমি এবার সত্যি সত্যি সাবালক হয়ে উঠলাম।