নিজস্ব প্রতিবেদক | রাজাপুর, ঝালকাঠি “আমার ছেলে বেকার হয়েও ঢাকায় স্ত্রীকে নিয়ে থাকে। তাদের খরচ চালাতে গিয়ে আমি আজ নিঃস্ব। প্রতি মাসে ঋণ করে, ধার করে, এমনকি নিজের ভাড়ার টাকা বাঁচিয়ে তাদের কাছে টাকা পাঠাই। তারপরও যখনই ঢাকা থেকে আসি, কাঁদতে কাঁদতে ফিরতে হয়।”
অশ্রুসজল চোখে, কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সদর এলাকার এক ভুক্তভোগী মা। একসময় যাকে রাজাপুরের মানুষ ‘সোনার ছেলে’ বলে ডাকত, সেই একমাত্র ছেলের বউয়ের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং ছেলের নীরবতায় আজ নিজের ৪৯ বছরের সংসার ছাড়ার হুমকিতে দিন কাটছে এই মায়ের।
ভুক্তভোগী মা জানান, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের অমত থাকা সত্ত্বেও ছেলের আত্মহত্যার হুমকির মুখে পা ধরে কাঁদার কারণে তিনি এই বিয়েতে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলে ও ছেলের বউয়ের বিলাসী জীবনের খরচ মেটাতে গিয়ে তিনি ঋণের জালে জর্জরিত। এমনকি নিজের জন্য একটি চার হাজার টাকার ফ্যান কিনতে না পারলেও, মায়ের পাঠানো টাকায় ঢাকায় এসি (AC) রুমে আরাম-আয়েশে থাকে তারা। ছেলের বউ যে ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও বানায়, সেটিও এই মায়েরই কিনে দেওয়া।
ভুক্তভোগী মায়ের অভিযোগ, ঢাকায় গেলে ছেলের স্ত্রী তাকে দিয়ে জোর করে বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক ভিডিও বানাত। পরবর্তীতে সেই ভিডিওগুলো “টোটো ফ্যামিলি” নামের একটি ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া আইডিতে প্রকাশ করা হতো। এই ভিডিওগুলোর কারণে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মহলে চরম অপমান ও কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে এই মাকে। ভিডিওগুলোর অধিকাংশ জুড়েই মায়ের মেয়েদের দোষারোপ করা হতো, অথচ বর্তমানে এই মেয়েরাই মায়ের একমাত্র আশ্রয়।
গত মে মাসে ছোট মেয়ের পাঠানো ২৮ হাজার এবং মায়ের ধার করা ১৫ হাজার টাকা নিয়ে নাতি-নাতনিসহ ছেলে ও ছেলের বউ বাড়িতে আসে। কিন্তু আসার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় তারা পুরো পরিবার ও ছোট মেয়ের সন্তানদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। মা বাধা দিতে গেলে তাকে মারতে উদ্যত হয় ছেলের বউ। ছেলে বাধা দিতে গেলে তার স্ত্রী চেয়ার তুলে মারতে গিয়ে ঘরের শোকেসের কাচ ভেঙে চুরমার করে ফেলে।
একপর্যায়ে ৪৯ বছরের সংসার থেকে মাকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিলে মা বাধ্য হয়ে তার চাচাতো দেবর টুকুম মিয়া এবং স্থানীয় প্রতিবেশীদের ডাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাদের মূল দাবি বাড়ির তৃতীয় তলা সম্পূর্ণ তাদের নামে ছেড়ে দিতে হবে।
মা আক্ষেপ করে বলেন, “এক সময় আমি আমার ছেলেকে নিয়ে খুব গর্ব করতাম। রাজাপুরে সবাই তাকে সোনার ছেলে বলত। কিন্তু আজ সেই সোনার ছেলে যেন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সে এখন শুধু তার স্ত্রীর কথাই বোঝে। মায়ের কষ্ট, মায়ের ত্যাগ, মায়ের চোখের জল—কোনো কিছুরই যেন তার কাছে মূল্য নেই।”
বর্তমানে নিজের ছোট মেয়ের কাছে আশ্রয় নেওয়া এই মা কারো কাছে সামাজিক বিচার চাননি। তবে তিনি আল্লাহর কাছে বিচার সঁপে দিয়ে বলেন, “আমি সবার কাছে বিচার চাই না, শুধু দোয়া চাই। আল্লাহ যেন আমাকে ধৈর্য ধরার শক্তি দেন। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি আমার ছেলেকে ভালো রাখুন। তবে একজন মায়ের চোখের পানির মূল্য যেন তিনি অবশ্যই বিবেচনা করেন।”
রাজাপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও টুকুম মিয়াসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একজন মায়ের প্রতি এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন।