চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দুই মণ মিষ্টি বিতরণের অভিযোগে আলোচিত এক যুবলীগ নেতা ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চারটি সরকারি ডিলারশিপ।
স্থানীয়ভাবে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত দেলোয়ার হোসেন ছোট্টুর নামে টিসিবি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও সার ডিলারশিপ এবং তাঁর স্ত্রী শাহীন আক্তারের নামে ওএমএস ডিলারশিপ রয়েছে বলে জানা গেছে।
অতীতে ডাকাতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার একাধিক মামলায় আসামি হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একই পরিবারের হাতে এসব ডিলারশিপ গেল, তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে সমালোচনা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু এলাকায় ‘ছোট্টু ডাকাত’ নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক ডাকাতি মামলা ছিল। এমনকি একটি ব্যাংক ডাকাতির মামলায়ও তাঁকে আসামি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি মামলায়ও তিনি এজাহারভুক্ত আসামি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন ছোট্টু। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে সরকারি ডিলারশিপে নিজের ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন ছোট্টু।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথমে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর অনুসারীদের সঙ্গে এবং পরে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে এসব ডিলারশিপ নিশ্চিত করেন তিনি। উপজেলা পরিষদের সামনে ‘মেসার্স সানিক ট্রেডার্স’ নামে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে, লোহাগাড়ায় বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক নেতাকর্মী ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে ছোট্টুর পক্ষে জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ডিও বা সুপারিশপত্র দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস, টিসিবি ও সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা ভিন্ন। ফলে একই ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের নামে একাধিক ডিলারশিপ থাকা মানেই তা বিধিবহির্ভূত নয়। তবে প্রতিটি নিয়োগে প্রযোজ্য যোগ্যতা, পারিবারিক বিধিনিষেধ, সুপারিশ ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালার পারিবারিক বিধিনিষেধ অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দীন চৌধুরী সোহেল বলেন, ‘ছাত্র আন্দোলনের মামলার এজাহারনামীয় আসামি ও চিহ্নিত যুবলীগ নেতা এবং তাঁর পরিবার কীভাবে এতগুলো ডিলারশিপ পেল, কার সুপারিশে পেল, তার জবাব উপজেলা প্রশাসন, খাদ্য কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তাকে দিতে হবে। অন্যথায় আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব। দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা ও আমাদের নেতাকর্মীরা জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করেছি। আর এখন ডেভিলদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
অভিযোগের বিষয়ে দেলোয়ার হোসেন ছোট্টু বলেন, ‘নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ নিয়েছি।’ তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ-বিন-আখন্দ বলেন, ‘আবেদনগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা তদন্ত করেছেন। বিষয়গুলো তদন্তে উত্থাপন করা হয়নি বলে আমি জানতে পারিনি। অভিযোগের বিষয়ে লিখিত আবেদন পাইনি। তবু সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তথ্য যাচাই করে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি।