কাশেম বিন আবুবকরের নাম অনেকেই শুনে নি, এমনকি অনেকেই তার বই পড়ে নাই এমন মানুষ অনেক আছে। তবুও তিনি বাংলাদেশের একজন সফল লেখক, যার নাম সারা দুনিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই তার ৭৩ বই প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এ. এফ. পি তাকে নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার পরে, দুনিয়ার আরো বহু সংবাদ মাধ্যমের হেডলাইনে চলে আসেন তিনি। তলে তলে বই লিখে কাশেম বিন আবু বকর কেন কিভাবে বাংলার মানুষকে মাতিয়ে তুললেন, তারই একটি ক্ষুদ্র চিত্র তুলে ধরছি।
সত্তর আশির দশকে দেশে তেমন একটা সাহিত্য সম্ভার গড়ে উঠেনি কিন্তু পাঠকদের একটি বিশাল ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। বিয়েতে প্রচুর বই উপহার আসত এবং সে সব বই গ্রামের বর-বধূরা ফ্রি টাইমে পড়তেন। সে সময়ে বাংলাদেশে প্রেমের সাহিত্য বলতে ‘রিকশাওয়ালার প্রেম’, ‘আমি ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘যৌবনের ঢেউ’, ‘প্রীতির প্রেম’, ‘যে যৌবন নীরবে কাঁদে’, ‘যে প্রেম নীরবে কাঁদে’, ‘গোপন প্রেম’ ‘তুমি আমার প্রেমের ড্রাইভার’ প্রেম কাহিনী’ ইত্যাদি। এসব নাম পড়ে আপনাদের কারো এলার্জি হতে পারে কিন্তু এটি বাস্তব সত্য কথা যে, এমন হেডিংয়ের বই সে সময়ের বাজারে দেদার বিক্রি হতো।
যা’হোক, বাজারের এসব বইয়ে নিন্মমানের লিখা থাকত এবং প্রেমকে খোলাখুলি, কোথাও কদাকার ভাবে উপস্থাপন করা হত। স্বল্প শিক্ষিত মানুষকে লক্ষ্য করে লিখিত এসব বই উচ্চ শিক্ষিতরা পড়ত না। তাদের অধিকাংশই জানত না ওসব বইয়ের মূল উপপাদ্য কি? কিন্তু বাজারে চাহিদা ছিল ব্যাপক।
এমন নোংরা ও কদাকার বইয়ের বিপরীতে, লিখার জগতে নতুন একটি ঢং নিয়ে হাজির হন, ‘কাশেম বিন আবু বকর’। তিনি তার সকল বইয়ে নারী-পুরুষের প্রেমকে জীবিত রাখেন এবং লিখনির মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীর প্রেমকে শালীনতার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কাশেম বিন আবু বকর ছেলে-মেয়েদেরকে পার্ক কিংবা বাগানে নিয়ে প্রেম করাতেন কিন্তু যৌন কর্ম করাতেন না এই বলে যে, বিয়ের আগে এই কাজ নিন্দনীয় অপরাধ। লিখায় মেয়েদেরকে শালীন পোষাকে হাজির করতেন কিংবা বোরকা পড়িয়ে দিতেন এবং ছেলেদের চেয়ে নিরাপদ দূরত্বে রেখে প্রেম কাহিনী চালিয়ে নিতেন। সবশেষে দু’জনের মধ্যে বিয়ে ঘটিয়ে দিয়ে কাহিনীর মজা শেষ করে দিতেন।
এই সময়ে এসে কাশেম বিন আবু বকরের বই পড়লে, অনেকেই চরম সমালোচনা করবেন। তার দাড়িওয়ালা ছবি দেখলে অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে, কড়া মন্তব্য করবেন। তবুও তিনি এক বিরাট সফল ব্যক্তি। পূর্বেকার নোংরা বইগুলো বাজার থেকে উৎখাত করে, বাংলা সাহিত্যে নতুন ঢংয়ের একটি প্রেমের জগত সৃষ্টি করার পিছনে অন্যতম সফল ব্যক্তি তিনি। বর্তমান সময়ের ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা কাশেম বিন আবুবকরকে অনেকভাবে দায়ী করলেও, বাংলা সাহিত্য জগতে তার একটি অবদান সৃষ্টি হয়ে যায়।
মূল কথা হল, বাংলাদেশের বাজারে ইসলামী ব্যক্তিদের হাতে লিখিত যথেষ্ট পরিমাণ ইসলামী বই পাওয়া গেলেও, কোন ইসলামী ব্যক্তি এখনও পর্যন্ত সেরা সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত পায় নাই! এটা ইসলামী ধ্যান ধারনা ও সংস্কৃতির জন্যে বিরাট ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা যতদিন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত ধর্মীয় মানুষেরা সাহিত্য জগতে অপরিচিত হয়েই থাকবেন। পাকিস্তানে ধর্মীয় নেতারা প্রসিদ্ধ এ কারণে যে, তারা উর্দু সাহিত্যেও আলোচিত। আমাদের দেশে বছরে যে পরিমাণ ইসলামী বক্তার জন্ম হয়, তার অর্ধেক যদি ইসলামী সাহিত্যিকের জন্ম হত, গল্পকার হতো, শিশু সাহিত্যিক হতো, তাহলে বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বচরাচরে ভিন্নভাবে হতো। কাশেম বিন আবু বকর তার অন্যতম উদাহরণ।
এটা আমার নিজস্ব অভিমত; আপনার ভিন্ন মততে শ্রদ্ধা জানাই। আমি সকল ধরণের সাহিত্যের পাঠক হিসেবে জীবিত আছি কমপক্ষে ৪৫ বছরের বেশী সময় ধরে। তারই আলোকে এই্ মূল্যায়ন।