কলমে: মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এম.এস.এস.(সমাজবিজ্ঞান), এম.এ. (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি) সহকারী অধ্যাপক
রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের সংবিধান প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করাকে নাগরিক অধিকার বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে আমাদের সাধারণ জনগণ কতটুকু জানেন? আর এই না জানার কারণেই দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জাতিসংঘের মতে, উন্নয়নশীল দেশের ৮০% মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করার কারণে শিশুরা সুবিধা বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠে। এছাড়াও যুদ্ধবিগ্রহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, দুর্ঘটনা ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো কারণে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তারা হারাচ্ছে তাদের ন্যূনতম অধিকার।
অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে স্বভাবতই মৌলিক অধিকারের কথা চলে আসে। সংবিধানে উল্লেখিত অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কি শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ ঘটানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারছি? যে পরিবেশে শিশু নিজেকে স্বাধীন ও মুক্তভাবে একজন সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে—সেই দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। অথচ আমরা পাহাড়ি পল্লী, গ্রামের অসহায় ঘর কিংবা শহরের বস্তিতে দেখতে পাই অজস্র শিশু নোংরা আবর্জনায় পড়ে আছে, ন্যূনতম আহার পাচ্ছে না। এই বৈরী পরিবেশেই তারা বেড়ে উঠছে। পাশাপাশি সরকারি কোনো বিদ্যালয়ে এদের ভর্তি করা হলেও অসচেতন বাবা-মা আর শিক্ষকদের নীরব ভূমিকায় ৯০% শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
তাই এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে যদি ‘শিশু কেয়ারহোম’ পদ্ধতিতে পরিচালনা করা যায়, তবে বস্তির কোনো শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে সে কোনো শূন্যতা বা সমস্যা অনুভব করবে না। এতে করে তার আবার বস্তির জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। শিক্ষকগণ তাদের পাশে থেকে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা এবং আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত মানুষ করে তুলবেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় সমতার ভিত্তিতে সকল ছাত্র-ছাত্রী একই নিয়মে বেড়ে উঠবে। তাদের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের কোনো পার্থক্য থাকবে না; প্রতিটি শিশু বুঝবে—”আমরা মানুষ, আমরা বন্ধু, আমরা সমান।”
পিতা-মাতা ও অভিভাবকহীন শিশুদের জন্য আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে এতিমখানা এবং লিল্লাহ বোর্ডিং। যদিও এখানে তারা থাকার স্থান পেয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রপ্রদত্ত বহু মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। তবে এতিম শিশুদের চেয়েও আরও অমানবিক জীবন অতিবাহিত করছেন প্রতিবন্ধী বা অটিস্টিক শিশু এবং তাদের পরিবার। নিজস্ব আত্মীয়রা পর্যন্ত মানসিকভাবে এদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না। তারা বুঝতে চায় না যে এরাও মানুষ; আপনাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সেই মহান আল্লাহ-ই এদের সৃষ্টি করেছেন।
জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশে এমন প্রায় ৫০ লক্ষ শিশু রয়েছে। সুবিধা বঞ্চিত এবং অসহায় প্রতিবন্ধীদের জন্য রাষ্ট্র ও আমাদের অনেক করণীয় রয়েছে। প্রতিটি শপিংমলে র্যাম্প ও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রাখতে হবে, থাকতে হবে এদের বিনোদনের সুযোগ। প্রতিবন্ধীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
আমাদের দেশে সুবিধা বঞ্চিতদের তালিকায় চরম নির্মমতার শিকার হয়ে আছেন বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা। আধুনিকতার জৌলুশে এক শ্রেণীর পাষাণ পরিবার নিজেকে ব্যস্ত সাজিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দূরে সরিয়ে রাখছে। দেশে এমন বৃদ্ধ লোকের সংখ্যাও কম নয়। তারা আজ বৃদ্ধাশ্রম, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, ভবঘুরে জেলখানায় কিংবা ভিক্ষা করে জীবনযাপন করছেন। একবারও কি ভেবে দেখেছেন—মাঘের হাড়কাঁপানো শীত, শ্রাবণের অবিরাম মেঘ কিংবা চৈত্রের তীব্র তাপদাহে তাদের জীবন কেমন চলছে? আপনি পাহাড় পরিমাণ সম্পদ সন্তানের জন্য রেখে যাবেন, কিন্তু নিজে এই সুবিধা বঞ্চিত অসহায় মানুষগুলোর জন্য কিছু করে যান; মহান আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। বিনামূল্যে দিতে হবে সকল শিক্ষা সামগ্রী এবং পরিবারকে দিতে হবে সামাজিক মর্যাদা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক ২৫/৩০ জন হতদরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীকে যুগোপযোগী শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে শিক্ষা শেষে তারা ২ বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অধীনে বিনা বেতনে কাজ করবে, কিংবা ছাত্রাবস্থায় সপ্তাহে ৫/৭ ঘণ্টা কাজ করে দেবে। মেধাবী শিক্ষার্থীকে দেশের সম্পদ মনে করতে হবে; তাকে ধনী-গরিবের বৈষম্য বুঝতে দেওয়া যাবে না, তাহলেই তার থেকে নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।
আসলে কী হবে অধিক সম্পদ দিয়ে? বিগত করোনা কালীন সময়ে আমরা দেখেছি—বহু শিল্পপতি অঢেল সম্পদ দিয়েও নিজের জীবন বাঁচাতে পারেননি, শেষ সময়ে পাশে আসেনি স্ত্রী-সন্তান কিংবা পরিবার-পরিজন! আপনি যে সম্পদ রেখে যাচ্ছেন, তা আপনার মৃত্যুর পর কারো ক্ষতির কারণও হতে পারে, আবার কল্যাণময়ীও হতে পারে। তাই আসুন, যার যার অবস্থান থেকে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসার বন্ধনে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলি।
সমাজের সচেতন নাগরিক, বিত্তশালী, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান—কথায় নয়, কাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখুন। গড়ে তুলুন সামাজিক সচেতনতা। আপনি এগিয়ে এলে এগিয়ে যাবে দেশ, সমৃদ্ধশালী হবে আমাদের সমাজ।