অনেক দিন একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম বাড়ীর পোষা কুকুর’টা ভিক্ষুক দেখলেই ঘেউঘেউ করে তেড়েমেরে লাফিয়ে উঠে। প্রতিনিয়ত কুকুরের এহেন আচরণে ভিক্ষুকের মনে দারুণ যন্ত্রণার কারণ হলো। কতো মানুষইতো এই বাড়ীর ফটকের পাশদিয়ে আসে যায়, কুকুরটা এমন করে কাউকে তাড়াতে আসে না! কিন্তু,ভিক্ষুক দেখলেই কুকুরটা এক্কেবারে বিগড়ে যায়। তেড়ে আসে কামড়ে দিতে! রহস্য কি,কেনোই’বা কুকুরের এমন আচরণ? ভিক্ষুক ভিষণ চিন্তায় পড়লো! সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ঘুমোতে গেলো। কিন্ত শান্তি নেই, ঘুমের ঘোরে আবার সেই কুকুরের উচ্চস্বরে ঘেউঘেউ চিৎকার শুনে ভিখারির ঘুম ভেঙে গেলো। ভিখারির মেজাজ খারাপ। শান্তিতে ঘুমাতে পারলোনা,সারা রাত জেগে রইলো এবং প্রভুর কাছে প্রার্থনা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো। ভোরে ফজরের নামাজ শেষে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে কুকুরের এমন অত্যাচার থেকে রেহাই চাইলো।
নিত্যকার কাজকর্ম চালিয়ে যেতে ভিক্ষুক প্রত্যুষে যথারীতি ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় নেমে পড়লো। রাস্তায় নেমে একটু এগুতেই হঠাৎ দেখলো,একটা কুকুর প্রচন্ড গতিতে দৌড়াচ্ছে। হঠাৎ গতি থামিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বাড়ীর দেয়ালে ঠেং উচিয়ে নির্বিঘ্নে প্রস্রাব করে চলে গেলো। কুকুরের প্রতি এমনিতেই ভিখারির প্রচন্ড মনের ক্ষেদ হয়ে আছে,তারপরে এমন অশালীন কাজ দেখে ভিক্ষুক ভাবে, কুকুর আসলেই প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। প্রতিটি কাজই নির্লজ্জের মতো কুকুর করে থাকে। পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য নোংরা চরিত্র কুকুরের, সবসময় ব্যতিক্রম আচরণ তাদের, যৌনাচার থেকে সব কাজকারবার গুলো দেখে ভিখারি এক্কেবারে মনোক্ষুণ্ণ। দিন কি দিন কুকুরের প্রতি ভিখারির চরম বিতৃষ্ণা ও ঘৃণা জন্মালো। তাই, ভিখারির মনে অদম্য জিজ্ঞাসা জন্মাল এই যে এতোসব মানুষ তাহলে পরম যত্নে বাড়ীতে কুকুর লালন পালন করেন,কেনো? মানুষের মুখে খাবার না দিয়ে কুকুরের জন্যে খাবার,
যত্নআত্তি কোন কিছুরই অভাব রাখেন না, কেনো ? বাড়ীর দোয়ারে ভিক্ষা চাইতে গেলে কুকুর যেমন তেড়ে আসে বাড়ীর মালিকেরাও ভিক্ষুকের প্রতি কুকুর প্রেমের কারণে ভিক্ষুকদের প্রতি অস্বস্তি বোধ করেন এবং মুখ ফিরিয়ে নেয় ; এ কেমন মানবতা ?
একদিন ভিক্ষুক তার মনের ভেতর দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ আর কৌতুহলের পরিসমাপ্তি ঘটাতে বাড়ীর মালিক অর্থাৎ কুকুরের মনিবকে জিজ্ঞাস করলেন। হে,বাড়ীর মালিক আমিতো ভিক্ষুক! আপনার দুয়ারে দু’পয়সা আল্লাহর ওয়াস্তে হাত পেতে নিতে আসি,কিন্তু কোনোদিনও আপনার এই কুকুরের যন্ত্রণায় প্রবেশ করতে পারি না। আপনি সবই দেখেন, আপনি আমাকে ভিক্ষা না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে প্রায়শই কুকুরটা’কে আদর করে ঘরে চলে যান। আমি জানি কুকুর একটা নোংরা ও অপবিত্র প্রাণী তারপরও আপনি কতো যত্নে কুকুরটা’কে লালন পালন করেন,কেনো? আপনি কি জানেন কুকুর আপনার বাড়ীর দেয়ালে প্রস্রাব করে,রাতে ঘেউঘেউ বিকট শব্দে আপনার ঘুম বিনষ্ট করে এবং ফকির মিসকিন দেখলে প্রচন্ড শব্দে ঘেউঘেউ করে কামড়াতে আসে? কি জঘন্য কুকুর! আপনি মানুষ হয়ে মানুষের সেবা না করে এই অপবিত্র কুকুরের সেবায় মগ্ন আছেন,এটি মোটেও ঠিক কাজ নয় মাকিক ? আমি অনেকদিন ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করতে যাই। আমি দেখেছি আপনার মতো অনেকে বাড়ীতে কুকুর লালন-পালন করেন,কুকুরের জন্য অনেক অর্থকড়ি খরচ করেন! অথচ,ভিক্ষুক দেখলে ভিক্ষা না দিয়ে ঘরের কপাট বন্ধ করে দেয়! কুকুরের প্রতি আপনাদের এতো ভালোবাসা কেনো? আপনাদের এমন কুকুর পিরিতি আমাকে ক্ষুব্ধ করেছে। বাড়ীর মালিক ধীরস্থির গুরুগম্ভীর হয়ে শান্ত মনে ভিখারির কথা শুনছিলেন, পরিশেষে ভিখারির উদ্দেশ্যে বললেন। শুন ভিখারি,এই যে কুকুর দেখছো সে কিন্তু কর্ম করে খায়। আমার বাড়ীতে পাহারা দেয়, রাতে যাতে চোর-ডাকাত হানা দিতে না পরে সে জন্য সে প্রহরে প্রহরে চিৎকার করে মানুষকে সচেতন করে দেয়। শুধু তাই নয় তার হাঁক ডাকে রাতের নিরবতা ভেঙে আশেপাশের মানুষ কে ঘুম ত্যাগ করে আল্লাহর বন্দেগীতে মনোযোগী হতে সহজ করে দেন! কারণ, কুকুর ইচ্ছে করে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেন। আর ঐ যে মানুষের চলাচলের পথে প্রস্রাব না করে দেয়ালে করারও একটা বিশেষ কারণ আছে। এর যৌক্তিক কারণ হলো এই যে,কুকুর সর্বদা মানুষকে সবচেয়ে পূতপবিত্র প্রাণী মনে করে। তাই কুকুরের প্রস্রাবের অপবিত্রতায় যেনো মানুষের পবিত্রতা ক্ষুন্ন না হয় সেই কারণে কুকুর সবসময় মানুষের চলাচলের নিরাপদ দূরত্বে প্রস্রাব করে থাকেন। এবার তোমার প্রতি কুকুরের অসদাচরণ অর্থাৎ ঘেউঘেউ করে কামড়ে দিতে তেড়ে আসার কারণ এক্কেবারেই পরিস্কার করছি তা হলো, কুকুর তোমাকে মোটেই পছন্দ করেন না বরং চরম ঘৃণা করেন,কেনো করেন? তার কারণ হলো,তুমি মানুষ হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি কর আর কর্মকরে ক্ষেতে চাও না; এই জন্যে অর্থাৎ মানুষের কাছে হাত পেতে খাও!
এবার বাড়ীর মালিক ভিক্ষুক কে বললেন, মানুষের ভিক্ষাবৃত্তি করা সম্পূর্ণ রুপে ঘৃণার কাজ! পৃথিবীতে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সকল প্রাণী হাত পেতে চাইতে পারে,
মানুষের কাছে নয়! ভিক্ষাবৃত্তি অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ,জগতের কেউ পছন্দ করেন না; এমনকি এই কুকুরটাও ভিক্ষুকদের কে পছন্দ করেন না। তাই কুকুরটা তোমাকে দেখলেই এমন আচরণ করেন। ভিক্ষুক এতোক্ষণ গভীর ধ্যানে বাড়ীর মালিকের কথা শুনছিলেন আর মনেমনে নিজের প্রতি এক দারুণ ঘৃণা জন্মাইলেন। ভিক্ষুক অবাক বিস্ময়ে বিস্মিত হলেন। ভাবলেন, বাড়ীর মাকিকের সবগুলো কথাইতো চরম সত্যি! ভিক্ষাবৃত্তি আল্লাহর নবী রাসুল( সাঃ) আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো পছন্দ করতেন না! এমন কি ভিক্ষাবৃত্তি পরিহার করার জন্য তার উম্মতের প্রতি কঠিন নির্দেশ প্রদান করেছেন। বাড়ীর মালিকের এমন বিশ্লেষণ ধর্মী কথা শুনে এতোক্ষণে ভিক্ষুকের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। ভিক্ষুক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো সে এই মুহুর্ত থেকে জীবনে আর কখনো ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না এবং ভিক্ষার পরিবর্তে কাজ করে খাবেন।
বনশ্রী,, ঢাকা।
১৭/০৮/২০২৪