কবি সাবিনা সিদ্দিকী শিবা এর ছোট গল্প- গরুর গোস্ত
মা ও মা শুন না একটা কথা!
কি বলবি বল তাড়াতাড়ি কাজ করতেছি,
বাবা কই গেছে?
তুই জানছ না এই সময় তোর বাবা কই যায়?
আজাইরা পেঁচাল পারছ কেন?
মায়ের এমন কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো পারুলের।
কি হইছে এমন করে চাইয়া আছস কেন?
মা একটা কথা কইতে চাই তোমার কাছে।
মেয়ের এমন নরম কন্ঠে কথা শুনে,আমেনা বেগম ভয় পেয়ে গেলো।
কি কথা কবি ক,
মা!
আরে কখন থিকা মা মা করতেছস। তাড়াতাড়ি ক।
মা,তুমি বাবারে কই তো আমার গরুর গোস্ত খাইতে মন চাইছে!
মেয়ের এমন কথা শুনে মুখটা আপনেতে কালো হয়ে গেলো আমেনা বেগমের।
নুন আনতে পান্তা ফুরানোর পরিবারের এয়েন এক আশ্চর্যজন দাবি।
মেয়ের কথা কোন উত্তর দিতে পারলেন না সাথে সাথে।
পারুল বুঝতে পারছে ওর খাওয়ার স্বাদ আছে মুখে,কিন্তু ওর বাবার খাওয়ানোর সাধ্য নেই পকেটে।
আমেনা বেগমকে চুপ করে থাকতে দেখে পারুল আর কোন কথা বলে ওর মাকে বিব্রত করতে চায় না।
কিন্তু গোস্ত দিয়ে ভাত খাওয়ার চিন্তা মাথায় গেঁথে রইল।
পারুল আমেনা বেগম আর রমিজ মিয়ার অন্ধের যষ্টি। বড় আদরের মেয়ে।
তাদের ঘরে ধনসম্পদ নেই, কিন্তু মেয়েকে ঘিরে আনন্দ ভালোবাসায় ভরপুর।।
গরীব ঘরে পারুল এক গোবরে পদ্মফুল।
অল্প শিক্ষিত বাবা তার নিজের স্বপ্ন পূরণ মেয়েকে দিয়ে করতে বদ্ধপরিকর।
তাই শত কষ্টে চেষ্টা করেন মেয়েটা যেন অভাবে হাল ছেড়ে না দেয়।
রমিজ মিয়া নিজের শরীরের রক্ত পানি করে মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতিতে এগিয়ে নিয়েছে,
এস এস সি, এইচ এস সি তে জিপিএ ফাইপ পেয়ে বর্তমানে অনার্সে ফাইনাল পরীক্ষার্থী। বাবা মা থেকে সবাই আশা করে পারুল এবারও ভালো পাশ দিবো।
নিজের বাবা মায়ের অভাব দূর করবো।
আজ সেই মেয়ের মুখে গরুর গোস্ত খাওয়ার আবদার দেখে আমেনা বেগমের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।
রাতে রমিজ মিয়া বাড়িতে এলে মেয়ে গোস্ত খাওয়ার কথা আমেনা বেগম বললেন স্বামী কে।
ইতিমধ্যে পারুল রাতে লেখাপড়া শেশ করে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে।বাবা মায়ের আলোচনা ওর কান অব্দি পৌঁছায়নি।
মেয়ের জন্য মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে,
স্ত্রী কে শান্তনা দিলেন কাল দেখি কিছু টাকা যোগার করে গোস্ত নিয়া আসুমনি।
আমার মা খাইতে চাইছে,
এতো আহলাদ কইরেন না,টাকা পয়সা না থাকলেও, মনের ভাবখানা আছে ষোলআনা।
এমন কইরা কইনা আমেনা,দেইখ, আমার মা একদিন মেলা টাকা কামাইবো,তখন খাওনের লোক থাকবো না।
তোমার মেয়ে নিয়া তুমি সপন দেখও আমি ঘুমাই রাইত অনেক হইছে।
হ লও আমি ঘুমামু,সকালে আবার তাড়াতাড়ি যাইতে হইবো মহাজন কইয়া দিছে সবাইরে
গোস্ত কিনে রমিজ মিয়া মহাজনকে বলে সেদিন একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এলো।
আমেনা বেগম দ্রুত হাতে কুটে সব রেডি করে গোস্ত রান্না করে ফেললেন।
পারুল গরুর গোস্ত দিয়ে আয়েশ করে ভাত মেখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাচ্ছে,পাশে বসে রমিজ মিয়া, আমেনা বেগম ভাজি আর ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছে, আর মুগ্ধ হয়ে মেয়ের খাওয়া দেখছে।
আহ! মেয়েটা এতো মজা করে খাওয়া দেখে রমিজ মিয়ার মনটা শান্তি পাচ্ছে।
আব্বু তুমি মা একটু গোস্ত নেই।
নারে মা আমি গরু গোস্ত খেতে পারি না,আমার এলার্জি হয়।
সারা শরীর ফুলে যায়।
পারুল ভাবল,আমার বাবা মা কে কোনদিম গরুর গোস্ত দিয়ে খেতে দেখলাম না।
মা কে তো কোনদিন ও দেখিনি,একটুকরো গোস্ত পাতে নিতে।
অথচ মা কত মজা করে গোস্ত রান্না করে।
মাঝে মাঝে মনে হয় মায়ের হাতে বুঝি যাদু আছে।না হলে এতো স্বাদ হয় কেমনে!
পারুল আর কোন কিছু নয় গরুর গোস্তের প্রতি ভীষণ দুর্বল।আর তার মা বাবা নাকি ছোট বেলা৷ থেকেই এলার্জির ভয়ে মাংস পছন্দ করে না।
কিন্তু পারুল এই কথাটা ছোটবেলা বিশ্বাস করতো,জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আর বিশ্বাস করে না।
ও ভালো করে বুঝে গিয়েছে ওর বাবা একটি চালের আড়দে সামান্য বেতনভুক্ত কর্মচারী, নিজেদের মাথা গুজার একটি ছাঁদ ছাড়া আর কিছু নেই।
বাবার গায়ের রক্ত পানি করে মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে অনেক বড় করার স্বপ্ন দেখছেন।
এতো অভাবের মাঝেও আমার কোন ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেনি।অনেক সময় গরুর মাংস খেতে চাইলে বাবা একটা বয়লারের মুরগী কিনে নিয়ে আসে।
সেদিন রাগে আমার আর খাওয়াই হয় না,
অথচ একবারও রান্না ঘরে গিয়ে পাতিল তুলে দেখিনি পাতিলে কোন গোস্ত আছে নাকি।
যতটুকু রান্না করেছে তা আমার পাতেই তুলে দিতো।
কখন যদি গরুর গোস্ত আনতো,তখন এক কেজিও আনতো না,আধা কেজি সযত্নে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে চোরে মতো নিয়ে আসতো,আমার মমতাময়ী মা কয়েক টা আলু দিয়ে খুব যত্ন সহকারে রান্না করতো,আমাকে একবেলা ভরপেট খাওতো,বাকি টা রেখে দিতো পরে খাওয়ার জন্য। তাতে আর তাদের খাওয়ার থাকলো কই?
এভাবে আমার দরদী মা বাবা আমাকে লেখাপড়া করে বড় করেছে।
একটা সময় আমি খুব বড় একটি চাকুরী পাই,এবং বেতনও বেশ ভালো।
মা বাবা দু’জন খুব খুশি আজ।প্রথম মাসের বেতন পেয়ে আমি নিয়ে বাজারে গিয়ে গরুর গোস্ত কিনে নিয়ে এলাম।
নিজের হাতে রান্না করে এক প্লেট ভাত নিয়ে লেবু কেটে গোস্ত দিয়ে ভাত মেখে মা বাবাকে আমি খাওনোর জন্য মুখের কাছে ধরে বলি,হা করও বাবা,
এতোদিন হয় তো তোমাদের গরুর গোস্তের এলার্জি আর নেই। তাইনা?
আমার কথা শুনে মা বাবা একত্রে কেঁদে ফেললো,
বাবা ম্লান হেসে বললো
হ মা। যেদিন থেকে তুই বড় হয়ে চাকুরী ধরছিস,নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিস সেদিন থেকে আমাদের আর কোন এলার্জি নেই।তোর ভয়ে চলে গেছে,,,