মুর্শিদাবাদ সিল্কের শাড়িতে আজকে বড় অপরুপা লাগছিল শাশ্বতীকে,
নীলাঞ্জন পাশাপাশি হাঁটছিল।
সিনেমা হলের সামনে একটা ফোয়ারা ছিল,
রাস্তার দু’ধারে কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল,
বসন্তকালে কী যে অপরূপ লাগতো!
সার্ভিস মার্কেটে জনতা কেবিনে প্রেমিক প্রেমিকাদের ভিড় লেগে থাকতো,
সন্ধ্যেবেলায় ব্রীজের পাশে বন ঝাউয়ের আড়ালে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের দেখা যেত,
আর পূজোর সময়?
নিউল্যান্ডে জমজমাট প্যান্ডেল। যাত্রা, ম্যাজিক শো, সার্কাস, বাইরে যাবার প্রশ্নই উঠতো না,
কী সব স্বপ্নময় দিন!
আমরা তখন নদীর পাড়ে জেটিতে গিয়ে দাঁড়াতাম,
এখন যাবার উপায় নেই,
জামানা বদলে গেছে,
তোমার মনে আছে, ব্রিজের উপর পুজোর সময় কি সুন্দর করে সাজানো হতো, গেটটা!
তখন পুজোর গন্ধ মাখা বাতাস, মাইকে বীরেন ভদ্রের কম্বুকন্ঠে, মহিষাসুরমর্দিনীর আগমনী সুর,
লাইনে দাঁড়িয়ে পূজোর ভোগ খাওয়া,
তখন সব মেয়েকেই দেবী বলে মনে হতো, কথা বলতে লজ্জা করত,
কী সব ফেলে আসা দিন,
স্টেডিয়ামে খেলার কথা তোমার মনে আছে?
আছে তো, বিক্রমজিৎ দেবনাথ, অমিয় ব্যানার্জি,
রাম বাহাদুর, বীর বাহাদুর, এ টি রহমান, সমরেশ চৌধুরী, বালু।
তখন স্কুল স্পোর্টস গুলো দেখার মতো ছিল,
এখানে কে না এসেছেন!
জহরলাল নেহেরু, শ্যাম ম্যানেকশ, তেনজিং নোরগে, লতা মঙ্গেশকর, হেমা মালিনী, অনুপ জালোটা, হেমলতা, কে নয়?
আমি কিন্তু জায়গাটাকে আগের সঙ্গে মেলাতে পারছি না,
কোয়াইট ন্যাচারাল,
কেন?
পরিবর্তন জীবনের ধর্ম,
বুঝলাম,
কিন্তু সেদিনের সেই সব মানুষগুলো?
ভারী আন্তরিক,
ওনাদের কথা ভাবলে মনে কষ্ট হয়,
কী ভালোবাসা যে দিতেন!
দুনিয়া বদল গয়া,
কষ্ট হয়, যা ছিল, আজ নেই। যা ছিল, আর কখনো ফিরে পাবো না।
ভালোবাসার মানুষগুলো নদীর ওপারে চলে গেছেন,
চিৎকার করে ডাকলেও, আর সাড়া মিলবে না।
পুজোর সময় মেদিনীপুরের পট শিল্পীরা এসে আগমনী গান শুনিয়ে যেতেন,
মায়েরা চাল দিতেন, খুচরো পয়সা দিতেন।
খুশি মনে তারা চলে যেতেন।
প্যান্ডেলে চলে আসতো, রাখাল পালের ঠাকুর,
নদীতে ভেসে যেত গায়নার নৌকো, ঝিলের জলে পদ্ম শালুক, মাঠে মাঠে কাশফুল, আকাশটা ঘন নীল,
আমার মা মুড়ির মোয়া, চিড়ের মোয়া বানাতেন,
পুজোর কদিন অন্য খাবারের কথা ভাবাই যেত না,
বিজয়ার প্রণাম করতে গিয়ে বাড়ি বাড়ি খেয়ে পেট ভরে যেত,
লক্ষ্মীপুজোর দিনে আকাশে থালার মতো কত বড়
চাঁদ দেখতে পেতাম।
কী স্নিগ্ধ জ্যোৎসনা! তেমন জোছনা আজ আর দেখি না!
মনে হয় দেখার চোখটা হারিয়ে ফেলেছি,
সময় কত কিছু দেয়, কত কি যে কেড়ে নেয়!
জীবনটা কেন সিনেমার মতো হয় না?
কেন বলছো একথা?
তাহলে ফ্ল্যাশব্যাক ছবির মতো ঈশ্বরের কাছে পুরনো দিনগুলো ফেরত চাইতাম।
শাশ্বতী বলল, আমি কিন্তু অসম্ভব কিছু চাইবো না,
শুধু পুরনো দিনের ভালোলাগার আশ্লেষটুকু মনের ভেতর ঘরে জমা করে রাখবো,
তা বেশ। জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। সেইসব অমলিন স্মৃতিগুলো আমাদের কাছে হয়ে উঠুক, বুকের গোপন দেরাজে স্বর্ণ কমল সঞ্চয়।