1. admin@mannanpresstv.com : admin :
কুকুর কেন দল বেঁধে ঘেউ ঘেউ করে! - মান্নান প্রেস টিভি
শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৩ অপরাহ্ন

কুকুর কেন দল বেঁধে ঘেউ ঘেউ করে!

গোলাম মাওলা রনি
  • Update Time : সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
  • ১৭১ Time View
আমি যে মহল্লায় থাকি সেখানে তিন দল কুকুরের বসবাস। প্রথম দলটি থাকে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বাসার সামনে। দ্বিতীয় দলটি থাকে নায়েম নামক সরকারি একটি অফিসের গেটের কাছে- আর তৃতীয় দলের অবস্থান ঢাকা কলেজের পেছনের যে গেট রয়েছে সেটির কাছাকাছি। আমার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় কিংবা দিন শেষে গৃহে ফেরার সময় আমি তিন দল কুকুরের নানারকম মহড়া, বিচিত্র স্বরের ঘেউ ঘেউ এবং কখনো-সখনো ভয়ানক মারামারির দৃশ্য দেখি। কুকুর দলের একটি নিদারুণ ব্যবহারে আমি রীতিমতো অবাক। তারা সাধারণত মহল্লাবাসীকে আক্রমণ করে না,  তবে বাইরের কেউ এলে ভয়ংকরভাবে তেড়ে আসে এবং বিকট স্বরে দল বেঁধে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে।

পশ্চিমা দুনিয়ায় কুকুর নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়। কুকুরের জন্ম-শারীরিক গঠন এবং স্বভাব-চরিত্র নিয়ে পশ্চিমাদের রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তারা ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করে মানুষের শরীরের রোগবালাইয়ের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য। অন্যদিকে মানুষের মন এবং চিন্তার পাশাপাশি মানুষের অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা যেসব গৃহপালিত পশুপাখিকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় সেগুলোর মধ্যে কুকুরই প্রধানতম। আমাদের দেশে যেহেতু ওসবের বালাই নেই সেহেতু কুকুর বলতে আমরা নেড়ি প্রজাতির সারমেয়দের ঘেউ ঘেউকেই বুঝি, আর একটু টাকা-পয়সা হলে যারা আভিজাত্য প্রকাশের জন্য জার্মান শেফার্ড পোষেণ তাদের ছংভং দেখেই নিজেদের দার্শনিক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখি। অথচ প্রকৃতির এ অতি আশ্চর্য প্রাণীটির সঙ্গে মানুষের সভাব চরিত্র-দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদির যে কী মিল রয়েছে তা যদি আপনি জানতেন তবে আশ্চর্য না হয়ে পারতেন না।

কুকুর নিয়ে আলোচনার শুরুতেই প্রাণীটির কৃতজ্ঞতা বোধ, আনুগত্য, বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার ক্ষমতা এবং মানুষ চেনার অসাধারণ ক্ষমতার প্রশংসা না করে আপনি পারবেন না। বন্য কুকুর পোষা কুকুর এবং বেওয়ারিশ কুকুরের খাদ্যাভ্যাস-চরিত্র যেমন ভিন্নতর, তদ্রƒপ প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী কুকুরের স্বভাব-চরিত্র এবং খাদ্যাভ্যাস কীভাবে গড়ে ওঠে তার সঙ্গে মানুষের চরিত্র অভ্যাস চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে স্থান-কাল-পাত্র কী ভূমিকা রাখে তা নিয়ে আলোচনার আগে শিরোনাম নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলার চেষ্টা করছি। 

আলোচনার শুরুতেই বলা আবশ্যক যে, আজকের  শিরোনামটি কেবল বাংলাদেশের বেওয়ারিশ নেড়ি কুকুরের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কর্মকান্ড বর্ণনার নিমিত্তেই নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের দেশের নেড়ি কুকুর কিংবা রাস্তায় সদলবলে ঘুরে বেড়ানোর মতো বেওয়ারিশ অর্থাৎ মালিকানাবিহীন কুকুরের দল পৃথিবীর কোথাও নেই। এ কুকুরগুলোর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো- এরা স্বজাতিবিদ্বেষী। অর্থাৎ একজন অপরজনকে দেখতে পারে না। এরা অকারণে ঘেউ ঘেউ করে। আর তাদের ঘেউ ঘেউ অর্থ কোনো প্রেম নিবেদন নয়। প্রকৃতির কোকিল-শ্যামা-দোয়েলের মতো এরা গান গায় না,

উল্টো ঘেউ ঘেউ শব্দে এরা অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। এদের ভাষার তাল-লয়-সুর যদি বিশ্লেষণ করেন তবে দেখবেন যে নেড়ি কুকুরগুলোর শতকরা ৯৯ ভাগ ঘেউ ঘেউ মূলত গালাগাল, খিস্তি খেউড় এবং অহেতুক হুমকি-ধমকি বা ভয় প্রদর্শন।

বাংলাদেশের নেড়ি কুকুরগুলোর চরিত্র এবং অভ্যাস শুরু হয় কুকুরছানার জন্ম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রকৃতির বেশির ভাগ প্রাণী সন্তান উৎপাদনের জন্য মানুষের মতো সঙ্গী নির্বাচন করে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করে এবং যৌন সম্পর্ককে শালীনতার মধ্যে আবদ্ধ রাখে। তারা একত্রে বাসা বাঁধে, গর্ভবতীর যত্ন-আত্তির জন্য পুরুষ সঙ্গী যথেষ্ট শ্রম দেয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়। ফলে এসব প্রাণিজাত সন্তান-সন্ততির চরিত্র-বিবেক-বুদ্ধি-রুচি-অভিরুচি নেড়ি কুকুরের দলের মতো হয় না। অন্যদিকে নেড়ি কুকুরের প্রথম সমস্যা হয় তাদের যৌনতা নিয়ে। যৌন সম্পর্কে এ জাতীয় কুকুরগুলো যে বেহায়াপনা-বেপরোয়া এবং অশ্লীলতা জনসম্মুখে প্রদর্শন করে তা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

দ্বিতীয়ত : যৌন সঙ্গিনীর সঙ্গে পুরুষ কুকুরটির ব্যবহার এবং গর্ভাবস্থায় কোনো দায়িত্ব কর্তব্যের ধার না ধারার কারণে কুকুরের বংশগতিতে পিতার ভূমিকা শূন্য। ফলে জাতি হিসেবে কুকুরের দল পিতৃ-পরিচয়হীন এবং শৈশব থেকেই কুকুরছানার মায়ের দুগ্ধ পান ছাড়া অন্য কোনো পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে পরিচিত নয়। কুকুরদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ নেই, অর্থাৎ এরা নেতা হতে পারে না। অন্যদিকে দলগতভাবে চলাফেরা করে অন্যান্য প্রাণী যেভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে তা এ জাতিটির মধ্যে নেই। এরা দলবদ্ধ হয় কেবল নিজেদের মধ্যে মারামারি করার জন্য এবং নিজেদের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে গালাগাল দেওয়ার জন্য এরা বহু দলে বিভক্ত হয়ে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে।

বাংলাদেশের নেড়ি কুকুরদের খাদ্যাভ্যাস- মলমূত্র ত্যাগ এবং সারাক্ষণ হা করে থাকার সঙ্গে পৃথিবীর উন্নত প্রজাতির কোনো কুকুরের মিল খুঁজে পাবেন না। মনুষ্য বিষ্টা ভক্ষণ, ময়লা-আবর্জনা ভক্ষণ এবং সারাক্ষণ লোভের জিহ্বা বের করে বঙ্গীয় সারমেয়রা যেভাবে দুনিয়ার কুকুরসমাজ থেকে নিজেদের আলাদা করতে পেরেছে তা বাংলার অন্য কোনো পশুপাখি কীট-পতঙ্গ পারেনি।

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা কুকুরের দল বেঁধে ঘেউ ঘেউ করা নিয়ে দার্শনিক মতবাদ ব্যক্ত করব। কিন্তু তার আগে কুকুরের কর্মকান্ড নিয়ে একটি ধারণা দেওয়া আবশ্যক। বন্য কুকুরের মধ্যে একটি প্রজাতি রয়েছে যেগুলোকে প্রকৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে মনে করা হয়। বন্য কুকুরের সেই ভয়ংকর চরিত্রকে মানব কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য উন্নত দুনিয়ায় কুকুরের বংশগতি নির্মাণ অর্থাৎ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটিয়ে বিশাল আকৃতির শক্তিশালী কুকুরের প্রজনন ঘটানো হয়। তারপর সেগুলোকে নির্দিষ্ট মালিকের অধীনে রেখে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা হয়।

সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ছাড়াও স্পর্শকাতর গোয়েন্দা কর্মে কুকুরের ব্যবহার সারা দুনিয়াতে বাড়ছে। অন্যদিকে মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটাতে এবং ক্ষেত্রবিশেষে মনোরোগের চিকিৎসার জন্য গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে কুকুরের ব্যবহার পশ্চিমা দুনিয়ায় যে কোনো ওষুধের চেয়ে বেশি। যেখানে গৃহের সুখ-শান্তি রক্ষায় ডগি প্রজাতির অহিংস্র অসংখ্য প্রজাতির কুকুরের পেছনে রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসীরা কল্পনাও করতে পারি না। ফলে পশ্চিমা দুনিয়ার সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের মতো একটি প্রাণীর বিকাশে রীতিমতো বিপ্লব হয়ে গেছে। উল্টো করে যদি বলি- কুকুরের প্রশিক্ষণ, স্বভাব-চরিত্র প্রভৃতি মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলছে।

কুকুর নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় যা হচ্ছে তার ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ কুকুর সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখা তো দূরের কথা, আমরা কেউ স্বপ্নেও ভাবি না যে পাড়া-মহল্লার বেওয়ারিশ কুকুরের দলের কর্মকান্ড, স্বভাব-চরিত্র আমাদের কীভাবে প্রভাবিত করছে। এ বিষয়ে সময় সুযোগ পেলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব। আজ শুধু নেড়ি কুকুরের দল বেঁধে ঘেউ ঘেউ করার অন্তর্নিহিত কারণ এবং কুকুরের এ চরিত্র দ্বারা আমাদের সমাজের কে বা কারা কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা করে আজকের নিবন্ধের ইতি টানব।

নেড়ি কুকুর যখন একা থাকে তখন তার সাহস-শক্তি বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় থাকে; কিন্তু তার যখন একাধিক সঙ্গী জুটে যায় তখন সে তার মধ্যকার স্বজাতিবিদ্বেষী চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের স্বভাব চরিতার্থ করার জন্য প্রতিপক্ষ খুঁজতে থাকে এবং সদলবলে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে মনের ঝাল মেটানোর জন্য অশ্লীল ও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করতে থাকে। প্রতিপক্ষ যদি শক্তিশালী হয় তবে কুকুরের দল পালানোর পথ খোলা রেখে নির্দিষ্ট দূরত্বে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। আর প্রতিপক্ষ যদি দুর্বল হয় তবে ঘেউ ঘেউয়ের পাশাপাশি ঝগড়া-বিবাদ করার জন্য উগ্রবাদী জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে দেয়।

নেড়ি কুকুরের জন্ম অশ্লীলতা খাদ্যাভ্যাস এবং ঝগড়া করার প্রকৃতির সঙ্গে যদি মনুষ্য সমাজের অসভ্য শ্রেণি-গোষ্ঠীর অন্তঃমিল খোঁজার চেষ্টা করেন তবে দেখতে পাবেন যে, যারা মানুষ হয়ে অমানুষের মতো সারাক্ষণ গালাগাল করতে থাকে, ঘুষ-দুর্নীতির মতো হারাম খাদ্য না খেলে যাদের ঘুম হয় না কিংবা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত না করলে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না- তাদের জন্ম-বেড়ে ওঠা, পারিবারিক সংহতি ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে অকারণে ঘেউ ঘেউকারী সারমেয়দের কী কী মিল রয়েছে তা নির্ধারণ করতে পারলে আপন ভুবনে আপনি তুলনামূলক সুখী জীবনযাপন করতে পারবেন।  কুকুরের ঘেউ ঘেউ যেমন আপনাকে ব্যথিত করে না, তদ্রƒপ মানুষরূপী প্রাণীদের ঘেউ ঘেউও আপনাকে আহত করবে না, যদি আপনি প্রতিটি ঘটনার কার্যকারণ অনুধাবন করতে পারেন।

 

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD