1. admin@mannanpresstv.com : admin :
প্রবন্ধ: কর্মজীবী মা-বাবা ও শিশু -আবদুল গনি ভূঁইয়া - মান্নান প্রেস টিভি
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

প্রবন্ধ: কর্মজীবী মা-বাবা ও শিশু –আবদুল গনি ভূঁইয়া

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
  • ১৬১ Time View
পৃথিবীতে মানুষ বড় অসহায়! জন্মের পরে বেশীরভাগ প্রাণীর বাচ্চারা নিজের শক্তিতে হাঁটতে, খেতে এবং বিপদ থেকে আত্মরক্ষার কলাকৌশল রপ্ত করতে পারেন। কিন্তু, মানুষের বাচ্চা কিছুতে’ই নিজের শক্তিতে করতে পারেন না। দীর্ঘ কয়েকবছর লেগে যায় মানব শিশুদের নিজের শক্তি বা সামর্থ্যের মাধ্যমে খাবার, পোশাক, পছন্দ অপছন্দ, আরাম আয়াস, সুখদুঃখ, বিপদআপদ হতে নিজেকে সুরক্ষা করার উপায় রপ্ত করতে!প্রাকৃতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন উপভোগ ও প্রতিষ্ঠিত করা এই জ্ঞান অর্জন করার যে ফয়সালা, এসব কিন্ত মানব শিশুরা প্রাথমিকভাবে বাবা-
মায়ের কাছ থেকে’ই শতকরা নব্বই ভাগ শিখে থাকেন আর বাকি সবল কলাকৌশল শিশুদের নিকট আপন জনের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। মানব শিশু’রা প্রকৃতির অন্যসব প্রাণীর মতো প্রাকৃতিক ভাবে বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে পারেন না। কোন না কোন ভাবে মানুষের দ্বারা মানুষের মাঝে’ই প্রকৃতির এই দিব্যজ্ঞান অর্জন করে থাকেন। মানুষের এই জ্ঞানার্জন যেখানে নব্বই শতাংশ পিতা-মাতার নিকট থেকে অর্জন করে থাকেন এবং তাদের আচার-আচরণে সহজলভ্য মনে করে চলনে-বলনে নিজেকে তৈরী করেন, সেই বাচ্চাটা যখন জন্মলগ্ন থেকে’ই বাবার আদর মায়ের যত্ন স্নেহমমতা ভালোবাসা সেবা আহ্লাদ থেকে দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চৌদ্দ ঘণ্টা বঞ্চিত থাকেন তখন শিশুটি’কে একধরনের প্রাকৃতিক ভাবেই অসহায়ত্বের সম্মুখীন হতে হয়!
এই ধরনের মানব শিশুরা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে বড় হতে হয়। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে এই সকল শিশুর ভেতরে একধরনের জেদ, ক্ষোভ,রাগবিরাগ, মানঅভিমান নানান ধরনের অস্বাভাবিকত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে খিটখিটে মেজাজের একাকিত্বের যন্ত্রণাদায়ক মনোভাবের গতিবিধি লক্ষণীয় হয়ে উঠে। আমি খুবই কাছ থেকে এমন শিশুর জীবনাচরণ লক্ষ করেছি,প্রবন্ধের শেষান্তে অবশ্যই বিস্তারিত বলতে চাইবো। শিশুর এই পরিবর্ধনের বয়োঃপ্রাপ্তির সময় কালে কেনো আমাদের শিশুদের মা-বাবারা তাদের সাথে বন্ধুর মতো পালাক্রমে সঙ্গী হতে পারছেন না বা প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্বেও শিশুর বয়ো ‘ সন্ধিক্ষণে তার ভালোবাসার সাথী হয়ে, একজন ভালো শিক্ষক হয়ে, একজন সেবাদাত্রী হয়ে, সার্বক্ষণিক পাশে থাকতে পারছেন না, কেন? এই জিজ্ঞাসা আমার মনের মাঝে বারবার আতঙ্কিত করেছেন! আমার বাবা চাকুরী করতেন, শহরে থাকতেন। আমরা ছোটছোট ভাইবোন গ্রামের পরিবেশে মায়ের সাথে বড় হয়েছি। চাকুরীর কারণে হয়তো বাবা পর্যাপ্ত সময় আমাদের জন্যে দিতে পারেননি। স্বভাবতঃ কারণে’ই আমরা সবাই মায়ের ভালোবাসায় তার আচার-
আচরণে মানব শিশুর প্রাথমিক সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান গুলো মায়ের মতো করে রপ্ত করেছি বা মায়ের প্রভাব আমাদের মাঝে বেশি ক্রিয়াশীল ছিলো। এতে কি হয়েছে একটি পারিবারিক বন্ধন প্রাকৃতিক ভাবে মা-বাবার ভালোবাসা স্নেহ মায়ামমতা আদর সোহাগের কোন ঘাটতি ছিলোনা। মায়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে পাশে থাকাটা’ই আমাদের কে মানুষিক ভাবে চাঙ্গা করে রেখেছে এবং বয়োঃবৃদ্ধিতে পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।
মানব শিশু’কে প্রকৃত মানুষ হতে হলে যে মানবিক ও উপরস্থ গুণগুলো রপ্ত করে দিব্যজ্ঞানের অধিকারী হয়ে উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হয় এটি এক্কেবারে বিজ্ঞান সম্মত ভাবে পরিক্ষিত সত্য। কিন্তু, আনরা এখন কি দেখছি? বিজ্ঞানের উন্নতির সুবাদে যান্ত্রিক ও ডিজিটাল যুগের মানব শিশুরা প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্য্যের মাধ্যমে মা-বাবার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে উপরস্থ উপায়ে বড়ো না হয়ে চাইল্ড কেয়ার, ঘরে কোন আপনজন বা দাসদাসীর তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছেন। আর, ঐ মানব শিশুদের বাবা-মা দুজনেই দিনের অধিকাংশ সময় একটানা কাজের স্বার্থে শিশু থেকে দূরে ঘরের বাহিরে থাকেন। এমনটা মূলতঃ ঘটেছে পরিকল্পনা বিহীন আধুনিক সভ্যতার কর্মপদ্ধতির কারণে! এই কর্মব্যস্ততার সময় মেনে চলার রেওয়াজ যেনো শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান হিসেবে স্বীকৃত হয়ে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে কোন ছেলেমেয়ে’ই আজকাল কর্মহীন বেকার হয়প ঘরে বসে থাকতে চায় না। কোন না কোন কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পছন্দ করেন। তাছাড়া, আমাদের দেশের আর্থিক অবস্থার এমনটাই বেহাল অবস্থা যে স্বামী স্ত্রী দুজনেই কাজ করতে হয় নইলে স্বাভাবিক জীবনযাপনে দারুণ ব্যাঘাত ঘটে যায়। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও নারীপুরুষ উভয়ই কাজ করতে হয়।
তাহলে এই কর্মজীবি নারীপুরুষ তাদের দাম্পত্য জীবনে বাবা-মা হয়ে যখন এমন মানব শিশুর পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত করেন, দায়বদ্ধ হয়ে চাকুরী নামক কর্মজীবন করেন ; তখন তাদের শিশুদের বেড়ে উঠার প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্য্য থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুূের এমন বয়োবৃদ্ধি মেনে নেওয়া ছাড়া আর কি আশা করতে পারি ? আমি এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমার নিজের সন্তানের জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরেছি।
আমার বড় ছেলে ও তার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত মানুষ। বাংলাদেশের সনামধন্য একটি সর্বোচ্চ কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকুরী করেন। বর্তমানে তাদের একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন। বয়স প্রায় দু’বছরের কাছাকাছি। আমার ছেলে ও বৌ’মা উভয়ই সকাল আটটায় কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং রাত্রের বেলায় আনুমানিক প্রায় নয়-দশটায় বাসায় ফিরে আসেন। এই দীর্ঘ সময় প্রায় চৌদ্দ পনের ঘন্টা সময়ের জন্য) বাচ্চাটি আমি ও আমার স্ত্রীর তত্বাবধানে থাকেন। আমরা শিশুটির খাবারদাবার থেকে গোছল প্রস্রাব পায়খানা যাবতীয় কর্যক্রমের দেখবাল করে থাকি,বলতে গেলে আমরাই তার দিনের বেশিরভাগ সময়ের সেবাদাস দাসী এবং খেলার সাথী।
সে আমাদেরকে শিখছে,অনুকরণ করছে,আমাদের মতো করে বড় হচ্ছে। প্রথম প্রথম মা- বাবার অনুপস্থিতিতে ভিষণ কান্নাকাটি করতো কোন কিছুই খেতে চাইতো না, হাসিখুশি থাকতে চাইতো না, খেলাধুলা, ঘুম সময়মত করতে চাইতো না, অনেক কান্নাকাটি করতো। কিছুক্ষণ পরপরই মম যাবো,পাপা যাবো,ঘরে দরোজায় গিয়ে মা-বাবাকে ডাকা-ডাকি করতো। দরোজাটা খুলে দিয়ে বলতাম বাবা অফিসে গেছেন, তোমার মা অফিসে গেছেন, রাত্রে চলে আসবে। কান্না থামাতে কাঁধে নিয়ে দুলতে দুলতে পেঁচালি মদনের মতো সারাক্ষণ বলতাম, ” ওগো দাদা ভাই কেঁদো না, লক্ষি দাদা চলো আমরা খেলনা নিয়ে খেলা করি, কার্টুন দেখাবো, গান শুনাবো, নাচ দেখাবো? ঐ যে দেখো আকাশে কত্তো সুন্দর পাখি, ঐ যে দেখো পাখিটা উড়ছে ” ইত্যাদি ইত্যাদি নানান ছলাকলা করে ব্যস্ত রাখতাম । তারপরও থেমে থেমে মনের ভেতর থেকে বাবা-মার ভালোবাসা স্নেহ মায়ামমতা আদর সোহাগ যত্ন তালাফী শিশুর মনে যে অভাব সেতো আল্লাহতালা থেকে তার প্রাকৃতিক ক্ষুধা বারবার জেগে উঠতো! এই প্রকৃতির টানে মা-বাবার ভালোবাসা কি আমাদের যত্নআত্তিতে পুরোন হয়? এতো যত্ন দেওয়া সত্বেও এই শিশুর পরাণ কি ভরে?
মোটেও না, বরং তার মনের মাঝে একধরনের বিতৃষ্ণা অতৃপ্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং মনস্তাত্ত্বিক ভাবে যে ডিপ্রেশনে ভুগছে। তাই আমি, আমার এই প্রবন্ধে বলতে চাচ্ছি ; আজকের এই যে শিশু আমাদের বাংলাদেশের শিশু। আগামী সময়ের রাষ্ট্র নায়ক,জাতির কর্ণধার সম্ভাবনাময় মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাদের জন্যে আমাদের কে প্রকৃতির নিয়ম মেনে বড় করতে হবে। মায়ের ভালোবাসা মায়ামমতা বাবার স্নেহ আদর দিয়েই সামাজিক পারিবারিক ও প্রাকৃতিক জ্ঞানে সম্মৃদ্ধ করতে হবে। কিন্তু, এটিও সত্য প্রতিযোগিতা মূলক সমাজব্যবস্থায় নারীপুরুষ উভয়ই কাজ করতে হবে। তেমনি শিশুটির বড় হওয়ার জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার গুলো কে ও প্রাধান্য দিতে হবে।
তা’হলে উপায় কি? আমাদের শিশুদের সুরক্ষার জন্যে রাষ্ট্র ও সমাজ নারী-পুরুষের কর্মক্ষেত্র সচল রেখে কি ভাবে দেশ ও জাতিকে নিরাপদ করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেন? উপায় নিশ্চয় আছে, তার জন্যে রাষ্ট্র কে দুরদর্শি সুদূরপ্রসারী কর্ম কর্মপরিকল্পনা ও পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে। যেহেতু, এ এদেশের নারী পুরুষে’রা সমানভাবে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন, শিক্ষার হারও পুরুষের চেয়ে নারীর অধিক। কাজেই এই মেধাবী জনগোষ্ঠীকে সঠিক কাজে না লাগিয়ে আমরা কোন ভাবেই উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবো না।
আমাদের নারীদেরকে অবশ্যই পুরুষের সাথে সমানতালে রাষ্ট্রের সকল কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। এমতবস্থায় আমি আলোচ্য প্রবন্ধের বিষয় বস্তুর যে মূলে কথা তা’হলো রাষ্ট্রের কাছে আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই এই যে আমাদের দেশের কর্মময় জীবনের সকল দম্পতি তারা উভয়ই চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং তাদের শিশু বাচ্চা রয়েছে বা ভবিষ্যতে বাবা-মা হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে তাদের কে কর্মক্ষেত্রে পালাবদল করে চাকুরির ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দিতে হবে। নারীর জন্যে দিনের কর্মদিবস এবং পুরুষের জন্যে বৈকালীন কর্মদিবস নির্ধারণ করতে পারলে হয়তো আমাদের শিশুদের পরিচর্যায় মা-বাবা উভয়ের সেবাপ্রদান নিশ্চিত করা যাবে। আমাদের শিশুরা প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্য্যের স্বর্গীয় ভালোবাসায় আনন্দ ভরে উৎফুল্ল চিত্তে ফুরফুরে মনে বড় হতে পারতো।
বনশ্রী,, ঢাকা।
২১/০৯/২০২৪

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD