“আইন কিংবা শিক্ষকতার বাস্তবতার গণ্ডি পেরিয়ে, যিনি জীবন ও সমাজের চেনা-অচেনা মায়াবৃত্তকে কলমের কালিতে রূপ দেন এক চিরন্তন উপাখ্যানে।”
বাংলা সাহিত্যের আকাশে আপন আলোয় ভাস্বর এক নাম জেবুন্নেছা জেবু (জেবুন্নেছা রাশেদ)। জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক রাজধানী আগ্রাবাদে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (এম.এ) ডিগ্রি অর্জন করেন। সমাজ ও মানুষের অধিকারকে কাছ থেকে বুঝতে একসময় আইন (এলএলবি) পাঠ শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের অমোঘ টানে নিজেকে সঁপে দেন শব্দের আঙিনায়। বর্তমানে সব জাগতিক পেশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্য সাধনা ও গ্রন্থ সৃষ্টিতে নিমগ্ন। ২রা জুলাই এই গুণী কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন।
বাংলা ভাষা ও বিশ্বসাহিত্যে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেবুন্নেছা জেবু লাভ করেছেন বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মাননা:
গিনিস ওয়ার্ল্ড রাইটার্স (Guinness World Writers): ইংরেজি সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক লেখক সনদ।
সার্ক সাহিত্য পুরস্কার (SAARC Literary Award): আন্তর্জাতিক সার্ক সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রাপ্ত মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা।
জাতীয় কবি পরিষদ “জাকপ” সম্মাননা (২০১৮): বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের গৌরবময় স্বীকৃতি।
এছাড়া তিনি কবি জসীমউদ্দীন পদক, কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পুরস্কার এবং ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ‘নাগেন্দ্র গল্প সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন। ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় ৩০টি শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে তিনি সাংগঠনিক কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন।
লেখনীর পাশাপাশি জেবুন্নেছা জেবু বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ‘আহ্বায়ক’ হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করেছেন শিক্ষকতা পেশায়। এছাড়া তিনি একজন সব্যসাচী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—যার কবিতা আবৃত্তি, কণ্ঠসংগীত এবং সাবলীল উপস্থাপন শৈলী (Anchoring) মঞ্চকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
ভ্রমণপিপাসু এই লেখকের ঝুলিতে রয়েছে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার এক বিশাল ক্যানভাস। যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে করেছে জীবন্ত ও বৈচিত্র্যময়।
২০২১: মনের আড়ালে মন (বলাকা প্রকাশন) — মানুষের অবদমিত মনস্তত্ত্ব ও আলোর পথে ফেরার মোটিভেশনাল গ্রন্থ।
২০২২: মনের তৃষ্ণা (উচ্ছ্বাস প্রকাশনী) — মানবীয় সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের গল্পগ্রন্থ।
২০২৩: তাসের ঘর — জাগতিক মোহের ক্ষণস্থায়িত্ব ও রূঢ় সামাজিক বাস্তবতার ছোটগল্প সংকলন।
২০২৪: মায়াবৃত্ত (প্রতিবিম্ব প্রকাশ) — মধ্যবিত্ত জীবনের অদৃশ্য সামাজিক মায়াজালের বাস্তবধর্মী উপন্যাস।
২০২৪: বাংলা ভাষা ও দেশপ্রেম — নিজ ভাষাচেতনা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার মননশীল প্রবন্ধ ও গবেষণা।
২০২৫: The Formula of Love — বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভালোবাসার আত্মিক শক্তির ইংরেজি উপন্যাস।
২০২৬: সুখের অসুখ (প্রথমা ডট কম-এ উপলব্ধ) — মানুষের বাহ্যিক সুখের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গূঢ় বেদনার এক কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ।
একজন কথাশিল্পী হিসেবে তাঁর জীবনদর্শন ও সমাজচেতনা বুঝতে নিচের ৪টি লেখার সাহিত্যিক মূল্যায়ন অপরিহার্য:
“সময়ের কাঁটা আমাদের বয়স খায় / বড় খাদক মাটি মানুষের লাশ পায়।” এখানে কবি একজন উচ্চমানের জীবন-সচেতন দার্শনিক। পরম যত্নে গড়া মানুষের সুন্দর শরীর যে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মাটিতে মিশে যায়—এই ধ্রুব সত্যকে তিনি স্মরণ করিয়েছেন। মাটি একদিকে মানুষের লাশ গ্রহণকারী ‘মহাজাগতিক খাদক’, অন্যদিকে নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগানোর একমাত্র উৎস।
“শিকড়কে অবহেলা করলে শুকিয়ে যায় বন / মানুষ তখন মানুষ থাকে না বিষাক্ত হয় জীবন।” এটি বর্তমান আধুনিক সমাজের নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। মা-বাবাকে ‘বিশাল ফলদ বৃক্ষ’ এবং ‘অস্তগামী সূর্য’-এর সাথে তুলনা করে কবি দেখিয়েছেন যে, শিকড়কে কেটে ফেললে পুরো সভ্যতার বনই শুকিয়ে যাবে। প্রবীণদের ত্যাগই আজকের প্রজন্মের সাফল্যের ভিত্তি—এই সত্যই এখানে জাজ্বল্যমান।
“এই পৃথিবীতে মানুষ অনেক কিছু ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে / কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া বাঁচে শুধু শরীর…” কবির দৃষ্টিতে, আধুনিক সমাজের বড় সংকট যেমন—নেশা ও অপরাধপ্রবণতা, এর মূল উৎস আসলে ‘ভালোবাসার অভাব’। জীবনে খাঁটি ভালোবাসা ও মায়ের মমতা থাকলে মানুষের মনে জাগতিক কোনো কিছুর অপূর্ণতা বা অভাব থাকে না।
“মানুষের গান আজ যেমন বিনোদন প্রাপ্তি / আশায় আছি তেমন ফুরাবে সব অন্ধকার…” সমসাময়িক পৃথিবীর নৈতিক অন্ধকার এবং সৎ মানুষের কোণঠাসা হয়ে পড়ার বাস্তব চিত্র এই কবিতা। তবে কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো কবির অদম্য ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কবি বিশ্বাস করেন এই আত্মিক ক্লান্তি সাময়িক; একদিন সুন্দরের আলো পৃথিবীতে বারংবার হাসবে এবং শুভশক্তির জয় হবেই।
বাস্তব জীবনের কঠিন পথ পেরিয়ে জেবুন্নেছা জেবু আজ পুরোপুরি শব্দের জাদুকর। তাঁর সাহিত্য একাধারে দর্শন, সমাজ সংস্কার, মনস্তত্ত্ব ও আশাবাদের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। কথাসাহিত্যের এই অনন্ত ও সুন্দর আলোকযাত্রায় তিনি পাঠক সমাজ ও শুভানুধ্যায়ী সকলের আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রার্থী।
–মোঃ রুহুল আমিন