বিমল বললো–
পাশে থাকা মানুষ গুলোকে নিজের কথা গুছিয়ে বলা যায় না সীতা।
ওদের কাছে নিজেকে রাফ খাতা মনে হয় ।
গুরুত্বই দেয় না, ন্যাকামি বলে উড়িয়ে দেয়, অবহেলায়।
সীতা বললো –
যার কাছে নিজের কথা বলা যায় যেই মানুষটা মন দিয়ে কথা শুনে, তার কাছেই যেতে চায় মানুষ।
এটা আমি বুঝি কিন্তু তোমার এই বিষয়টা সমাজ পরিবারের চোখে অপরাধ, তুমি কি তা বুঝো না?
বিমল-মানি না এই সমাজ প্রথা, সব টুনকো ভঙ্গুর । ওরা মানুষকে মারতেই জানে শুধু।বাচার সুন্দর কোনো পথ দেখায় না।
সীতা ঃ-বিমল এমন কথা বলো না, লোকে শুনলে পাপ বলবে।
পাপ কোনটা পাপ?
আমি বিষ খেয়ে মরলে পাপ হবে না?
নাকি তোমাকে নিয়ে সংসার করলে সুখী হলে পাপ হবে?
আমি বেকার ছিলাম বলে জোর করে তোমাকে বিয়ে দিলো, নিজেকে শান্তনা দিলাম তোমার সুখী জীবন দেখবো বলে ।
কিন্তু রোজ তোমার স্বামী যখন মদ খেয়ে বাড়ী ফিরে আমি তো বুঝি,
তুমি সুখে নাই।
শুধু প্রথার জন্যে বেচোঁ আছো,
কেনো মানছো এমন মিথ্যা সমাজের প্রথা,সীতা?
তোমার সন্তান আছে বলে কি
মরে যাবে এভাবে?
বিমল বললো- এভাবে আমাকে মেরে ফেলো না, তোমাকে ভালোবাসি সহ্য হয় না তোমার কষ্ট।
সীতা আর কতো কাদঁবে নীরবে?
আমি তোমার জন্যে সব করবো সীতা, তুমি সাহসী হও।
সীতা অপলক চেয়ে রইলো,বিমলকে সীতা ও ভালোবাসে তবুও কিছু বলতে পারে না ।
তার সামনে সমাজের প্রথা ভাঙ্গার শব্দের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় তার সকল ভাবনা।
বিমল তোমার এই সত্য ভালোবাসাকে যখন ওরা পরকীয়া বলবে, অপবাদ দিয়ে সামাজিক বিচার বসাবে,
তখন কে শুনবে তোমার মনের আর্তচিৎকার তখনও কি এভাবে বলতে পারবে?
হ্যা হ্যা পারবো, কিসের পরকীয়া?
ওসব সমাজের দেয়া নাম,
সব ভালোবাসাই মন হতে আসে, ভালোবাসা ভালোবাসাই এটার আবার ধরন কিসের?
ভালোবাসি বলেই তো তোমাকে চাই, ভিখারীর মতো কাদিঁ তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। তোমার বিয়ে আমার ভালোবাসায় কখনোই কোনো দাগ, ভাগ বসাতে পারে নাই।
আগের মতো এখনো তুমি আমার কাছে।
বিমল তুমি এত্তো বুঝো কিন্তু আমার স্বামী কেনো বুঝে না?
সীতা তোমার স্বামীর জায়গায় সে ঠিকই আছে। আমি যদি অন্যে কাউকে নিয়ে সংসারী হতে বাধ্য হই , আমি ও তোমার স্বামীর মতোই আচরণ করতাম কারণ মনটা তোমার কাছেই পড়ে থাকতো।
বিমল বললো যে যারে ভালোবাসে তাকে না পেলে অন্যে কাউকে নিয়ে সুখী হতে পারে না সীতা।
তাই এতো অমিল এতো হাহাকার , বিচ্ছেদ, ঝামেলা।
সীতা প্রশ্ন করলো,
প্রেম করে বিয়ের পর ও তাহলে কেনো এতো অসুখী জীবন ?
এটা দন্ধ চাহিদা পারিবারিক সমস্যা থেকে তৈরী হয়, হতে পারে শারীরিক, আর্থিক, মানসিক বা চাওয়া পাওয়ার গরমিল।
প্রেমে ব্যার্থ বা বউকে ভালো না লাগলে এখন সুন্দরী চায়না দেশের রবোট নিয়ে থাকা যায়, তবুও পরকীয়া করা উচিত না।
বিমলঃ কি সব বলো পাগলের মতো ;তাহলে মনের মানুষকে কই পাবো?
সীতাঃ মনের মানুষ মনের মধ্যে থাকবে সমস্যা কি?
তার মানে তবুও এই অমানুষিক যন্ত্রনা নিয়ে বেচেঁ থাকবে?
কয়দিন পর তুমি ও বদলে যাবে বিমল, বলবে আমি নষ্টা ভ্রষ্টা।
উহ! আমি বিমল কখনোই বদলাবো না। এখনো কি বদলাইছি বলো?
সীতা:-দেখো মানুষের স্বভাব হলো না পাওয়া জিনিসের প্রতি আকর্ষন থাকা।
পেয়ে গেলে তার আর মূল্যে থাকে না। তুমি আমার বন্ধু হয়ে থাকো একমাত্র বন্ধু সারা জনমের বন্ধু।
বিমল:- সীতা তুমি কি চাও আমি মরে যাই? তোমাকে ই আমার লাগবে, ব্যস কোনো কথা বলবা না।
সীতা :- তুমি ও আকাশের মতো হই ও না। আকাশ যেমন জমিনের জল টেনে উপরে তুলে নেয় ভালোবেসে, আবার মাটির জল মাটিতেই ফিরিয়ে দেয় ওরকম ভালোবেসো না আমায়।
বিমল হঠাৎ সীতার হাত ধরে বলে বিশ্বাস করো সীতা আমি বাচবো না তোমাকে ছাড়া।
সীতা বললো বিমল ভালোবাসা কেবলই কি শরীর পাওয়া? এই যে হাত ধরে বলছো, ভালোবাসি এই অনুভবের মৃত্যু ঘটাত চাও কেনো?
আমার স্বামী আমার খেয়াল রাখে না বলেই তো তোমার প্রতি আমার এই টান মায়া বাড়ছে কেবল।
আমরা দুজন কেউ কাউকে শরীর দিয়ে কখনো কাছে টানিনি বলেই গভীর পবিত্র ভালোবাসাটা বেচেঁ আছে।
বিমল সীতার হাত ছেড়ে দিয়ে বললো ঠিক আছে আমার প্রতি তোমার বদ্ধ মূল ধারনা তোমাকে পেয়ে গেলে আমি বদলে যাবো, তাই না? আমি তোমাকে প্রমাণ করে দেবো আমি সত্যি তোমাকেই ভালোবাসি।
আজ যাচ্ছি একদিন আমি ফিরবো তোমার কাছে যেদিন তোমার খুব প্রয়োজন হবে আমাকে।
বহুবছর বিমল আর যোগাযোগ রাখেনি সীতার সঙ্গে।সীতাও ভেবেছে বিমল হয়তো বিয়ে করে সংসারী হয়েছে।
সীতার এখন পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে ছেলে বিয়ে করেছে তার স্বামী স্ট্রোক করে গত হয়েছে বছর হলো বড্ড একা সীতা জীবনে কোনো ইচ্ছে ই পূরণ হলো না ভেবে ভেবে মাঝে মাঝেই অস্থির হয় মন।
যে ছেলের জন্যে সমস্ত জীবন কষ্ট করেছে সেই ছেলে ও মায়ের খোঁজ খুব একটা রাখে না,অনাদরে অবহেলায় একটা রুমে পড়ে থাকে।
আজ সীতার মন খুব খারাপ, কিছু সময় মন্দিরে বসে ধ্যান করছিলো তার মাথার ঘোমটা পড়ে গিয়েছে, হঠাৎ একটা হাত তার মাথার উপর অতি যতনে ঘোমটা তুলে দিয়ে বললো চলো,তোমার জন্যে বাধা ঘরে যেখানে তোমার পছন্দের সব আছে।
বহু বছর পর সীতা অবাক হয়ে দেখলো বিমল,
সীতা চমকে গিয়ে বলে বিমল!
সীতা বিশ্বাস হয় না এখনো আমায়?
বিমল সীতাকে নিয়ে গেলো বিমলের ঘরে,
চার রুমের গোছানো বাড়ী, চারদিকে বেলীফুলের বাগান দেখে সীতা খুশিতে কাঁদছিলো, বিমল বললো পাগলী আমার ,এখন তো প্রথা ভাঙ্গতে আপত্তি নাই, তাই না?
দেখো এই বিমলের সত্যি ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়নি, কখনো ছেড়ে ও যায়নি।
সীতার বয়স এখন যেনো বিশ বছর কমে গেছে। প্রতিদিন নিয়ম করে সীতাকে নিয়ে বিমল নদীর ধারে হাত ধরাধরি করে হাটছে, একে অপরকে খাইয়ে দেয়া,পাকা চুলে ফুল গুজে দেওয়া ভালোবাসায় মুখরিত জীবনের ছোয়ায় সীতা খুব সুখী ।
ভালোবাসার এতো সুন্দর প্রকাশ গুলো দেখে সীতার ছেলের বৌ বলে এই জনমে আমার শাশুড়ি মায়ের মতো ভালোবাসার কপাল নিয়ে জম্ম হোক আমাদের অনাগত সন্তানের। সীতা দীদা হবে এই খুশীতে বিমল ও সীতা আত্নহারা।।