1. admin@mannanpresstv.com : admin :
গল্প -কলাবতী -সুনির্মল বসু - মান্নান প্রেস টিভি
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন

গল্প -কলাবতী -সুনির্মল বসু

এম.এ.মান্নান.মান্না
  • Update Time : বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
  • ২০৮ Time View
আপনি আমার শরীরটা পেতে পারেন, আমার মন নয়।
এভাবে কেন বলছো?
সেটা তো আপনার না জানবার কথা নয়।
আমার উপর তোমার এত রাগ কেন? আমি কি করেছি?
আপনি জানেন, আমি সুশোভনকে ভালবাসতাম, আজও বাসি। অথচ, কারণে অকারণে আপনি আমার কাছে আসেন। আমার শরীরটার উপর আপনার বড় লোভ।
এভাবে বলছো কেন? আমার তো টাকার অভাব নেই। তোমার জন্য বলো, আমাকে কি করতে হবে?
শুনুন, আপনার টাকা পয়সা থাকতে পারে, আছে। কিন্তু টাকা পয়সা থাকলেই সব হয় না।
তোমার সুশোভন এখন যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে
মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
তবু আমি সুশোভনকেই ভালবাসি। আমি তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী।
পয়সা না থাকলে, ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।
আমি কখনো তা মনে করিনি। আজও করি না।
তুমি কি আজও আমায় ফিরিয়ে দেবে?
হাজার বার ফিরিয়ে দেবো। আপনার এই অসভ্যতা আমি মোটেই পছন্দ করছি না।
বেশ, আমি আজ চলে যাচ্ছি। যদি কোনদিন আমার কথা মনে হয়, মানে, আমাকে দরকার পড়ে, সেদিন আমার কাছে এসো।
আপনাকে সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, আপনি কখনো আর আমার বাড়িতে আসবেন না। এলে, আমি থানায় জানাতে বাধ্য হব। আপনি এখন আসতে পারেন।
ঠিক আছে। দেখব, কতদিন তোমার মনের এই জেদ থাকে? আমি চললাম।
কিরণ মুখার্জি চলে যেতেই ,কলাবতী সান্যাল মুখের উপর দরোজা বন্ধ করে দেয়। লোকটা চলে যেতেই, কলাবতী হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওর মনে পড়ে,
কলেজে পড়বার সময় সুশোভন চৌধুরীর সঙ্গে ওর পরিচয়। সুশোভন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। পড়াশুনোয় ভালো। বি কম পাশ করবার পর, দুয়ারে দুয়ারে চাকরির চেষ্টা করেছে। এ রাজ্যে সরকারী চাকরিতে নিয়োগ নেই বহুদিন। স্ট্যান্ড রোডে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছিল ও। কলাবতীর সান্যালকে ভালোবাসতো সুশোভন। চাকরি পেয়ে বিয়ে করে ওকে। ভালোই কাটছিল ওদের দাম্পত্য জীবন।
একদিন অফিস থেকে ফিরে হঠাৎ শরীর খারাপ সুশোভনের। ডাক্তার দেখানো হলো। স্থানীয় ডাক্তার
কলকাতায় রোগীকে দেখাতে পরামর্শ দিলেন।
কলাবতী স্বামীকে নিয়ে যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে গেল।
সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর, ডাক্তার জানালেন, সাসপেক্টেড টিবি।
কলাবতী অভাবের দিনে কিছু ছেলে মেয়ে পড়িয়ে অর্থ উপার্জন করছিল। সুশোভন কাজে যেতে না পারায়, এছাড়া অন্য কোন ভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় ছিল না। কলাবতীর বাপের বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। বাবা-মা বৃদ্ধ। ওর দাদা কল্যাণ বিয়ে করে বউ নিয়ে হাওয়া। সংসারের কোন দায়িত্বই সে নেয়নি। সেখানে অসহায় বোনকে সাহায্য করবার কথা সে ভাবতেই পারে না।
দুনিয়াটা বড় স্বার্থের জায়গা। কলাবতী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াইটা তাঁর একলার। স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে হবে। সংসারে একটা স্থিতি আনতে হবে।
কিন্তু কিরন মুখার্জি লোকটাকে কোনমতেই সহ্য করতে পারছিল না ও। লোকটা একটি চর্ম শিল্প প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার। দেখতে সুন্দর। স্মার্ট। কিন্তু চরিত্রটা একটু ঢিলেঢালা আছে। লোকটা বিয়ে করেনি। কিন্তু তাঁর নারীসঙ্গের বিবরণ এই অঞ্চলে
সকলের জানা।
সাহেব কোয়াটারে পড়াতে গিয়ে একটি বাড়িতে ওর সঙ্গে কলাবতীর পরিচয় হয়। তারপর থেকে ওই লোকটা কলাবতীর পেছনে পড়ে আছে।
রোববার সকাল দশটায় আমি একটু সার্ভিস মার্কেটে আড্ডা দিতে যাচ্ছলাম। সারা সপ্তাহ কলম পিষি, একটু রিলাক্স দরকার। পাড়ার মোড়ে ঝন্টার দোকানে একটা সিগারেট কিনে দড়িতে ধরিয়ে নিচ্ছিলাম,
পেছন থেকে পাড়ার উঠতি মস্তান শ্যামল বলল, দাদা, কোথায় চললে?
ওই একটু আড্ডা।
তুমি জানো তো, কিরণ মুখার্জি লোকটা ভালো নয়। সুশোভনদা হাসপাতালে। লোকটা ওর ওয়াইফ
কলাবতী বৌদিকে খুব ডিস্টার্ব করে চলেছে।
ততক্ষণে শ্যামলের পেছনে, টোটন, বকা, বিল্টু,হেবো এসে দাঁড়িয়েছে।
টোটন বলল, ওর স্বভাব তো তুমি জানো, এ পাড়ায় ওকে দ্বিতীয় দিন দেখলে, আমরা ওকে কেলিয়ে সাইজ করে দেবো।
বকা বলল, লোকটাকে মাথায় তুলেছে, আমাদের এরিয়ার কিছু লোক। চাকরিতে প্রমোশনের জন্য
শালাকে সবাই তেল মেরে চলে।
বিল্টু বলল, কেলিয়ে এইসব কেচাল বন্ধ করতে হবে।
হেবো সব সময় বাঙাল ভাষায় কথা বলে।
ও বাঘ মার্কা বিড়িতে লম্বা টান মেরে বলল,পনদে লাথ মারলে, শুয়োরের বাচ্চা সঠিক লাইনে আইস্যা পড়বো।
আমি সিগারেটে টান দিয়ে বললাম, কিছুটা শুনেছি আমি। লোকটা ভালো নয় জানি। বুঝে শুনে এগিও।
সার্ভিস মার্কেটে জনতা রেস্টুরেন্টে পৌঁছলাম। আমার বন্ধু বিজন মিত্তির ওখানে বসে চা খাচ্ছিল।
আমি ওকে কিরণ মুখার্জির কথা বললাম।
বিজন বলল, কিরন মুখার্জি একটা লুজ ক্যারেক্টার
লোক। রুমা নার্সের মেয়ে শর্মিষ্ঠাকে এক সময় ভালোবাসতো। পাঁচ বছর ধরে ওর সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে শর্মিষ্ঠা হঠাৎ একদিন সরকারী কর্মীকে বিয়ে করে বসে। কী যেন ওর হাজবেন্ডের নাম! হ্যাঁ, মনে পড়েছে, জয়দীপ সরকার। সেই থেকে কিরণ মুখার্জি চিরকুমার। তারপর থেকে এইসব লীলা খেলা করে যাচ্ছে।
পাড়ার ছেলেরা ওকে পেটাবে বলছে।
ঠিক কথাই বলেছে। যে রোগের যে ওষুধ। তবে লোকটার পয়সা আছে। ও ভাবে ,পয়সা থাকলে,
যা ইচ্ছে তাই করা যায়।
জেনুইন জানোয়ার টাইপ পাবলিক।
ছেলেরা অন্যায় কিছু বলছে না।
বেলা বাড়ছিল।
চা সিগারেট খেয়ে বাড়ি মুখো হলাম। কলাবতী বৌদির জন্য কষ্ট হলো।
তারপর নানান কাজের চাপে ঘটনাটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
আজ সকালে বিজনের ফোন পেলাম। ও বলল, ফ্যাক্টরির ভেতরে কিরন মুখার্জির নামে পোস্টার পড়েছে। চারদিকে পাবলিক ছ্যা ছ্যা করছে।
কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার মিঃ ওয়াটসন সাহেব ওকে ডেকে পাঠিয়ে কাজ থেকে স্যাক করেছে।
আমি ঘটনাটা জেনে খুশি হলাম। কিরন মুখার্জির আজকের এই অবস্থার জন্য খুশি হবারই কথা। তবু পেছনের দিকে ভাবনাকে চালিত করে ভাবলাম, কিরন মুখার্জির এই চারিত্রিক অবনতির জন্য সে একলাই কি দায়ী?
একসময় পাঁচ বছর ধরে ভালোবাসার কথা বলে, সেই তাঁর সেই প্রেমিকা শর্মিষ্ঠা যেদিন বেটার পেয়ে ওকে একলা ফেলে চলে গিয়েছিল, কিরণ মুখার্জির চারিত্রিক অধঃপতনের জন্য সেই মেয়েটাও কি দায়ী নয়?
চাকরি হারিয়ে কিরণ মুখার্জি এই মফস্বল শহর ছেড়ে চলে গেছে।
কলাবতী বৌদি হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। এই মফস্বল শহরের বউ মেয়েরা আজ খানিকটা নিশ্চিন্ত।
খবর পেলাম, সুশোভন বাবু সুস্থ হয়েছেন। আজ সকালে হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছে।
কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে।
কলাবতী বৌদি আজ স্বামীকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পেরে খুশি।
মেঘ কেটে গিয়েছে। আকাশটা আজ পরিষ্কার। এবার আলো উঠবে। পুরনো গ্লানি অপমান হতাশা দুর্যোগ কেটে গিয়েছে।
আমি ভাবছিলাম, সকলের জীবনে আজকের সকালের মতো আলোয় আলোয় ভরা তরুণ আলোর পৃথিবী যদি স্বপ্নের দুয়ার পেরিয়ে বাস্তবে দেখা দিত!
বিজনের ফোন পেলাম। বলল, জালি মালটা আমাদের শহর ছেড়েছে। জীবন যেমন আছে, তেমনি চলবে। নদী থাকলে, আবর্জনাও তো থাকে! কী বলিস্?
আমি বললাম, তা যা বলেছিস।
মনে মনে ভাবলাম, নদী তো পবিত্র। যারা তাতে আবর্জনা ফেলে, তাঁদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।
আর ভালো মানুষকে যারা আবর্জনা বানায়, তাঁদের বিচার কে করবে?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD