1. admin@mannanpresstv.com : admin :
গল্প -একদিন ভালোবাসা খুঁজতে বেরিয়ে -সুনির্মল বসু - মান্নান প্রেস টিভি
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৬:০৯ অপরাহ্ন

গল্প –একদিন ভালোবাসা খুঁজতে বেরিয়ে –সুনির্মল বসু

এম.এ.মান্নান.মান্না:
  • Update Time : শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
  • ১৫৮ Time View
জীবনটা বড় একঘেয়ে হয়ে গেছে।
এ কথা কেন বলছো?
প্রত্যেকদিন খাড়া বড়ি থোড়। অথচ, এমন জীবন তো কখনো চাইনি।
আমাকে তোমার ভালো লাগে না?
কখন সে কথা বললাম?
তাহলে?
বলছিলাম, এক ছাদের নিচে আছি। অথচ, তোমার আমার মধ্যে কত ব্যবধান।
কেন এমন হলো?
বলতে পারব না। সেটাই ভাবছি।
ভেবে দ্যাখো, কলেজ লাইফের দিনগুলো।
হ্যাঁ তো।
মনে পড়ে?
কেন মনে পড়বে না? তুমি তখন আমাদের গার্লস কলেজের উল্টোদিকের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে। সিগারেট টানতে। প্রথম প্রথম আমি অবশ্য তোমার এই আচরণের কারণ বুঝতে পারিনি।
কেন?
কেন আবার! তবে হ্যাঁ, তুমি যেদিন বসুশ্রী সিনেমার সামনে আমাকে পথে দাঁড় করিয়ে ভালোবাসার কথা বললে, আমি চমকে উঠেছিলাম।
কেন? আমাকে তোমার ভালো লাগেনি?
হ্যাঁ তো।
তাহলে?
আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমাকে একটু সময় দাও। আমাকে ভেবে দেখতে হবে।
সেই দুটো দিন আমার কি টেনশন কি টেনশন!
কেন কি হয়েছিল?
সারারাত ঘুমোতে পারিনি। ভেবেছিলাম, তুমি ফিরিয়ে দিলে, আমি কোথায় দাঁড়াবো? কার কাছে মনের বেদনার কথা জানাবো?
আমি তোমাকে বেশিদিন চিন্তার মধ্যে রাখিনি। ফোন করে জানালাম। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তখন আমি আনন্দে টাইটনিক ছবির হিরো জ্যাক হয়ে গেছি। মনে আছে, সেদিন বিকেলে যখন আকাশে দিন শেষে সূর্য, আমি আউট্রাম ঘাটে তোমার হাতে হাত রেখে চিৎকার করে বলেছিলাম,
আই এম দ্য কিং অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। আই এম ফ্লায়িং।
মনে আছে। সব মনে আছে।
তারপর কতদিন। কতরাত। কত স্মৃতি জড়িয়ে গেছে আমাদের জীবনে। কত কত কথা বিসৃতির অন্তরালে চলে গিয়েছে।
জানো, মাঝে মাঝে আমার একটা কথা মনে হয়।
কি?
ভালোবাসা এবং মৃত্যু ভাবনা যেন নিকট সম্পর্ক।
মাঝে মাঝে তুমি এমন এমন কথা বলো, আমার মগজে কিছুই ঢোকে না।
বুঝিয়ে বলছি। তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। যদি তোমাকে না পেতাম, তাহলে মৃত্যু যন্ত্রণা।
এটা তোমার বাড়াবাড়ি। সব ব্যর্থ প্রেমিকেরা মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করে নাকি? তাঁরা বিয়ে করে, বউ বাচ্চা নিয়ে ঘর সংসার করে।
অন্যের কথা বলতে পারব না। কিন্তু ওই ধাক্কা আমি সহ্য করতে পারতাম না।
তুমি যেন কেমন!
আমার মাও সেই কথা বলতেন।
কিন্তু বলো, জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে এসে তোমার মনে হয় না, আমরা কত স্মৃতি বিস্মৃতির মধ্যে দিয়ে জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এলাম।
তা ঠিক। কিন্তু এই জীবন, এই একসাথে চলা, এক কথা বলা, জীবনে কোন বৈচিত্র্য নেই আমাদের। আমার ভাল্লাগে না।
আমি তোমার কাছে পুরোনো হয়ে গেছি?
না তা নয়।
তাহলে?
তোমার প্রতিদিন রান্নাবান্না, আমার অফিস সামলানো, তোমার বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করার দায়িত্ব, আমার কর্তব্য পালন। এরমধ্যে আমি নতুন কোনো বৈচিত্র খুঁজে পাচ্ছি না।
বিয়ের পর অফিস যাবার সময়, তুমি কী সুন্দর মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে, বলতে, আসি সোনা!
সন্ধ্যেবেলায় আমি তোমার আসার অপেক্ষায় ঘনঘন জানালা দিয়ে পথের দিকে তাকাতাম।
হ্যাঁ। তখন আমার মনে হতো, সারাদিন কাজের মধ্যে থাকবো, সারাদিন তোমাকে দেখতে পাবো না।
আমারও তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দিন কেটে যেত।
সেদিন সবই ছিল। আজ নেই কেন, সেটাই কদিন ধরে ভাবছি।
জীবন বড় একঘেয়ে হয়ে গেছে।
তখন কিন্তু এমনটা ছিল না। পুজোর ছুটিতে, সামার ভ্যাকেশনে তুমি আমাকে পুরীতে নিয়ে যেতে, দুবার দীঘায় নিয়ে গেছিলে, আরেকবার তারাপীঠে পুজো দিয়ে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়েছিলাম।
মনে আছে। মনে আছে। সেই দিনগুলো কি ভাল ছিল।
আসলে, তখন অল্প বয়স। দুচোখে অনেক মুগ্ধতা। তখন আকাশ নীল। গাছের পাতা সবুজ। ফুলে ফুলে ভরা আমাদের উঠোন।
তখন সকালগুলো কী ভালো ছিল। দুপুর বেলা অনুরোধের আসরে গান শুনতাম।
অ্যাই, তুমি তো আবার সুবীর সেন আর শ্যামল মিত্রের গানের ভক্ত ছিলে!
সেটা ঠিক বলেছো। শ্যামল মিত্রের গান শুনলে, আমি আজও রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ি। গানের কথাগুলো মনে হয়, আমার কথা। আমি তো ওই স্টাইলেই কথা বলি। ওভাবেই নিজেকে প্রকাশ করতে চাই।
আমার আবার প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় আরতী মুখোপাধ্যায়ের গান শোনা অভ্যেস ছিল।
একটা গান তোমার প্রিয় ছিল, না বলে এসেছি, তা বলে ভেবো না, না বলে বিদায় নেব। চলে যাই যদি, যেন হই নদী, সাগরে হারিয়ে যাব।
তোমার ফেভারিট ছিল, শ্যামল মিত্তিরের ওই গানটা,
তোমাদের ভালোবাসা মরণের পার থেকে ফিরায়ে এনেছে মোরে, তোমরা আমার গান কতখানি ভালোবাসো, বুঝেছি নতুন করে।
সত্যি, কতসব ভালো ভালো দিন পিছনে ফেলে এলাম।
আমার মা-বাবা কিন্তু তোমাকে খুব ভালবাসতেন।
জানি। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছিলাম। সেটা ওনারা বুঝতে দেননি।
তখন দিনগুলো অন্যরকম ছিল।
আমি একবার একটা টিয়া পাখি পুষেছিলাম। আমাদের একমাত্র মেয়ে পুপুন তখন ছোট। ও তখন ওকে ছোলা খেতে দিত। পাখিটা কথা শিখেছিল। ও ডাকতো, পপুল, খেতে দাও। খেতে দাও।
এখন মনে হয়, যেন সে দিনের ঘটনা।
এই শোনো, বিভাস ফোন করেছিল, বলল ,আগামী সপ্তাহে এখানে আসবে।
ও এখন কোন থানায় আছে?
হেডকোয়ার্টারে।
ছোটবেলায় ওর একবার ফোঁড়া হয়েছিল। তুমি ওকে পচা বলে ডাকতে।
এখনো ডাকি। ও বড়দা বলে আমাকে সম্মান দেয়। আমার কথায় রাগ করে না। অন্যেরা ওই নামে ডাকলে, ভীষণ রেগে যায়।
বিভাস কিন্তু সব সময় স্বীকার করে, তুমি জীবনে ওকে দাঁড় করিয়েছো। ও সেটা ভুলে যায় নি।
কিন্তু জীবনে আমাদের এত একঘেয়েমি কেন?
সবার জীবনেই এরকমটা থাকে। আনন্দ খুঁজে নিতে হয়। তাহলেই জীবন আপন ছন্দে এগোবে।
তুমি ঠিক বলেছো। আমাদের বয়স হচ্ছে। এই বয়সে সেদিনের মতো একের প্রতি অন্যের মোহ নেই হয়তো, তবে পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতা রয়েছে।
আমি তো সেটাই জানি। তোমার মতিগতি আমার ভালো লাগছে না।
ভুল বলেছিলাম।
সেটাই তো। স্বীকার করো।
করছি। বিভাস আসছে। কদিনের ছুটি পেয়েছে। চলো, আমরা ক’দিনের জন্য পাহাড়ি বেড়িয়ে আসি।
আমার সমুদ্র বেশি ভালো লাগে।
তাহলে পুরী?
ঠিক বলেছো। পুরী কোনদিন পুরনো হয না।
তুমি আগের মতো জল ছুঁয়ে হাঁটবে?
হ্যাঁ তো।
চলতে চলতে আমরা হারিয়ে যাওয়া জীবনের দিনগুলো খুঁজবো।
ঠিক বলেছো। বিয়ের পর যেভাবে জীবনকে দেখেছিলাম, সেভাবেই।
শরীর পুরনো হতে পারে। মন তো হারিয়ে যায়নি।
জানো, পুরনো ভালোবাসা খুঁজে দেখবার জন্য আমাদের এবার সমুদ্র তীরে আগের মতো হাতে হাত ধরে হেঁটে যেতে হবে।
সবকালের ভালোবাসার মানুষজন যেভাবে সাগর তীরে হেঁটে গেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Categories

© All rights reserved © 2022 mannanpresstv.com
Theme Customized BY WooHostBD