ঐতিহ্যের ইতিহাস রিকশা, বিষয়টি প্রবন্ধের নামকরণের বিষয়বস্তু হয়ে গেল। কারণ এর সাফল্য অনেক বেশি। তাই আজ এমনই একজন মানুষকে নিয়ে লিখতে বসেছি সেই মানুষ কে কি কেউ চিনেন, জানেন? না, আপনি আমি অনেকেই তাকে চিনি না এবং জানি না সে কে? কারণ,তাকে আমরা ইতিপূর্বে কোথাও কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা রাষ্ট্রের উচুমানের কোন সভা সেমিনারে দেখিনি! কাজেই তাকে আমাদের না চেনার’ই কথা। তিনি আর কেউ নন,তিনি একজন রিকশাওয়ালা। অর্থাৎ,তিনি কোন রিকশার মালিক নন,একজন রিকশাচালক। এই রাজসিক পোশাকে রিকশার উপরে বসে আছেন দেখে অবাক মনে হচ্ছে তা-ই না? হ্যাঁ অবাক হওয়ারই কথা। কারণ, একজন রিকশা চালক’কে এমন পোশাকে দেখতে কেউ হয় তোবা চায় না বা কখনো দেখেন’ও না। আজ তাকে নিয়েই কিছু লিখতে চাই।
আমাদের দেশে রিকশা একটি অতি প্রাচীনতম বাহন। বিভিন্ন শহরে বিশেষ করে ঢাকায় এর ব্যবহার ও প্রচলন অতি বেশি সমাদৃত এবং গ্রহণ যোগ্য। ঘর থেকে বেরোলেই নিকট বর্তি কিংবা কাছাকাছি কোন জায়গাতে যেতে রিক্সায় চড়ে বসি। রিক্সা চলাচল বেশ আরামদায়ক। রাস্তায় যেতে-যেতে ঝুমুর তালের দুলুনিতে গুনগুনিয়ে গানে গানে কি যেনো আনমনে ভাবিতে ভাবিতে পথ টুকু যায় ফুরিয়ে,কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে দেয় রিকসাওয়ালা। আমাদের আদি ঐতিহ্যের এই বাহনের কথা নানাভাবে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন স্তরে ফুটে উঠেছে। গানে, কবিতায় গল্পে উপন্যাসে এবং সিনেমায় দারুণ ভাবে এই রিক্সার ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন আমদের শিল্পসংস্কৃতি ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষে’রা। আধুনিক ডিজিটাল যান্ত্রিক যুগেও প্রতিযোগিতায় রিক্সা হারিয়ে যায় নি। মানুষের চলাচলের অতি উত্তম যানবাহন হয়ে রিকশা স্ব গৌরীবে টিকে আছে।
আসলে রিক্সা আমাদের দেশের একটি প্রদর্শিত ও স্বীকৃত শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির অংশ এবং ঐতিহ্যের ইতিহাস। রিক্সার বিলুপ্ত কারোই কাম্য নয়। তা ছাড়া হতদরিদ্র মানুষের জীবন জীবীকা নির্বাহের অতি সহজ কাজের ক্ষেত্র’ও কিন্তু রিকশাকে বিবেচনা করা যায়। দেশের গরীব শ্রেণীর মানুষের যখন নিয়মিত কাজের অভাব হয় তখনই তারা শহরে কি গ্রামের পথে সহজেই রিক্সা চালায়ে জীবীকা নির্বাহ করার জন্যে আয়-উপার্জন করতে শুরু করেন। এটি অনেকটা অতিরিক্ত কর্ম পেশা হিসেবে বেছে নেন,আবার কেউ কেউ রিক্সা চালায়ে জীবন চলার স্থায়ী পেশা মনে করে সারাজীবন কাটিয়ে দেন। রিক্সার এই অভাবনীয় ব্যাপার ও সাফল্য কে আমরা কেন যেন ইদানীং বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে মানিয়ে নিতে পারছি না। যেখানে আধুনিক ডিজিটাল যান্ত্রিক বাহনের জয়জয়কার সেখানে পায়ে চালিত এই রিক্সার ব্যবহার যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি সময়ের পরিমাপে অ-দ্রুতগামী বাহন হওয়াতে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে আসছে। কিন্তু তার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মোটরচালিত রিক্সার উন্নত সংস্করণের মাধ্যমে রিক্সার প্রচলন শুরু হয়। যা ইতিমধ্যে মানুষের কাছে সহজলভ্য চলাচলের অতি উত্তম যানবাহন হয়ে উঠেছে। দারুণ গ্রহণ যোগ্য হয়ে উঠেছে চালক ও আরোহীর কাছে। চমৎকার এই বাহনের নানান ডিজাইনে রংবেরঙের আরামদায়ক আসন বিন্যাসের মাধ্যমে এই বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যাটারিচালিত রিক্সার মাধ্যমে অনায়াসে শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে।
কিন্তু,বাঁধ সেধেছেন স্বয়ং রাষ্ট্রের প্রশাসন। বিদ্যুতের ঘাটতিজনিত কারণে এবং দ্রুতগামী হালকা অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন মনে করে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারে এমন সব কারণ দেখিয়ে এই যানের চলাচল সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করে শহরে অবাধ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখা টেনে দিয়েছেন। জানিনা বিষয়টি কতোটুকু জনস্বার্থে গিয়েছে তবে এটি সত্য জনঘন বসতি এই শহরে সহজলভ্য চলাচলের জন্যে এ-ই রিকশার ব্যবহার ইতিমধ্যে অনেক সুফল বয়ে এনেছে, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যদি বিদ্যুতের ঘাটতিজনিত কারণে এই ব্যাটারি বাইক নিষিদ্ধ করে বিদ্যুতের অপচয় নিষিদ্ধ করা জরুরী মনে করা হয়,তা হলে একটা কথা আমাদেরকে নির্ভয়ে বলতে হবে তা হলো গরীবের যানবাহন এই বিদ্যুৎ চালিত রিক্সা বন্ধ করে জনগনের ভোগান্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রের সুখবোধ কার জন্যে সৃষ্টি করতে চান।
অর্থবিত্তের বিশালত্ব নিয়ে বিলাসী জীবন যাদের আছে নিজেদের যানবাহন আর সুরম্য প্রাসাদ যেখানে দশ-বিশটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র। যেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের একটির একদিনের বিদ্যুৎ খরচ ব্যাটারি বাইক যন্ত্রের আনুমানিক পঁচিশ টির সমান বিদ্যুৎ খরচ করে থাকেন। তাহলে দেশের জনমানুষের প্রশ্ন হলো বিদ্যুৎ চালিত কোন যন্ত্রের ব্যাবহার আগে নিষিদ্ধ করতে হবে? আমি মনে করি প্রথমেই সকল শীতাতপ যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ হোক তারপরে প্রয়োজন হলে বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে ব্যাটারি রিচার্জেবল যন্ত্রের ব্যবহার সীমাবদ্ধ করা হোক। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন ধারণের জন্যে সহজভাবে কর্মক্ষেত্রে চলাচলের সুবিধার্থে ইজিবাইক চালু রাখতে হবে এবং শহরের সর্বত্র চলাচলের স্বপক্ষে সহমত পোষণ করে সরকারের বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে,রিকশার উন্নত সংস্করণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এর উৎপাদন, বিক্রয় বিতরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যাবস্থায় এগিয়ে আসতে পারেন।
বনশ্রী,, ঢাকা।
১৫/০৯/২০২৫