এস এম আনোয়ার
মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।
তীব্র গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের বোঝা। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে ব্যবহৃত বিদ্যুতের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল আসার অভিযোগে চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন পল্লী বিদ্যুতের হাজারো গ্রাহক। অনেকের অভিযোগ, প্রকৃত মিটার রিডিং যাচাই না করেই অনুমাননির্ভর বিল তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, কোনো কোনো মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বিল এসেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের মানুষ। মাসে যেখানে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে বিল আসত, সেখানে একই ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরও কোনো কোনো গ্রাহকের বিল ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গ্রাহকদের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগই মিলছে না। অথচ মাস শেষে হাতে আসছে অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল।
উপজেলা দিশাবন্দ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, গত মাসে আমার বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৪ হাজার ২০০ টাকা। অথচ আমার ঘরে মাত্র দুটি ফ্যান ও তিনটি লাইট চলে। সারাদিন বিদ্যুৎই থাকে না। তাহলে এত বিল কীভাবে আসে? বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করতে গেলে বলা হয়, বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত বিলের পেছনে মিটার রিডিংয়ে গাফিলতি, অনুমাননির্ভর ইউনিট নির্ধারণ এবং মিটার ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক মাসের প্রকৃত ব্যবহার হিসাব না করে পরবর্তী মাসের সঙ্গে ইউনিট সমন্বয় করায় গ্রাহকরা বেশি ট্যারিফ স্ল্যাবে পড়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় বিলের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে নতুন ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটার নিয়েও রয়েছে গ্রাহকদের নানা অভিযোগ। অনেকের দাবি, আগের তুলনায় এসব মিটারে দ্রুত ইউনিট বাড়ছে। ফলে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও বেশি বিল গুনতে হচ্ছে তাদের। তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মিটার ও বিলের কারিগরি যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অস্বাভাবিক বিলের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন দিনমজুর, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ। অনেক পরিবারের মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে। আবার সময়মতো বিল দিতে না পারায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন অনেকে।
অন্যদিকে লোডশেডিং নিয়েও রয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। মনোহরগঞ্জ উপজেলা কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কে এম আজাদ বলেন, মনোহরগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৫ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় এলাকায় তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে।
অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো গ্রাহকের বিল নিয়ে অসংগতি থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগসহ জোনাল অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের মিটার ও বিল যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ গ্রহণ ও বিল সংশোধন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটারের প্রকৃত রিডিং যাচাই, সন্দেহজনক বিল পুনঃপরীক্ষা এবং মিটারগুলোর কারিগরি সক্ষমতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অনুমাননির্ভর বিল তৈরি বা মিটার রিডিংয়ে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ‘ভুতুড়ে’ বিলের হয়রানি থেকে গ্রাহকদের মুক্তি দেওয়া হবে।